বিষে ভরা বাতাস

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

বিষে ভরা বাতাস

সুলতান মাহমুদ ১০:৪৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২২, ২০১৯

print
বিষে ভরা বাতাস

শীত আসার আগেই চরম ‘অস্বাস্থ্যকর’ হয়ে উঠেছে রাজধানীর বাতাস। ঢাকার বাতাসে ভাসমান বস্তুকণার উপস্থিতি সহনীয় মাত্রার চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বাতাস এখন সীসা, কার্বন, অ্যাসবেসটসের মতো ভারী কণা বা বিষে এতটাই আক্রান্ত যে হৃদরোগ, শ্বাসকষ্টজনিত জটিল সমস্যা, ফুসফুসে সংক্রমণ ও ক্যান্সারের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন শিশু ও গর্ভবতী নারীরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণে জরুরি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক ডেকেছে পরিবেশ অধিদফতর।

পরিবেশ অধিদফতর ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইটভাটা, অবকাঠামো নির্মাণ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া ধোঁয়া ও ধুলার কারণে ওই দূষণ বেশি ঘটছে। রাজধানীর কয়েকটি এলাকা ইতোমধ্যে ধুলার রাজ্যে পরিণত হয়েছে। গাড়ির কালো ধোঁয়া এবং যত্রতত্র আগুনে আবর্জনা পোড়ানোয় পরিবেশ আরও বিষিয়ে উঠছে।

চলতি বছরের শুরু দিকেও বায়ুদূষণ চরম আকার ধারণ করেছিল। তখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংশ্লিষ্টদের তলব করে বায়ুদূষণ রোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা জানতে চেয়েছিল। তখন ঢাকা সিটি করপোরেশন উচ্চ আদালতে যে জবাব দিয়েছিল তাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না হাইকোর্ট। এরপরে বর্ষাকালে বাতাসের পিএম (পার্টিকুলেট ম্যাটার) অনেকটা কমে আসে।

এখন নভেম্বর মাসে আবার রাজধানীর বায়ুদূষণ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আস্তে আস্তে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করতে পারে। বর্তমানে ঢাকার বাতাসে পিপিএম হচ্ছে ২৩০। অক্টোবর পর্যন্ত যা ২০০-এর নিচে ছিল। দ্রুত বাতাসের পিপিএম বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্টরা উদ্বিগ্ন। এমন পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতে আগামী ২৫ নভেম্বর সরকার আন্তঃমন্ত্রণালয়ে বৈঠক ডেকেছে।

জানা গেছে, বাতাসে ভাসমান বস্তুকণার (পার্টিকুলেট ম্যাটার-পিএম) পরিমাপ করা হয় প্রতি ঘনমিটারে মাইক্রোগ্রাম (পিপিএম-পার্টস পার মিলিয়ন) এককে। এসব বস্তুকণাকে ১০ ও ২.৫ মাইক্রোমিটার ব্যাস শ্রেণিতে ভাগ করে তার পরিমাণের ভিত্তিতে ঝুঁকি নিরূপণ করেন গবেষকরা।

তারা বলছেন, বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে ২.৫ মাইক্রোমিটার ব্যাসের বস্তুকণার পরিমাণ (পিপিএম) যদি শূন্য থেকে ৫০ এর মধ্যে থাকে, তাহলে ওই বাতাসকে বায়ু মানের সূচকে (একিউআই) ‘ভালো’ বলা যায়। এই মাত্রা ৫১-১০০ হলে বাতাসকে ‘মধ্যম’ মানের এবং ১০১-১৫০ হলে ‘বিপদসীমায়’ আছে বলে ধরে নেওয়া হয়। আর পিপিএম ১৫১-২০০ হলে বাতাসকে ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২০১-৩০০ হলে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০১-৫০০ হলে ‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর’ বলা হয়।

বর্তমানে ঢাকার সিটি করপোরেশন এলাকার ১১টি স্থানের বাতাসে ২.৫ মাইক্রোমিটার ব্যাস পর্যন্ত অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার পরিমাণ নিয়মিত পরিমাপ করা হয় ‘সিএএসই’ প্রকল্পের মাধ্যমে। পরিবেশ অধিদফতর বলছে, চলতি মাসের শুরুতেই ঢাকার বাতাস ‘অস্বাস্থ্যকর’ মাত্রায় পৌঁছে যায়।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আসার আগে প্রতিদিনই বাতাসে ভাসমান বস্তুকণার পরিমাণ ছিল ১৫০ পিপিএম এর উপরে। বুলবুলের প্রভাবে বৃষ্টির কারণে বাতাসে ভাসমান বস্তুকণার পরিমাণ কিছুটা কমে আসে। ১১ নভেম্বর পর্যন্ত ওই পরিমাণ ছিল ১০০ পিপিএম এর নিচে। কিন্তু তারপর আবার তা বাড়তে শুরু করে এবং ১৩ নভেম্বর তা ২৩০ পিপিএমে, অর্থাৎ ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ মাত্রায় পৌঁছে যায়। গত ১৯ নভেম্বর ছিল ২২০ পিপিএম।

পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুমান ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক জিয়াউল হক বলেন, ঢাকা শহরে অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, গাড়ির ধোঁয়া ও আশপাশের ইটের ভাটাগুলোর কারণে প্রতিবছর এ সময় বায়দূষণ বেড়ে যায়। এ বছর অক্টোবর পর্যন্ত এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ২০০ পিপিএমের নিচে ছিল। বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং নির্মাণকাজ জোরেশোরে শুরু হওয়ায় গত কয়েকদিনে সেটা আবার উপরে চলে গেছে।

তিনি আরও বলেন, ঢাকায় যেসব ট্রাক ঢুকছে তার বেশির ভাগই খোলা। যে কারণে ট্রাক থেকেও ঢাকায় ধুলার সৃষ্টি হয়। এগুলো যাদের দেখার দায়িত্ব তাদের বিষয়টি ভালোভাবে দেখতে হবে। রাজধানীতে এখনো অনেক পুরনো গাড়ি চলাচল করছে। এসব গাড়ি থেকে কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। সিটি করপোরেশনের মধ্যে অনেক সময় দেখা যায় বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে, এগুলো বন্ধ করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসতন্ত্রের রোগ বেশি হতে পারে। এখন আবহাওয়া শুষ্ক। এ সময় শ্বাসতন্ত্রের রোগ ছাড়াও চর্মরোগ, বয়স্ক মানুষের শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা হয়। বিশেষ করে বাচ্চারা এবং বয়স্করা বায়ুদূষণের কারণে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। গর্ভবতী নারীরাও ঝুঁকিতে থাকেন। তিনি আরও বলেন, বাতাস যেহেতু নাক-মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে সেহেতু দূষিত বাতাস গ্রহণ করায় নানা ধরনে রোগ বালাই হতে পারে।

এরমধ্যে এক. রাইনাইটিস রোগ হয়। রাইনাইটিস হলো অ্যালার্জিজনিত নাকের প্রদাহ, তাছাড়া হাঁচি ইত্যাদি হয়। দুই. মুখ দিয়ে যায় বলে গলায় ছোট ছোট সর্ট বা টনসিল জাতীয় এক ধরনের রোগ হয়, গলায় কাশি এগুলো হয়। তিন. শ্বাসটা যেহেতু বুকে যাচ্ছে তাই ব্রঙ্কাইটিস হয়, হাঁপানি হয়, অ্যাজমা হয়, এমনকি ফুসফুসে ক্যান্সারও হতে পারে। আর অনেক সময় বায়ু পেটেও যেতে পারে। পেটে গেলে গ্যাস্ট্রিক বা বদহজম এগুলো হতে পারে। চার. ছোট বাচ্চারা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। পাঁচ. গর্ভবতী মহিলারাও বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। কেননা বাতাস তাদের পেটের মধ্যে যাচ্ছে। ফলে গর্ভের সন্তানের ত্রুটি হতে পারে। হাবাগোবা হতে পারে ব্রেন ডাল এগুলো হতে পারে। ছয়. বায়ুদূষণে সীসা ঢোকে, সীসা ঢুকলে রক্তশূন্যতাও দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন, বিদ্যমান যে আইন আছে সেগুলোর কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত।

জানা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় শীর্ষ স্থানটি ছয়টি শহরের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। কোনো দিন বা সময়ে ঢাকা, আবার কখনো দিল্লি। করাচি, কলকাতা ও লাহোরও পিছিয়ে নেই। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে এসব শহরের নাম ওঠানামা করছে। বিশ্বের বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের পর্যবেক্ষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিশ্বের যেসব শহরে বায়ুদূষণ কমানো হয়েছে, সেখানে কঠোর আইন করা হয়েছে। আর তা বাস্তবায়নে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আনা হয়েছে। আমাদের এখানে এখনো বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইনটাই হয়নি। আর ঢাকাসহ দেশের বেশির ভাগ শহরের বায়ুদূষণের উৎসগুলো আমরা জানি। স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগে তা দূর করা সম্ভব।

যেমন : শীতকালে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নির্মাণকাজের ধুলা বেড়ে যায়। এমনকি মেট্রো রেলের মতো সরকারের বড় প্রকল্পগুলো থেকেও প্রচুর ধুলা বের হচ্ছে। কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণে কোনো সরকারি দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখি না। যানবাহন থেকে কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণেও কাউকে মাঠে দেখা যায় না। তাহলে বায়ুদূষণ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হবে? সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

বৈশ্বিক বায়ুদূষণের ঝুঁকিবিষয়ক ‘দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের যে পাঁচটি দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে, তার একটি বাংলাদেশ। আর বায়ুদূষণজনিত কারণে মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ পঞ্চম। বায়ুদূষণে ২০১৭ সালে দেশে মারা গেছে এক লাখ ২৩ হাজার মানুষ।