গণহত্যার সাক্ষী রাবির বধ্যভূমি

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর ২০২২ | ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

গণহত্যার সাক্ষী রাবির বধ্যভূমি

আলী ইউনুস হৃদয়, রাবি
🕐 ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯

গণহত্যার সাক্ষী রাবির বধ্যভূমি

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের নাম মুক্তিযুদ্ধ। ৩০ লাখ শহীদের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হওয়ার আগ পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ দেশের মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সেই গণহত্যার সাক্ষ্য বহন করছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হল ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ঘাঁটি।

এ সময় পাকিস্তানি বাহিনী, রাজাকার ও আল-বদররা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য নারী-পুরুষকে ধরে এনে হত্যা করে। তাদের হাত থেকে রেহাই পাননি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ছাত্র, কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যরাও। নাম না জানা এমন অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগের সাক্ষী রাবির এই বধ্যভূমিটি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা সূত্রে জানা যায়, ১৯৭২ সালের ২৩ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ে গণকবর আবিষ্কৃত হয়।

সেই গণকবরের ওপর শহীদ স্মরণে সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। স্মৃতিস্তম্ভটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হল থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার পূর্বদিকে অবস্থিত।

এ বধ্যভূমি এখনো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সেই নৃশংস হত্যাযজ্ঞের কথা মনে করিয়ে দেয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। স্মৃতিসস্তম্ভটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে গড়ার আহ্বান ছড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন কয়েকশ দর্শনার্থী শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বধ্যভূমিতে আসেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী জয়শ্রী রানী বলেন, রাবির বধ্যভূমি এমন একটা স্মৃতিফলক যা বাঙালিদের ওপর হওয়া নির্যাতনের ইতিহাস ধারণ করে। বর্তমান প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয় কতটা নির্মম ভাবে বাঙালিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। এ প্রজন্ম যেখানে মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যার মতো ইতিহাস ভুলে যাচ্ছে বা কেউ কেউ হয়তো স্পষ্ট করে জানেও না; তাদের জন্য বধ্যভূমি গুরুত্ববহনকারী একটি স্তম্ভ। এখান থেকে আমরা অন্তত এটা বুঝতে পারি যে, এই স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের পেছনে কত মানুষ প্রাণ উৎসর্গ করেছেন।

ইনফরেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী নেওয়াজ শরীফ বলেন, বধ্যভূমি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহন করে। শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু যখন দেখি বধ্যভূমির পরিবেশ নানা কারণে নষ্ট হচ্ছে তখন কষ্ট হয়।

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আমিনুর রহমান বলেন, শত শত শহীদের লাশের স্বাক্ষী আমাদের এ বধ্যভূমি। বিশ্ব মানচিত্রে একটি স্বাধীন লাল সবুজের পতাকা আঁকতে জীবন ত্যাগ করেছেন তারা। বধ্যভূমিটি দেশের স্বার্থে জীবন দিতেও কুণ্ঠিত না হওয়ার অনুপ্রেরণা যোগায় তরুণ প্রজন্মের মাঝে। অভ্যন্তরীণ সকল নৈরাজ্য, অরাজকতা, অনিয়ম দূর করে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে সোনার বাংলা গড়ার আহ্বান জানায়।

মানিকগঞ্জের আবু কাউসার রাজশাহী রাবির এই বধ্যভূমিতে ঘুরতে এসেছেন। তিনি বরেন, এদেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার সাক্ষী এ বধ্যভূমি। দেশের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তারা আমাদের দেশের সূর্যসন্তান। তাদের আত্মত্যাগের ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। নতুন প্রজন্ম বধ্যভূমিতে আসলে জানতে পারবে কত রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। তাদের মধ্যে জাগ্রত হবে দেশপ্রেম।

বিশ্ববিদ্যিালয়ের শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালার কিউরেটর অধ্যাপক ড. সফিকুল ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় অসংখ্য নিরীহ বাঙালিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা বধ্যভূমিতে হত্যা করে। সেই শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।

শহীদদের হাড়, মাথার খুলি, ব্যবহৃত নানা জিনিস যেমন- পোশাক, ঘড়ি, টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালায় সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভটি মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দেশপ্রেমের বার্তা তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়।

 

 
Electronic Paper