গুজবে লবণ কেনার হিড়িক

ঢাকা, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গুজবে লবণ কেনার হিড়িক

মনোজ দে ১০:৩২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৯, ২০১৯

print
গুজবে লবণ কেনার হিড়িক

গত মৌসুমে লবণ উৎপাদনে ৫৮ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে। দেশে যেখানে বছরে লবণের চাহিদা ১৬ লাখ মেট্রিক টন সেখানে মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে ১৮ লাখ মেট্রিক টন। অতি উৎপাদনের কারণে ঠিকমতো দাম পাননি লবণচাষিরা। অথচ সেই লবণ নিয়ে ঘটে গেল তুলকালাম। ‘লবণের দাম বেড়ে কেজিতে ১০০ টাকার উপরে হচ্ছে’- এ রকম একটা গুজব গত দুইদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মোবাইল ফোন ও লোকমুখেও তা ছড়াতে থাকে।

গত দেড় মাসে দফায় দফায় পেঁয়াজের দাম যে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে সে প্রেক্ষাপটে লবণের দাম বাড়ার গুজব খুব দ্রুত ডালপালা মেলে। গত পরশু রাতে সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, গোপালগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, সুনামগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় বেশি দামে লবণ বিক্রির খবর আসতে শুরু করে। গতকাল সোমবার সকাল থেকে রাজধানী ঢাকায় লবণ কেনার হিড়িক পড়ে যায়। বিকালের পর পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে ঢল নামে লবণ কিনতে।

একবারে অনেক মানুষ প্রয়োজনের চেয়েও বেশি লবণ কেনায় কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয় সংকট। অনেক জায়গাতেই লবণ বিক্রি হয় বেশি দামে। লবণ না পেয়ে অনেক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঢাকার বাইরে অন্য জেলাগুলোতেও লবণ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল সন্ধ্যায় লবণের দাম নিয়ে যারা গুজব ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে সরকারি প্রেসনোট দেওয়া হয়। এর আগে দুপুরে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে গণমাধ্যমে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে জানানো হয়, চাহিদার থেকে ছয়গুণ বেশি লবণ মজুদ আছে দেশে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যের দাম বাড়ার কোনো সুযোগ নেই। গুজবে কাউকে কান না নেওয়ার পরামর্শ দেয় মন্ত্রণালয়। কেউ যাতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বেশি মূল্যে লবণ বিক্রি করতে না পারে সে জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘একটি স্বার্থান্বেষী মহল লবণের সংকট রয়েছে মর্মে গুজব রটনা করে অধিক মুনাফা লাভের আশায় লবণের দাম অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।’

লবণের মজুদের কোনো সংকট নেই জানিয়ে শিল্প মন্ত্রণালয় জানায়, দেশে প্রতি মাসে ভোজ্য লবণের চাহিদা কম-বেশি ১ লাখ মেট্রিক টন। অন্যদিকে লবণের মজুদ আছে সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টন। সে হিসাবে লবণের কোনো ধরনের ঘাটতি বা সংকট হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’

বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, মজুদ লবণের মধ্যে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের লবণ চাষিদের কাছে ৪ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন এবং বিভিন্ন লবণ মিলের গুদামে ২ লাখ ৪৫ হাজার মেট্রিক টন রয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে বিভিন্ন লবণ কোম্পানির ডিলার, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে লবণ মজুদ রয়েছে। পাশাপাশি চলতি নভেম্বর মাস থেকে লবণের উৎপাদন মৌসুম শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া ও মহেশখালী উপজেলায় উৎপাদিত নতুন লবণও বাজারে আসতে শুরু করেছে।’

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, লবণ সংক্রান্ত বিষয়ে তদারকির জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) প্রধান কার্যালয়ে ইতোমধ্যে একটি ‘কন্ট্রোল রুম’ খুলেছে। লবণ সংক্রান্ত বিষয়ে সেখানে যোগাযোগ করা যাবে। কন্ট্রোল রুমের নম্বর- ০২-৯৫৭৩৫০৫ এবং ০১৭১৫-২২৩৯৪৯।

