বিশ্বজুড়ে মিয়ানমারকে বয়কটের ডাক

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২০ | ২১ শ্রাবণ ১৪২৭

বিশ্বজুড়ে মিয়ানমারকে বয়কটের ডাক

শফিক হাসান ১০:৫৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৯

print
বিশ্বজুড়ে মিয়ানমারকে বয়কটের ডাক

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বজুড়ে মিয়ানমার বয়কটের ডাক দিয়েছে ১০ দেশের ৩০টি মানবাধিকার সংস্থা। আজ মঙ্গলবার থেকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি নিজ দেশের সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা গণহত্যা ইস্যুতে সাফাই গাইবেন জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতে। আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত আইসিজেতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস) রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানি হবে। শুনানিকে সামনে রেখে মিয়ানমারের ওপর চাপ জোরালো করতে পদক্ষেপ নিয়েছে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মানবাধিকার সংস্থাগুলো। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা মুসলিম গণহত্যার অভিযোগ এনে গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ছোট্ট দেশ গাম্বিয়া।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইনে দেশটির সেনাবাহিনীর ব্যাপক দমন-পীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা। এর আগ থেকেই ছিল বিভিন্ন সময়ে আসা প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার ভারে বিপর্যস্ত অবস্থা বাংলাদেশের। উজাড় হচ্ছে বন-পাহাড়, দূষিত হচ্ছে পরিবেশ-পরিস্থিতি। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে কক্সবাজার হারাচ্ছে স্বকীয়তা। অন্যদিকে চাইলেও তাদের অন্যত্র পুনর্বাসন করা যাচ্ছে না। দেশি-বিদেশি চিহ্নিত কিছু এনজিও এক্ষেত্রে ইন্ধন জোগাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে বহির্বিশে^র ষড়যন্ত্রের আভাসও।

বাংলাদেশ প্রথম দিকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে নিমরাজি থাকলেও একপর্যায়ে মানবিক কারণেই রাজি হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হন। পরিচিতি পেয়েছেন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে। উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ মিয়ানমারকে চাপ দিলে দেশটি নানা কূটকৌশলে প্রত্যাবর্তন বাধাগ্রস্ত করে। প্রত্যাবাসন চুক্তি হলেও সেটা থেকে গেছে কাগজে-কলমেই। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন অং সান সু চি। নোবেলজয়ী এ নেত্রী একপর্যায়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে আখ্যায়িত করেও মিথ্যাচার চালান।

নানা ঘাটে জল গড়ানোর পর অবশেষে রোহিঙ্গা ইস্যুর একটি মামলায় লড়তে গত রোববার নেদারল্যান্ডসের রাজধানী হেগে পৌঁছান মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর সু চি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যক্তিগত ফায়দা লুটতেই সু চি আন্তর্জাতিক আদালতে এসেছেন। আগামীতে দেশটিতে অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নির্বাচন। সেখানে জনসমর্থন আদায়ের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সঙ্গে অন্তর্দ্বন্দ্বের বিষয়টি দেখানোর পাঁয়তারা করছেন তিনি। আন্তর্জাতিক চাপ, সামরিক বাহিনীর সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধসহ নানামুখী চাপে থাকা সু চি নজর দিচ্ছেন প্রশাসনিক ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে। সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এ দফায়ও মিয়ানমার নিষ্ক্রিয় থাকার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।

রোহিঙ্গা মানবাধিকার সংগঠন দ্য ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনের এক বিবৃতিতে বিশ্বের ১০টি দেশের ৩০টি মানবাধিকার সংস্থা একযোগে মিয়ানমারকে বয়কটের কর্মসূচি শুরু করেছে বলে জানিয়েছে। বিবৃতিতে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা, বিদেশি বিনিয়োগকারী, পেশাদার এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনকে মিয়ানমারের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানানো হয়। দ্য ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশন বলছে, বয়কটের উদ্দেশ্য মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি এবং সামরিক বাহিনী নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের ওপর অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো।

জার্মানিভিত্তিক ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ‘গ্লোবাল বয়কট মুভমেন্ট’-এর অন্যতম উদ্যোক্তা নে সাং লুইন বিবৃতিতে বলেন, ‘জাতিসংঘের তথ্য অনুসন্ধান মিশন পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছে জন্ম ও নাগরিকত্বের দিক আমার পূর্বপুরুষের দেশ আমাদের রোহিঙ্গা নৃগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের পক্ষে আমি নাগরিক বা ক্রেতা, অধিকার সংগঠনের সদস্য বা প্রতিনিধি, ধর্মীয় সম্প্রদায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা পেশাজীবী বা সংসদীয় এসোসিয়েশনসহ সবাইকে নিজেদের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা ব্যবহার করে মিয়ানমারের সঙ্গে সব প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানাচ্ছি।’

জাতিসংঘের তথ্য অনুসন্ধান মিশনকে উদ্ধৃত করে বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘মিয়ানমারে মানবাধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ র‌্যাবপোর্টিয়ার ইয়াং লি সংখ্যালঘু শান, কাচিন, তাং, কারেন, রাখাইন ও চিন সম্প্রদায়ের ওপর একই ধরনের সামরিক দমন পীড়নের প্রমাণ পেয়েছেন। গ্লোবাল বয়কট মুভমেন্ট শুরু হয়েছে একটি অনলাইন পিটিশন অভিযানের মাধ্যমে যেখানে নরওয়ের নোবেল কমিটিকে অং সাং সু চির নোবেল পুরস্কার বাতিলের আহ্বান জানানো হয়েছে।

