উদারতায় মুগ্ধ ডেনমার্কের তরুণরা

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

উদারতায় মুগ্ধ ডেনমার্কের তরুণরা

ছাইফুল ইসলাম মাছুম ৯:৩৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২২, ২০১৯

print
উদারতায় মুগ্ধ ডেনমার্কের তরুণরা

কক্সবাজারে ডেনমার্ক ও বাংলাদেশের ৫৩ তরুণকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ইয়ুথ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম। মোটেল উপলে অনুষ্ঠিত ১৪ দিনের এই আয়োজনে অংশ নিয়েছিলেন ডেনমার্কের ২৬ তরুণ। তারা ঘুরে ঘুরে দেশের মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, দেখেছেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

নিজ চোখে দেখা বাংলাদেশ সম্পর্কে ডেনমার্কের তরুণদের ভাবনা জানতে কথা হয় তিনজনের সঙ্গে। রোজা ক্লাভার রাংস্টেড, ক্রিস্টিনা জনসন ও ফ্রিটজ রিখটার জানিয়েছেন এ দেশের সাধারণ মানুষের বন্ধুত্ব, আতিথেয়তা আর প্রাণবন্ততায় তারা মুগ্ধ।

সুযোগ পেলে আবার আসবেন রোজা

রোজা ক্লাভার রাংস্টেড (১৯)। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহাগেনে। পড়ছেন ওখানকার এফজেইউ স্কুলে। আগে ২৬টি দেশ ঘুরলেও, রোজা এবার প্রথমবারের মতো ইয়ুথ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে বাংলাদেশে এসেছেন। বাংলাদেশের মানুষের হাসি-খুশি স্বভাব তার বেশি ভালো লেগেছে। তার মতে, ডেনমার্কের তরুণরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিভৃতচারী, কিন্তু বাংলাদেশি তরুণরা অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও বন্ধুসুলভ। বাঙালি রকমারি খাবারেও তিনি দারুণ মুগ্ধ। ডেনমার্ক শীতপ্রধান দেশ হলেও, বাংলাদেশের গরম আবহাওয়া খুব খারাপ লাগেনি রোজার। সবুজ প্রকৃতি তাকে মুগ্ধ করেছে। মনের আনন্দে সাঁতার কেটেছেন কক্সবাজারের সমুদ্রে।

রোজা বলেন, ‘ইয়ুথ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে বাংলাদেশে এসে প্রচুর বন্ধু পেয়েছি। শিখেছি কীভাবে প্রজেক্ট তৈরি করতে হয়। কীভাবে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খুঁজতে হয়। আর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে তাদের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা জেনেছি।’ বাংলাদেশের সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য কাজ করছে তা দেখে রোজার ভালো লেগেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে চান তিনি। সুযোগ পেলে আবারও আসতে চান বাংলাদেশে।

ছোট দেশের বড় উদারতা মুগ্ধ করেছে ক্রিস্টিনাকে

ক্রিস্টিনা জনসনের (২২) জন্ম ও বসবাস ডেনমার্কের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আরাসে। ওই শহরের ভিআইএ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি গ্লোবাল বিজনেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছেন। ইয়ুথ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অংশ নিতে বাংলাদেশে এসেছিলেন তিনি। ক্রিস্টিনা জানান, বাংলাদেশে আসার আগে এই দেশ সম্পর্কে তেমন কিছু জানতাম না। কিন্তু আসার পর ধারণা পাল্টে গেছে। বাংলাদেশের মানুষ অনেক বেশি বন্ধুসুলভ। যুবকদের মধ্যে এগিয়ে চলার মানসিকতা আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অসাম্প্রদায়িক মনে হয়েছে।

বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে অনেক রাখডাক রয়েছে বলে মনে হয়েছে তার। ক্রিস্টিনা বলেন, ডেনমার্কের তরুণরা অনেক বেশি খোলামেলা। সেখানে যৌনতা, লৈঙ্গিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে। ডেনমার্কে সোশ্যাল মিডিয়া কেবল যোগাযোগের টুলস হিসেবে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া বিনোদন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ডেনমার্কের তরুণরা যেটা পারে সেটাই শুধু করে। কিন্তু বাংলাদেশের তরুণরা না পারলেও চ্যালেঞ্জ নেয়।

ক্রিস্টিনা শরণার্থী সংকট দেখতে অনেক দেশে ঘুরেছেন, গিয়েছেন মিয়ানমারেও। রোহিঙ্গা ইস্যুর কারণে বাংলাদেশের প্রতি ক্রিস্টিনার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ক্রিস্টিনা বলেন, বাংলাদেশ দেশ ছোট দেশ হলেও, বড় উদারতা দেখিয়েছে। মানবিক কারণে ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে।

ক্রিস্টিনা জানান, মিয়ানমারের মানুষ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চরম ঘৃণা ছড়াচ্ছেন। তারা বলছেন ‘রোহিঙ্গারা বাঙালি’। কিন্তু ঐতিহাসিক কারণে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য। ইতিহাস বিবেচনা করে পৃথিবীর দেশে দেশে শরণার্থী সমস্যার সমাধান করা উচিত। ক্রিস্টিনার জীবন নিয়ে বড় কোনো স্বপ্ন নেই। তার ভাবনা, আজকের চেয়ে আগামীতে ভালো থাকা।

বাংলাদেশকে অনেক ভালোবাসি

ফ্রিটজ রিখটার (২০) ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহাগেনের এফজেইউ স্কুলের শিক্ষার্থী। তিনি ২৫টি দেশে ঘুরেছেন। ফ্রিটজ জানান, বাংলাদেশের মানুষ অনেক ভালো। তারা তার সঙ্গে মিশেছে, তাকে ভালোবেসেছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে ফ্রিটজের ভাবনার জগৎটাই বদলে গেছে। তিনি বলেন, ইন্টারনেটে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে কিছু তথ্য পেলেও, কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে সরাসরি অনেক কিছু জানার সুযোগ পেয়েছি। সেখানে ছোট্ট একটু জায়গায় লাখ লাখ মানুষের কষ্টের জীবন। একসঙ্গে বসতি, অথচ প্রত্যেকের আলাদা আলাদা গল্প। ভবিষ্যৎহীন বিষণ্ন রোহিঙ্গা জনপদ।

ফ্রিটজ সাংস্কৃতিক জগতে বড়মাপের মানুষ হতে চান। শরণার্থী সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখতে চান। ফ্রিটজ বলেন, আমি অবশ্যই বাংলাদেশে ফিরবো। আমি বাংলাদেশকে অনেক ভালোবাসি।

দ্য আর্থ সোসাইটির আয়োজনে গত ২ থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজারের মোটেল উপলে ইয়ুথ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্য আর্থ সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ইন্টার কলেজ, ইয়ুথ অ্যাকশন ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ইরাসমাস প্লাস।