পেঁয়াজের আতঙ্ক ছড়াল লবণেও
রাজধানীর ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার, মিরপুর, বনানী, উত্তরা, মালিবাগ, বাড্ডাসহ বিভিন্ন জায়গায় গতকাল সকাল থেকে মুদি দোকানগুলোতে লবণ কিনতে ভিড় জমান ক্রেতারা। দুপুরের পর কোথাও কোথাও লবণ কিনতে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। বিকালের পর নারী-পুরষ-শিশুদের ঢল নামে মুদি দোকানগুলোতে। কথা বলা জানা যায়, ‘তারা ফেসবুক ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শুনেছেন লবণের কেজি ১০০-১৫০ টাকার উপরে উঠবে’। এ আশঙ্কায় তারা লবণ কিনতে এসেছেন। বেশিরভাগ ক্রেতা দুই থেকে পাঁচ কেজি করেও লবণ কিনতে দেখা যায়। কেউ কেউ ১০-২০ কেজি করেও লবণ কেনেন।

বিভিন্ন এলাকার মুদি দোকানদের সাথে কথা বলে জানা যায়, যেখানে প্রতিদিন তাদের দোকান থেকে ২০-২৫ কেজি লবণ বিক্রি হয় সেখানে গতকাল তারা বিক্রি করেছেন ১৫০-২০০ কেজি। একবারে সবাই দোকানে ভিড় করায় সন্ধ্যার আগেই অনেক দোকানে লবণের মজুদ ফুরিয়ে যায়। লবণের খোঁজে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ছোটেন ক্রেতারা। লবণ না পেয়ে কাউকে কাউকে উষ্মা প্রকাশ করতে দেখা যায়।

গতকাল সোমবার ছিল রাজধানীর কারওয়ানবাজারে সাপ্তাহিক ছুটির দিন। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেখানকার কিচেন মার্কেটের বেশিরভাগ দোকানি তাদের দোকান খোলেন। সে সব দোকানে সারাদিনই লাইন ধরে ক্রেতারা লবণ কেনেন। বিকেলের পর সেখানে লবণের খোঁজে শত শত মানুষের ভিড় দেখা যায়। ক্রেতা ও দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখানে লবণের প্যাকেটের গায়ের দামেই বিক্রি করা হচ্ছে। বাজারে এখন সবচেয়ে ভালো মানের লবণের প্যাকেটের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য লেখা ৩৫ টাকা। আর সাধারণ লবণের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২৫ টাকা।

খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিপণনকারী কোম্পানি এক কেজি লবণ বিক্রি করেন ২৫ থেকে ২৬ টাকা দরে। এত দিন কারওয়ান বাজারের মতো বড় দোকানে এসব লবণ ৩০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যেত। ক্রেতাদের বাড়তি চাপ দেখায় খুচরা বিক্রেতারা আর ছাড় দিয়ে লবণ বিক্রি করেননি।
ঢাকার ফার্মগেট, বনানী, কলাবাগান, ধানমণ্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় অনেক অসাধু ব্যবসায়ী বেশি দামে লবণ বিক্রি করেছেন।

মওকা বুঝে কোথাও কোথাও দাম ওঠে ৮০ টাকা। বনানী কাঁচাবাজারে গতকাল দুপুরে লবণ বিক্রি করা হয় ৫০ টাকা কেজি দরে। বেশি দামে লবণ বিক্রি করায় ভ্রাম্যমাণ আদালত গতকাল রাজধানীর ধানমণ্ডি ও হাজারিবাগ এলাকায় পাঁচ দোকানিকে আটক করা হয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ২০ জন দোকানি ও ব্যবসায়ীকে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। পটুয়াখালীতে একবারে সাত কেজি লবণ কেনায় এক জনকে অর্থদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