গত নভেম্বরে রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। গাম্বিয়াকে সমর্থন জানায় ইসলামী দেশগুলোর সংস্থা ওআইসি। আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়ে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মামলাটির ধারাবাহিক শুনানি চলবে। এতে মিয়ানমার ও গাম্বিয়া দুই দেশের প্রতিনিধি দল এতে অংশ নেবে। আগামীকাল বুধবার সু চি নিজেই মিয়ানমারের পক্ষে মামলা মোকাবেলার নেতৃত্ব দিতে পারেন।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রথমবারের মতো আত্মপক্ষ সমর্থনে মিয়ানমার শুনানিতে দাঁড়াচ্ছে। আইনজ্ঞদের মতে, কোনো মামলার চূড়ান্ত রায়ে পৌঁছাতে সাধারণত বছরের পর বছর সময় নেন ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস। আবার প্রয়োজনে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অন্তর্র্বর্তী কোনো আদেশ দিতে পারেন এ আদালত।

সু চির হেগে গমনকে অভিনন্দন জানিয়ে গত কয়েকদিন যাবৎ মিয়ানমারের বিভিন্ন শহরে সমাবেশ হাজার হাজার মানুষ জড়ো হলেও আন্তর্জাতিকভাবে ধিকৃত হচ্ছেন তিনি। রাখাইনে লুটপাট, জ্বালাও-পোড়াও ও রোহিঙ্গা বিতাড়নে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানকে ‘জাতিগত নিধন’, ‘হত্যাযজ্ঞ’ আখ্যা দিয়েছে জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনী বরাবরই অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করে এলে রোহিঙ্গারা হারায় স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ।

মিয়ানমারের জালে বাংলাদেশ যেভাবে আটকা পড়েছে, এ অবস্থায় প্রয়োজন ছিল আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো। বিশেষ করে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো চাপ প্রয়োগ করলে মিয়ানমার নমনীয় হতে পারত। কিন্তু কূটনৈতিক নানা সমীকরণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের চুলচেরা হিসাব, দেশটিতে বিনিয়োগসহ নানামুখী লাভ-লোভের কারণে সুরাহা হচ্ছে না মানবতাবিরোধী এ অধ্যায়ের। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে, পরাশক্তিগুলোর নিশ্চুপ ভূমিকা। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এ ইস্যুতে মুখে কুলুপ দিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত প্রতিবেশী ভারত ও চীন পা রেখেছে দুই নৌকাতেই।

ভারত ‘ব্যালেন্স’ করার চেষ্টা করলেও চীন প্রকাশ্যভাবে অনেকটাই ঝুঁকে আছে মিয়ানমারের দিকে। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক আদালতে রওনা হওয়ার আগে গত রোববার সন্ধ্যায় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেন সু চি। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সু চির সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে উভয় দেশ শক্তিশালী মিত্রতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভারতও নিয়েছে ধরি মাছ না ছুঁই পানি নীতি। মৌখিকভাবে বাংলাদেশকে সমর্থন দিলেও কূটনৈতিক সম্পর্কে মিয়ানমারের দিকেই হেলে থাকে। উভয় পক্ষে বন্ধুত্ব রক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে তালগোল পাকাচ্ছে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার জীবন ও স্বাধীনতা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন- চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধান অসম্ভব। বাংলাদেশ আশা করছে, কূটনৈতিক পন্থাতেই রোহিঙ্গা ইস্যুর সুরাহা হবে। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর প্রবেশদ্বার মিয়ানমার। যে কারণে সংশ্লিষ্টরা দেশটিকে ঘাটাতে বিস্তর চিন্তাভাবনা করবে। চীন-ভারতের বিপুল বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার বিষয় যেমন রয়েছে, তেমনি প্রত্যেক রাষ্ট্রই স্ব স্ব অবস্থান থেকেই হিসাব কষছে নিজেদের লাভ-ক্ষতির। চীন-ভারত উভয় দেশের সীমান্তই রয়েছে মিয়ানমারের সঙ্গে। যে কারণে চাইলেও তারা বড় কোনো সিদ্ধান্তে আসবে না।

অন্যদিকে আইসিজের রায় মিয়ানমারের বিপক্ষে গেলেও দেশটি তা মানতে বাধ্য নাও হতে পারে। বিভিন্ন জোট ও সংগঠনকে শুরু থেকে অগ্রাহ্য করে আসছে মিয়ানমার। শেষ পর্যন্তও দেশটি গোঁয়ার্তুমি চালিয়ে যাবে- এমন ধারণাও প্রবল। সর্বোপরি জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে মিয়ানমারকে অভিযুক্ত করা হলেও সেটা বাংলাদেশের জন্য কতটা ফলপ্রসূ হবে; রায়ই বা কতটুকু কার্যকর করা যাবে সে বিষয়ে সংশয় থেকেই যায়!