বাংলাদেশে ভ্যালেরি টেইলরের ৫০ বছর

ঢাকা, রবিবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২০ | ৬ মাঘ ১৪২৬

বাংলাদেশে ভ্যালেরি টেইলরের ৫০ বছর

ডেস্ক রিপোর্ট ১০:১৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১১, ২০১৯

print
বাংলাদেশে ভ্যালেরি টেইলরের ৫০ বছর

অভিজ্ঞতা আহরণে ১৫ মাসের জন্য লন্ডন থেকে চট্টগ্রামের চন্দ্রঘোনায় এসেছিলেন ভ্যালেরি অ্যান টেইলর। ১৯৬৯ সালে আসার পর বাংলাদেশের প্রেমে পড়ে কাটিয়ে দিলেন ৫০টি বছর। মৃত্যুর পর এখানেই সমাহিত হতে চান তিনি। পক্ষাঘাতগ্রস্ত কিংবা নানা আঘাতপ্রাপ্ত মানুষজন যারা ঢাকার কাছে সিআরপি নামের দাতব্য প্রতিষ্ঠানটিতে পুনর্বাসনের জন্য যান তার প্রতিষ্ঠাতা টেইলর (৭৫)।

১৯৬৯ সালে চন্দ্রঘোনার খ্রিস্টান হাসপাতালের ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। এসে দেখেন ওই হাসপাতালে একটি হুইলচেয়ারও নেই। কোনো কারিগরি শিক্ষা ছিল না। সেখানে কোনো অকুপেশনাল থেরাপির ব্যবস্থা ছিল না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে বাধ্য হন।

একই বছর সেপ্টেম্বর মাসে তিনি পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তখনো যুদ্ধ শেষ হতে দুই মাস বাকি।

এ সময় তার কাজ আরও বেড়ে যায়। কারণ, যুদ্ধের জন্য পঙ্গুত্বের হার বেড়ে গিয়েছিল কয়েকগুণ। তিনি সফলভাবে সেই কাজ করতে সমর্থ হন।

বাংলাদেশে একটি সার্থক পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য উপযুক্ত অর্থ ও অন্যান্য সাহায্যের ব্যবস্থা করার উদ্দেশে ১৯৭৩ সালে তিনি আবার ইংল্যান্ডে ফিরে যান। ১৯৭৫ সালে তিনি পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

১৯৭৯ সালে এই হাসপাতালের দুটি পরিত্যক্ত গুদামঘরে ৩-৪ জন রোগী নিয়ে শুরু করেন সিআরপি।

১৯৯০ সালে ঢাকার কাছে সাভারে পাঁচ একর জায়গা কিনে সিআরপির স্থায়ী ঠিকানা গড়ে তোলেন টেইলর। যেটি এখন ১০০ বেডের হাসপাতাল। এই একশ জন স্পাইনাল ইনজুরি রোগীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। এ ছাড়া দেশের পাঁচটি বিভাগে ১৩টি শাখা রয়েছে সিআরপির। যেখানে বছরে প্রায় ৮০ হাজার রোগী সেবা নিতে পারে।

টেইলর বলেন, এই প্রতিষ্ঠান চালাতে গিয়ে বাধাও পেয়েছি। শিশু পাচারের মতো অভিযোগও আনা হয়েছে আমার বিরুদ্ধে। আমাকে গোয়েন্দারা জিজ্ঞেস করেছে, আপনি কর্মচারীদের বাচ্চাদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন? এটা ছিল আমার বিরুদ্ধে পাঁচ নাম্বার অভিযোগ। তখন আমি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলেছিলাম, হ্যাঁ করি, প্রতি বুধবার! তখন এনএসআই অফিসার হেসে বলেন, এসব অভিযোগের সব আমরা বিশ্বাস করি না। এত কিছুর পরেও সেবা চালিয়ে গেছি।

বর্তমানে সিআরপিতে এক হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছে। তাদের অনেকে এখানে চিকিৎসা নিতে এসে পুনর্বাসিত হয়েছেন। সিআরপির নিজস্ব উদ্ভাবনী প্রযুক্তিতে দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে তৈরি হয় হুইলচেয়ার।

সিআরপির শুরু থেকে বাংলাদেশিদের ফিজিওথেরাপি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে, বর্তমানে বছরে ৪০০ জনকে ডিপ্লোমা, অনার্স মাস্টার্সসহ নানামেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অবদানের জন্য ২০০৪ সালে স্বাধীনতা পদক পান টেইলর। তার আগে ১৯৯৮ সালে তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। বিভিন্ন দেশের দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থার অনুদানে পরিচালনা করা হয় সিআরপির কার্যক্রম।

টেইলর বলেন, ‘আমার মনে হয় ৪০ বছর, এটা দারুণ সময় নিজেকে এখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার। এবং যারা বলে আমিই সিআরপি, তারা এটির মূল্যবোধকে সামনে এগিয়ে নেবে।