খেলে যাচ্ছে খেলারাম

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

খেলে যাচ্ছে খেলারাম

মনোজ দে ১০:৪৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২০, ২০১৯

print
খেলে যাচ্ছে খেলারাম

নতুন পরিবহন আইন কার্যকর হওয়ার পর গতকাল বুধবার তৃতীয় দিনের মতো আন্দোলন নামেন পরিবহন শ্রমিক ও মালিকরা। এতে কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে দেশের বেশির ভাগ সড়ক-মহাসড়ক। রাজধানী ঢাকার রাস্তা থেকেও তুলে নেওয়া হয় গণপরিবহন। ফলে সারা দিনই ভুগতে হয়েছে নগরবাসীকে। এর ওপর গতকাল থেকে শুরু হওয়া ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ধর্মঘটে পণ্য চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাড়তে শুরু করেছে সবজির দাম। সহসা এ সংকটের সমাধান না হলে নিত্যপণ্যের দামে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে কর্মবিরতির নামে বাসে অঘোষিত ধর্মঘট ও পণ্যবাহী পরিবহন ধর্মঘটের কারণে জনদুর্ভোগ উঠেছে চরমে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট গাড়ি, মোটরসাইকেল চলাচলেও বাধা সৃষ্টি করেন বিভিন্ন টার্মিনাল ও সড়কে অবস্থান নেওয়া শ্রমিকরা। মারধর, হয়রানি, যাত্রীদের মুখে কালি মেখে দেওয়া, গাড়ি ভাঙচুর ও গ্লাসে পোড়া মবিল ছুড়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে কোথাও কোথাও।

এতে করে অসুস্থ, বৃদ্ধ, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী এবং অফিসগামী যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আপনারা জনগণকে শাস্তি দেবেন না। শাস্তির ভয়ে জনগণকে শাস্তি দেবেন না। জনগণকে দুর্ভোগে ফেলবেন না প্লিজ।’ এ দিকে ভুক্তভোগী নাগরিক এবং বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি অনতিবিলম্বে ধর্মঘট ও কর্মবিরতি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছর শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় সড়ক পরিবহন আইন সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। শাস্তি বাড়িয়ে পয়লা নভেম্বর থেকে পাস হয় এ আইন। জরিমানা কমানো, শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত শিথিল করাসহ কয়েকটি ধারা সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছিল পরিবহন সংগঠনগুলো। নতুন আইন সম্পর্কে মালিক-চালক ও পথচারীদের সচেতন করার নানা উদ্যোগ নেওয়ার পর গত ১৮ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয় এ আইন।

প্রথমে সহনীয় জরিমানা ও শাস্তির মাধ্যমে এ আইন বাস্তবায়নের কৌশল নেয় সরকার। কিন্তু পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো কর্মবিরতির আরও কৌঁসুলি পথে নামে। প্রথমদিন দক্ষিণবঙ্গের দশটি জেলায় বাস বন্ধ করে দেয়। দ্বিতীয় দিন এর পরিধি বেড়ে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলা যুক্ত হয়। সেই সঙ্গে পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডাকে। ওই দিন রাতে পরিবহন সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠকে বসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু সেই বৈঠকে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের চাওয়ার বাস্তবায়ন না হওয়ায় আরও চাপ বাড়ানোর পথে হাঁটে তারা।

বুধবার তৃতীয় দিন দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সড়ক পথে রাজধানী যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে শ্রমিকদের বাধায় বুধবার সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলেনি কোনো যানবাহন। দুপুরের পর শ্রমিকরা মহাসড়ক ছেড়ে গেলেও গণপরিবহন স্বল্পতায় ভুগতে হয়েছে যাত্রীদের। ঢাকা-ময়মনসিংহ এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানেও শ্রমিকদের বাধার কারণে বাস চলেছে সীমিত। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক থেকে বাস উঠিয়ে নেওয়ায় নগরবাসী দুর্ভোগে নাকাল হন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সড়ক আইনে কার্যকর হলে বছরের পর বছর ধরে সড়কে যে নৈরাজ্য সেখান থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাবে সাধারণ মানুষ। শাস্তির ভয়ে পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের মধ্যেও আইন মেনে যানবাহন চালানোর প্রবণতা বাড়বে। এতে বেপরোয়া প্রতিযোগিতা, রেষারেষি বন্ধ হবে। কমে আসবে দুর্ঘটনা। কিন্তু পরিবহন সেক্টরকে নিয়ন্ত্রণ করছে যে সব ‘মাফিয়া’ তারা তাদের স্বার্থে শ্রমিকদের ভুল বুঝিয়ে ও উসকানি দিয়ে আন্দোলনে নামাচ্ছে। জনগণকে জিম্মি করে ও জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে সরকারকে চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী পরিবহন ধর্মঘটের পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে দাবি করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, একটি চিহ্নিত কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী পরিবহন সেক্টরে প্রভাব বিস্তার করে নানা সময়ে সরকারের ভালো কাজগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।

