বাগে আসছে না পণ্যমূল্য

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২০ | ১০ মাঘ ১৪২৬

বাগে আসছে না পণ্যমূল্য

শফিক হাসান ১০:২৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯

print
বাগে আসছে না পণ্যমূল্য

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় দিশেহারা ক্রেতা। মোটা ভাত খেতে, মোটা কাপড় পরতে অভ্যস্ত মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির কপালের ভাঁজ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হচ্ছে। চাল থেকে শুরু করে শাকসবজি, পেঁয়াজ, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়াকে বাগে আনা যাচ্ছে না কিছুতেই, কয়েক মাস ধরে পেঁয়াজের দাম নাগালের বাইরে, তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে চাল আর সবজি।

নতুন ধান ওঠায় বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো অবস্থাতেই চালের দাম বাড়ার কথা নয়। অন্যদিকে বাজারে আসতে শুরু করেছে শীতের সবজি। বরাবরই শীতের সবজি আসা শুরু হলে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল হয়; সব শ্রেণির ক্রেতা ব্যাগভর্তি সওদা করে ঘরে ফেরেন। চলতি বছর প্রথম ছোবলটা দিয়েছে মশলাজাতীয় দ্রব্য পেঁয়াজ। প্রায় দুই মাস আগে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ ঘোষণা করলে সুযোগসন্ধানী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। মুনাফালোভী অসৎ ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট চক্রের কারসাজিতে শনৈ শনৈ বেড়ে চলে পেঁয়াজের দাম।

শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পেঁয়াজের দাম কমানোর নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করলেও শেষপর্যন্ত কোনো উদ্যোগই কাজে আসেনি। বাঙালি জীবনে পেঁয়াজ যেন অপরিহার্য। যে কারণে চাহিদা কমাতে পারেননি ক্রেতারা, অন্যদিকে মওকা বুঝে আমদানিকারক, মজুদদার, সিন্ডিকেট চক্র কারসাজি করে লুটে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী বিমানে জরুরি ভিত্তিতে পেঁয়াজ আমদানির ঘোষণা দিলেও বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। বিশ্বের কয়েকটি দেশ থেকে আমদানি করা হয় পেঁয়াজ। আমদানিকৃত ও দেশীয় পেঁয়াজে বাজার ‘সয়লাব’ হলেও বাজারে কোনো প্রভাব পড়েনি বললেই চলে। এখনো কম-বেশি ২৫০ টাকা কেজিতেই বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ।

‘অমূল্য’ পেঁয়াজ ক্ষেতে পাহারা বসিয়ে কৃষকও বুঝিয়ে দিচ্ছেন পেঁয়াজের কত মূল্য! অন্যদিকে গ্রাহক চাহিদা বুঝে তারা অপরিপক্ব পেঁয়াজও বিক্রি করে দিচ্ছেন। গতকাল শুক্রবার অপরিপক্ব পেঁয়াজ বিক্রি নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ের সেচ ভবনে কৃষকদের বাজারজাত করা সবজির হাট ‘কৃষকের বাজার’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চালের বাজার স্থিতিশীল দাবি করে তিনি বলেন, দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ চাল রয়েছে। চাল নিয়ে কারও উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। চালের বাজার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে।

কৃষকদের অপরিপক্ব পেঁয়াজ বিক্রি সম্বন্ধে মন্ত্রী বলেন, পেঁয়াজ এখনো বড় হয়নি। আরও অনেক বড় হওয়া দরকার। আমরা এটা নিয়ে শঙ্কিত আছি। সব ছোট ছোট পেঁয়াজ বিক্রি করে দিচ্ছে। জানুয়ারি মাসে কী উপায় হবে? উৎপাদন তো কমে যাবে। এ বছর দাম বেশি থাকায় আগামী বছর দেশে অনেক বেশি উৎপাদন হতে পারে। এতে করে পরবর্তী বছর কৃষক পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য পাবে কিনা তা নিয়ে আশঙ্কা ব্যক্ত করেন মন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, যখন দেশে পেঁয়াজ উত্তোলন করা হয় তখন বিদেশি পেঁয়াজের আমদানির কারণে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারে না আমাদের কৃষক। তাই পেঁয়াজের মৌসুমে তা আমদানি বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে।

এদিকে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে নাগরিক নারী ঐক্যের উদ্যোগে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে এক মানববন্ধনে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনারা বলেছেন পেঁয়াজ নাকি প্লেনে আসছে। কিন্তু সেই পেঁয়াজ কই? এলে তো দাম কম?ত। যেভাবে পেঁয়াজ থেকে শুরু করে সব দ্রব্যের দাম বেড়েছে গত ৫০ বছরেও এমন বাড়েনি।

