গণহত্যা অস্বীকার সু চির

ঢাকা, রবিবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২০ | ৬ মাঘ ১৪২৬

গণহত্যা অস্বীকার সু চির

শফিক হাসান ১০:৪২ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১১, ২০১৯

print
গণহত্যা অস্বীকার সু চির

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ফের মিথ্যাচার করলেন মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি। বুধবার আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি দাবি করেছেন, গাম্বিয়ার করা মামলায় রাখাইনের একটি ‘খণ্ডিত’ ও ‘বিভ্রান্তিকর’ চিত্র হাজির করা হয়েছে। এটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়, নিজেদের উদ্যোগেই সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগও অস্বীকার করেন সু চি। তার দাবি, রাখাইনে কোনো গণহত্যা ঘটেনি, সেখানে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে লড়াই করছে সেনাবাহিনী।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা চালায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। হত্যাকাণ্ড, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ নানামুখী দমনপীড়নের মুখে জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে। ১১ লাখ রোহিঙ্গার চাপে-ভারে অর্থনীতিসহ নানা ধরনের ক্ষতির শিকার বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে একাধিকবার চুক্তি, দফায় দফায় আলোচনা হলেও নানা কূটকৌশলে দেশটি বরাবরই সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে জিইয়ে রেখেছে নানামুখী অসন্তোষ।

বিদ্যমান বাস্তবতায় ‘মগের মুল্লুক’ মিয়ানমারের অকল্পনীয় নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে চলতি বছরের ১১ নভেম্বর জাতিসংঘের আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে)-এ মামলা করে গাম্বিয়া। মামলায় নিজ দেশের আইনি লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সু চি। গত মঙ্গলবার শুরু হওয়া তিন দিনের এ বিচার প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় দিন ছিল গতকাল। কাঠগড়ায় গাম্বিয়ার অভিযোগের জবাবে আদালতে সু চি গাম্বিয়া রাখাইনের একটি অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর একপাক্ষিক চিত্র তুলে ধরেছে বলে মন্তব্য করেন।

রোহিঙ্গা নির্যাতন বিষয়ে দেশের অভ্যন্তরে সামরিক-বেসামরিক তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে সু চি বলেন, ‘যে রাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে কোনো ঘটনার তদন্ত ও বিচার করে এবং সেনা সদস্য ও কর্মকর্তাদের সাজা দেয়, তাদের গণহত্যার উদ্দেশ্য থাকতে পারে কি না। যদিও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, তবু আমি নিশ্চিত করতে চাই বেসামরিক নেতাদের ওপরও যথাযথ প্রক্রিয়ায় উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ‘নাম উল্লেখ না করে’ সু চি উল্লেখ করেন, রাখাইনে পরিস্থিতি জটিল। নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশে পালাতে বাধ্য হওয়া রোহিঙ্গাদের দুর্দশার কথাও আদালতে স্বীকার করেন তিনি।

বিচার প্রক্রিয়ার প্রথম দিনে বাদীপক্ষের অভিযোগ শোনা হয়। শুনানিতে অংশ নিয়ে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবুবাকার তামবাদু বলেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যার প্রশ্নে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করতেই তার দেশ আইসিজেতে এ অভিযোগ এনেছে। তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্ব কেন এখন নীরব দর্শক? কেন জীবদ্দশায় আমরা এটা ঘটতে দিচ্ছি? সবাই মনে করে এখানে মিয়ানমারের বিচার হচ্ছে। আসলে এখানে বিচার চলছে সামগ্রিক মানবিকতার।’

অন্যদিকে সু চি বরাবরের মতো গোলমেলে বক্তব্যে দাবি করেন, সেনা অভিযানের পেছনে গণহত্যা চালানোর অভিপ্রায়ের কোনো প্রমাণ নেই। তবে তিনি তবে স্বীকার করেন, মিয়ানমারের প্রতিরক্ষা বাহিনী হয়ত মাত্রাতিরিক্ত রকমের শক্তি প্রয়োগ করে থাকতে পারে। যদি মিয়ানমারের সৈন্যরা যুদ্ধাপরাধ করে থাকে তাহলে তাদের বিচার করা হবে। রোহিঙ্গাদের প্রধান বাসভূমি রাখাইন প্রদেশে গোলযোগের ইতিহাস কয়েক শতাব্দীর, এ সংঘাতকে আরও গভীর করতে পারে এমন কিছু না করতে আইসিজের প্রতি আহ্বান জানান সু চি।

শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করলেও শেষপর্যন্ত সু চি পারছেন দায় অস্বীকার করতে। সাত লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আগমন, নিপীড়ন, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের মতো ঘটনাকে চাইলেও চাপা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, রাষ্ট্র বিষয়টি দীর্ঘদিন যাবত পর্যবেক্ষণ করছে। বিপুল সংখ্যক অধিবাসী স্বগৃহ ছেড়ে অন্য দেশে যাওয়ার সদুত্তরও দেওয়া সহজ নয় সু চির পক্ষে। এটাকে তিনি আভ্যন্তরীণ গোলযোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন; এমন ‘আভ্যন্তরীণ গোলযোগে’ কীভাবে সাত লাখ মানুষ দেশ ছাড়ে এমন প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর দায়ে অং সান সু চিকে প্রকাশ্যে অপরাধ স্বীকার করার আহ্বান জানিয়েছেন আট নোবেলজয়ী। গণহত্যা নিয়ে গাম্বিয়ার মামলায় নেদারল্যাণ্ডের হেগে আন্তর্জাতিক আদালতের শুনানি শুরুর দিকে যৌথ বিবৃতিতে এমন আহ্বান জানান তারা। গণহত্যার জন্য সু চি ও মিয়ানমারের সেনা কমান্ডারদের জবাবদিহির আহ্বানও জানান নোবেলজয়ীরা।

তারা বলেন, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী হিসেবে আমরা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হওয়া গণহত্যাসহ অপরাধগুলো প্রকাশ্যে স্বীকার করার জন্য অং সান সু চিকে আহ্বান জানাই। আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, এ নৃশসংসতায় নিন্দা জানানোর পরিবর্তে অস্বীকার করেছেন সু চি।

বিবৃতিদাতারা হলেন- শান্তিতে নোবেলজয়ী ইরানের শিরিন ইবাদি, লাইবেরিয়ার লেমাহ গবোই, ইয়েমেনের তাওয়াক্কুল কার্মান, উত্তর আয়ারল্যান্ডের মাইরেড মাগুয়ের, গুয়েতেমালার রিগোবার্টা মেনচ তুম, যুক্তরাষ্ট্রের জোডি উইলিয়ামস, ভারতের কৈলাশ সত্যার্থী ও বাংলাদেশের ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

মিয়ানমারের হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এ বিচারপ্রক্রিয়া দেশে-বিদেশে নানাভাবে আলোচিত আলোড়িত হচ্ছে। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে মিয়ানমারের বিচার চেয়ে প্রহর গুনছে শরণার্থী রোহিঙ্গারা। বিশ্বের বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা এ ইস্যুতে সোচ্চার।

নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে নেদারল্যান্ডের হেগে। সেখানেও রয়েছে সু চির পক্ষে এবং বিপক্ষে নানা দল-মত। এদিকে মিয়ানমারের বিভিন্ন স্থানে গাম্বিয়ায় চলমান বিচার প্রক্রিয়ায় সু চির পক্ষাবলম্বন করে মিছিল-স্লোগানে এক হয়েছে দেশটির নাগরিকদের একাংশ।

বিশ্লেষকরা জানান, রোহিঙ্গা পরিস্থিতির সমাধান করা না গেলে দেশে দেখা দিতে পারে নানামুখী সমস্যা। মাথাচাড়া দিতে পারে জঙ্গিবাদ। এর সঙ্গে যুক্ত হবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। বর্তমানে রোহিঙ্গা শিবিরে কিছু এনজিওসহ বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে পরিস্থিতিকে অন্য খাতে প্রবাহিত করার অভিযোগ। মিয়ানমারের চুক্তি অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের ফেরত না যাওয়া, ভাসানচরে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলেও সেখানে না ফেরাকে দুরভিসন্ধি ও অবাধ্যতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, মিয়ানমারে গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রামের কারণে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া অং সান সু চি একসময় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসনীয় ব্যক্তি থাকলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে তার ভূমিকা বিতর্কিত। এ কারণে তিনি বিশ্বের বহু দেশের ধিক্কার পেয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাকে দেওয়া সম্মাননা প্রত্যাহার করে নেয়। দাবি উঠেছে, তার নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহারেরও।

আজ বৃহস্পতিবার শুনানির শেষ দিন। বিকাল ৩টায় দেড়ঘণ্টা বলার সুযোগ পাবে গাম্বিয়া, বিরতির পর রাত সাড়ে ৯টা থেকে দেড়ঘণ্টা বলবে মিয়ানমার।