এই গোষ্ঠী জনগণের প্রত্যাশিত নতুন সড়ক আইন বাস্তাবায়নে বাধা দিচ্ছে। তারা নিরীহ শ্রমিকদের মধ্যে গুজব রটিয়ে ফায়দাতন্ত্র হাসিল করতে চায়। কেননা, এই মহলটি পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি, ধান্ধাবাজি, নৈরাজ্য জিইয়ে রেখে দীর্ঘদিন তাদের কায়েমীস্বার্থ হাসিল করে আসছিল। নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়ন হলে তাদের এহেন অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হওয়ার শঙ্কায় তারা আবার নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মো. নাসিম এ অস্থিরতার পেছনে ‘মাফিয়াচক্র’ রয়েছে বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘একটু ধৈর্য ধরুন। আপনারা দু-একদিন একটু কষ্ট করেন। দেখবেন, ওই সমস্ত মাফিয়াচক্র ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। পরিবহন সেক্টরের নেতারা সবাই রাজনীতি করে। কিন্তু তারা চাঁদার ব্যাপারে সবাই একমত। ওখানে কমিউনিস্ট নেতার সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতার কোনো পার্থক্য নাই, বিএনপি নেতার সঙ্গে জামায়াত নেতার কোনো পার্থক্য নাই। এমনকি এই চাঁদাবাজির সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও জড়িত আছে। এই পরিবহন সেক্টরের চাঁদার সমস্যা সমাধান করতে পারলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে।’

যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকে ঘোষিত-অঘোষিত ধর্মঘটের পেছনে যে পরিবহন মাফিয়া ও সিন্ডিকেট কলকাঠি নাড়ছে তা বলাই বাহুল্য। সারা দেশে পরিবহন সেক্টর থেকে সুবিধাভোগী নেতার সংখ্যা নেহাতই কম নয়। এদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক নেতা। ভিন্ন মতাদর্শের হলেও স্বার্থগত জায়গায় তারা একাট্টা। এর আগেও যতবার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাবার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার ততবারই এসব সুবিধাভোগী শ্রমিকদের রাস্তায় নামিয়ে তাণ্ডব চালাতে ইন্ধন দিয়েছে। জনগণের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে শ্রমিকদের। তাদের এসব অপকৌশলের কাছে বারবার পিছু হটতে হয়েছে সরকারকে। বরারবের মতো এবার ‘খেলে যাচ্ছে সেই খেলারামরা’।

নতুন সড়ক আইন সংশোধন ও শাস্তি কমানোর দাবিতে পরিবহন শ্রমিকদের যে কর্মবিরতি ও ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিকদের যে ধর্মঘট সেই কর্মসূচিতে না থাকলেও তাদের উত্থাপিত দাবির সঙ্গে নিজেদের সমর্থন জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের প্রধান দুটি সংগঠনের শীর্ষ নেতা শাজাহান খান এবং মসিউর রহমান রাঙ্গা। তারা দুজনই সাবেক মন্ত্রী।

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শাজাহান খান ও মসিউর রহমান রাঙ্গা জানিয়েছেন, তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে ধর্মঘট বা কর্মবিরতির কোনো কর্মসূচি নেওয়া হয়নি। কিন্তু তারা শ্রমিকদের দাবিকে সমর্থন করেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খান বলেছেন, সরকারের গঠিত কমিটিতে তারা আইনটিতে বিভিন্ন অপরাধের ব্যাপারে জরিমানা কমানোসহ বেশ কিছু সংশোধনী প্রস্তাব করেছিলেন। সেই আলোচনা যখন চলছিল তার মধ্যেই আইনটি কার্যকর করা হয়েছে।

তিনি বলেন, একজন ড্রাইভারকে যদি পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়, তারপক্ষে সেই টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। চালককে অষ্টম শ্রেণি এবং তার সহকারীকে পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে। এখন একজন দীর্ঘদিন সহকারীর কাজ করে তারপর চালক হলে সে অষ্টম শ্রেণির সার্টিফিকেট কোথায় পাবে? এটা শিথিল করার কথা আমরা বলেছি। এগুলোসহ আরও কিছু বিষয়ে সংশোধনীর প্রস্তাব আমরা দিয়েছি।’

নিজেরা সরাসরি ধর্মঘট না ডাকলেও বুধবার রাজধানী ঢাকার গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান বাস টার্মিনালে পরিবহন শ্রমিকরা বাধা দেয় যানবাহন চলাচলে। তারা যাত্রীদের লাঞ্ছিতও করেন। ঢাকার বিভিন্ন রুট থেকে তুলে নেওয়া হয় গণপরিবহন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, ‘ট্রাক শ্রমিকরা ধর্মঘট ডেকেছে। এর সঙ্গে মালিকদের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে দুচারজন মালিকও এতে যুক্ত হয়েছেন। বুধবার সকাল থেকে শ্রমিকরা বিভিন্ন স্থানে বাসসহ অন্য যানবাহন চলাচলে বাধা দিচ্ছে। গাড়িতে কালি মেখে দিয়েছে। এ অবস্থায় আমরা কীভাবে গাড়ি নামাই?’