লবণ কিনতে আসা ক্রেতারা জানান পেঁয়াজের দামে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে তাতে তারা আতঙ্কিত। কারওয়ান বাজারে লবণ কিনতে আসা রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রসেনজিৎ হালদার বলেন, ‘৩৫ টাকার পেঁয়াজ ২৭০ টাকা হয়ে গিয়েছিল। এখন যদি লবণেও তেমন হয়। তাই কিনে রাখছি।’

গুজব ছড়িয়ে বেশি দামে বিক্রি
যথেষ্ট সরবরাহ ও শক্ত মনিটরিং থাকায় ঢাকায় লবণের দাম না বাড়লেও বেশ কয়েকটি জেলায় নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়েছে লবণ। গুজব ছড়িয়ে বেশি দামে লবণ বিক্রি করায় নেত্রকোনায় তিন ব্যবসায়ীর অর্থদণ্ড হয়েছে, হবিগঞ্জে সাজা দেওয়া হয়েছে চারজনকে। ঠাকুরগাঁও ও গোপালগঞ্জে দুজনকে আটক করা হয়েছে।

খোলা কাগজের জেলা প্রতিনিধিরা জানান, বিভিন্ন স্থানে গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষ ব্যাপক হারে লবণ কিনতে শুরু করলে দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায় এবং এক পর্যায়ে অধিকাংশ দোকানে লবণ ফুরিয়ে যায়।

নেত্রকোনার খালিয়াজুরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম আরিফুল ইসলাম বলেন, গুজব ছড়ানোর পর চরাঞ্চলের সহজ সরল মানুষ হুড়াহুড়ি করে লবণ কিনতে ভিড় জমায় বিভিন্ন দোকানে। কেউ কেউ ৫ কেজি, কেউ কেউ ২০ কেজি করে লবণ কিনছিলেন। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে লবণের কেজি ২০০ টাকা হয়ে যাবে। এতে ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়ায় মঙ্গলবার দুপুরের আগে ডিলার ও অনেক পাইকারির ব্যবসায়ীর গুদাম শূন্য হয়ে যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কেউ যাতে একবারে দুই কেজির বেশি লবণ কিনতে না পারে সেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয় সেখানে।

দেশের প্রায় জেলাতেই গতকাল দুপুরের পর থেকে দ্রুত লবণের দাম বাড়ার গুজব ছড়াতে থাকে। বিশেষ করে ঢাকার পরিস্থিতি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আত্মীয়স্বজনরা জানতে পারার পর শত শত মানুষ ভিড় করে দোকানগুলোতে। স্থানীয় প্রশাসন মাইকিং করে এভাবে লবণ না কেনার জন্য জানায়। এ ধরনের গুজবে কান না দেওয়ার জন্যও অনুরোধ জানায়। তবে পেঁয়াজের সংকটের কারণে জনসাধারণের মধ্যে সংশয় থাকায় তারা লবণের খোঁজে ভিড় করে দোকানে।

লবণের উদ্বৃত্তে বিপাকে কোম্পানি ও চাষিরা
৫৮ বছরের রেকর্ড ভেঙে গত মৌসুমে লবণের সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয়েছে দেশে। উদ্বৃত্ত লবণের কারণে দাম পড়ে যাওয়ায় বিপাকে রয়েছেন চাষিরা। বাড়তি লবণের কারণে লবণ বিপণনকারী কোম্পানিগুলোকে মাসুল গুণতে হচ্ছে। চাহিদা কম থাকায় ‘মন্দা’ লবণের বাজারে।

লবণ সরবরাহকারী শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এসিআই সল্টের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, লবণের দাম বাড়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ গুজব। লবণ সরবরাহের কোনো সমস্যা নেই। ক্রেতাদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

এদিকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সরকারি এক প্রেস নোটে হুঁশিয়ারি করে বলা হয়েছে, ‘লবণ নিয়ে কিংবা অন্য কোনো বিষয়ে কোনো ব্যক্তি বা মহল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য কোনোভাবে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’