সরকারের সমালোচনা করে মান্না আরও বলেন, কোনো কাজ ঠিকমতো করতে পারে না সরকার। শীতকালীন সব সবজির দামও বেড়েছে। এদিকে সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে। গণশুনানিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পক্ষে কেউ ছিলেন না তারপরও নাকি তারা বাড়াবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন মাহমুদুর রহমান মান্না।

এদিকে চলতি বছরই বাড়ানো হয়েছে গ্যাসের দাম। তোড়জোড় চলছে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর। নিত্যপণ্যসহ জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে বহুগুণে। ব্যয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে বাড়েনি আয়। ফলে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে তুলনামূলক সচ্ছলরাও অনুভব করছেন স্ফীতির আঁচ। অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বরাবরই বলে আসছেন, যেসব কারণে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কথা চিন্তা করতে হয় তা সেই ফাঁকফোকর বন্ধ করতে। কিন্তু সরকার যত সহজে মূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে তত সহজে হাত দিতে পারে না সমস্যার মূলে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্য বাস্তবায়িত হলে জনজীবনে চাপ বাড়বে আরও। এমনিতেই বাজার পরিস্থিতিতে নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ মানুষের। শহুরে মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম বাড়িভাড়া। জানুয়ারি মাসে এ খাতে আসতে পারে ‘খড়গ’। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ এখনই আতঙ্কে রয়েছে।

পেঁয়াজ না খেয়ে হয়তো কেউ কেউ ‘ব্যালেন্স’ করতে পারবেন, ভাত না খেয়ে বা কম খেয়ে কীভাবে সংকট সামাল দেওয়া যাবে! এমন প্রশ্ন রয়েছে জনমনে।

রাজধানীর খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে চীনা পেঁয়াজ প্রতি কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মিসরের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। মিয়ানমারের পেঁয়াজ প্রতি কেজি ২২০, পুরান দেশি পেঁয়াজ ২৪০, নতুন দেশি পেঁয়াজ ১৮০ এবং কলিসহ দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকায়।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে নভেম্বরের ৯ থেকে ১১ তারিখ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে টানা ভারী বর্ষণ হয়। এতে পেঁয়াজ ক্ষেতের ক্ষতি হলেও দুর্যোগকেই পুঁজি করে অনৈতিক বাণিজ্য করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবি জানায়, গত বছর এই দিনে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, আমদানিকৃত পেঁয়াজ ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।

সবজির দাম নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা। গত বছরের এই সময়ে যে ফুলকপি ২০ টাকায় পাওয়া যেত, সেটার দাম এখনো ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। কয়েক মাস ধরে সবজির বাজার নাগালের বাইরে রয়েছে।

অস্বস্তি বাড়িয়েছে চালের দামও। কেজিতে বেড়েছে ৪ টাকা। সরকারি হিসাবেই গত এক মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি চালে দাম বেড়েছে ৪ টাকা। গত ৬ নভেম্বর যে মোটা চাল কেজি ৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেটা চলতি মাসের ৬ তারিখে (গতকাল) বিক্রি হচ্ছে ৩৪ টাকা দরে। চালের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রাইস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি নাঈম মিয়া বলেন, প্রতি বছরই এ সময় চালের মূল্য একটু বাড়ে। মিনিকেট চালের মূল্য কিছুটা বেড়েছে। কিছু দিনের মধ্যেই নতুন চাল বাজার ঢুকবে। নতুন চাল আসার আগমুহূর্তে বাজার খানিকটা চড়া হয়। বাজারে চালের সংকট নেই। এখন একটু বাড়লেও অচিরেই কমা শুরু হবে।

বাংলাদেশ সরকার এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) যৌথভাবে প্রণীত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গত বুধবার। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারে না। দেশের প্রতি আটজনের মধ্যে একজনের, অর্থাৎ ২ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষের পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। সুষম খাবার কেনার সামর্থ্য নেই অর্ধেকের বেশি মানুষের। এ কারণে তারা ভাত, রুটি ও কম পুষ্টিকর খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল বলে তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে। বর্তমানের বাজার পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার উল্লম্ফন চলতে থাকলে এ ধরনের জরিপের সূচক যে আরও নিম্নমুখী হবে বলার অপেক্ষা রাখে না!