ব্যর্থ হলে শিশুরা ক্ষমা করবে না

ঢাকা, শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ব্যর্থ হলে শিশুরা ক্ষমা করবে না

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:১০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০২, ২০১৯

print
ব্যর্থ হলে শিশুরা ক্ষমা করবে না

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের প্রতিমুহূর্তের নিষ্ক্রিয়তা মানবজাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে নতুন প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। সোমবার স্থানীয় সময় সকালে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে ‘অ্যাকশন ফর সারভাইভাল : ভালনারেবল নেশন্স কপ-২৫ লিডার্স’ শীর্ষক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, নতুন প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে আমাদের শিশুরা ক্ষমা করবে না, কাজ করার এখনই সময়। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বের জন্য এক নির্মম বাস্তবতা। এটি এখন মানবজীবন ও পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতির কারণ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আছি আমরা, সম্ভবত আমাদের সময়টা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ সময়।

তিনি বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তন প্রতিটি দেশের অস্তিত্বের ওপর হুমকিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব আক্রান্ত দেশগুলো।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভিবাসী সংকট মোকাবিলায় একটি যথাযথ কাঠামো তৈরি করতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, কার্যকর অভিযোজন কৌশল অনুযায়ী অভিবাসীদের মাইগ্রেশন হলে আমরা অবশ্যই এর প্রশংসা করব। আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর অভিযোজন ক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের স্থানান্তর ও সুরক্ষা নিশ্চিতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মনোযোগ দেওয়া দরকার। জলবায়ু পরিবর্তনে বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রয়োজনে আমাদের একটি উপযুক্ত কাঠামো তৈরি নিয়ে আলোচনা করা দরকার। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুতর প্রভাব মানব অভিবাসনের ওপর পড়ছে। সহিংস সংঘাতের চেয়েও চরম আবহাওয়ার বেশি মানুষকে স্থানচ্যুত করছে।

ধীরে ধীরে সমুদ্র-স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি ও মরুকরণের মতো ঘটনার দিকে বিশ্বের মনোযোগ কম উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ভারসাম্যহীনতা সংশোধনে আমাদের অবশ্যই একত্রে কাজ করতে হবে। ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম (সিভিএফ) নেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে আছি যেখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের দাবি রাখে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তারা তা পাচ্ছে না। সিভিএফ এবং ভি-২০ দক্ষিণ-দক্ষিণ এবং ত্রিভুজাকারী সহযোগিতার দুর্দান্ত উদাহরণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা বর্তমান অর্জনগুলোকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।

জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের ১.১ মিলিয়ন রোহিঙ্গা নাগরিকের জন্য পরিবেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ পরিবেশ ধ্বংসের সবচেয়ে বাজে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

তিনি বলেন, ঝুঁকি, প্রভাব ও মোকাবিলার সক্ষমতা অভাবের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে একটা মানদণ্ড ঠিক করতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, প্রধান দূষণ বা কার্বন নির্গমনকারীরা দূষণ কমাতে চরম অনীহা দেখাচ্ছে যা আন্তর্জাতিক জলবায়ু শাসনব্যবস্থা ধ্বংস ও বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আরও বিপদের ঝুঁকিতে ফেলবে। সুতরাং, নিষ্ক্রিয়তার জবাবদিহিতা চেয়ে আমাদের দ্বিধা করা উচিত নয়।

২০২০ সালে নেদারল্যান্ডসে ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন সামিটে অভিযোজন প্রচেষ্টা আরও শক্তিশালী হবে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সদস্য দেশগুলো সম্মত হলে বাংলাদেশ জলবায়ু ভালনারেবল ফোরামের প্রেসিডেন্সির দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোকাবিলার সক্ষমতার অভাব, বিশেষ করে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধ্বংসযজ্ঞে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর দায় খুবই নগণ্য বা কোনো অবদানই নেই। এটি গুরুতর অন্যায় এ কথা বিশ্ব সম্প্রদায়কে স্বীকার করতে হবে।

ইউএনএফসিসিসির সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ইউএনএফসিসিসি (ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ) খুবই ধীর ও অত্যন্ত অপ্রতুল। আমাদের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো অভিযোজনের সহায়তায় কদাচিতই উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সমাজের ‘অসুস্থতা’ নির্মূল করা হবে : গত রোববার সন্ধ্যায় স্পেনে হোটেল ভিলা মাগনায় তার সম্মানে বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে (স্পেনের স্থানীয় সময়) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সরকারের চলমান অভিযান অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সমাজের এই ‘অসুস্থতা’ নির্মূল করা হবে।

তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ২১ বছর ধরে দেশ শাসনকারীদের অপকর্মের কারণে অনেক ময়লা ও আবর্জনা জমে গেছে এবং মানুষের চরিত্রে ভাঙন ধরেছে।

স্পেনে ও ইউরোপের অন্যান্য দেশে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

নিজেকে বাংলাদেশের জনগণের ‘সার্বক্ষণিক কর্মী’ হিসেবে অভিহিত করে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি জনসাধারণের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানোর জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশের জনগণের একজন সার্বক্ষণিক কর্মী। আমি বিরামহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছি যাতে শহর ও গ্রাম উভয় এলাকার মানুষ আমাদের কাজের সুফল পেতে পারে।

শেখ হাসিনা বলেন, একশ্রেণির মানুষ ঘুষ-দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়ে, সন্ত্রাস করে, লোকজনের সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে বিলাসী জীবনযাপন করতে চায় এবং তারা বলতে চায় যে ‘মুই কি হনুরে’। তিনি বলেন, কিন্তু আমরা চাই মানুষের মধ্যে এই ধরনের মানসিকতা থাকবে না এবং সমাজের এই অসুস্থতা নির্মূল করতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের নাম শুনলে অন্যান্য দেশের মানুষ এখন বাংলাদেশকে সম্মান করে। কিন্তু তারা আগে জানতো যে বাংলাদেশ হচ্ছে বন্যা, খরা, দুর্ভিক্ষ ও দুর্নীতির দেশ। বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় বাংলাদেশ পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কিন্তু এখন সে দুর্নাম ঘুচে গেছে।

রেমিট্যান্টস পাঠালে দুই শতাংশ প্রণোদনা : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের কল্যাণে তার সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রবাসীদের উৎসাহিত করতে রেমিট্যান্টস পাঠালে সরকার দুই শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে।

দেশের জিডিপির হার ৮ দশমিক ১৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং দারিদ্র্যের হার ৪১ থেকে ২১ শতাংশে নেমে এসেছে। আমরা প্রত্যেক জায়গায় বিদ্যুৎ পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ করছি এবং আমরা চাই যে, একটি বাড়িও অন্ধকারে থাকবে না।