জিম্মি কৌশলেই মালিকরা

ঢাকা, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

জিম্মি কৌশলেই মালিকরা

নতুন সড়ক আইন

শফিক হাসান ১০:৫৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৮, ২০১৯

print
জিম্মি কৌশলেই মালিকরা

সড়কে নতুন আইন বাস্তবায়নের প্রথম দিনেই যাত্রী জিম্মির পুরনো কৌশলে হেঁটেছে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। গতকাল সোমবার তাদের অঘোষিত ধর্মঘটে কয়েকটি জেলার যাত্রীদের পোহাতে হয়েছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। নতুন সড়ক আইন প্রয়োগ শুরু হয়েছে গত রোববার থেকে। প্রথম দিনে মালিক-শ্রমিকরা মোটামুটি পর্যবেক্ষকের ভূমিকা নিলেও আইন প্রয়োগের দ্বিতীয় দিন গতকাল থেকে ‘আইন না মানার’ আন্দোলন আরও বড় পরিসরে পৌঁছেছে। গতকাল ঢাকার সড়কে ৮৮টি মামলা হয় বিভিন্ন পরিবহনের বিরুদ্ধে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, যত চাপই থাকুক সরকার সড়ক আইন বাস্তবায়ন করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, শ্রমিক ধর্মঘটের পরিধি আজ মঙ্গলবার থেকে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা বরাবরের মতো পুরনো কৌশলেই সরকার এবং সাধারণ মানুষকে জিম্মির পাঁয়তারা করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিবহন খাতে যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা ও পেশিশক্তির যে অপসংস্কৃতি চালু রয়েছে তা ভাঙা না গেলে শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে না। অভিযোগ রয়েছে, মালিকপক্ষ বরাবরই শ্রমিকদের ভুলভাল বুঝিয়ে উসকানি দিয়ে মাঠে নামায়। শ্রমিকরাও অনেক ক্ষেত্রে না বুঝেই মালিকদের পাতা ফাঁদে পা দেয়। মালিকপক্ষ একদিকে যেমন সরকার ও যাত্রী সাধারণকে জিম্মি করছে স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে, পরিবহন শ্রমিকদের কৌশলে জিম্মি করে রেখেছে তারা। শ্রমিকরাও না বুঝেই জনবিরোধী অবস্থান নিচ্ছেন।

গতকাল ১০টিরও বেশি জেলায় বন্ধ থাকে সড়ক যোগাযোগ। রাজশাহীও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দেশের সঙ্গে। সীমাহীন যাত্রী দুর্ভোগের এখানেই শেষ নয়; বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন করে যাত্রী জিম্মির শুরু হয়েছে, তা কতদিন পর্যন্ত চলবে আপাতত অনুমানের সুযোগ নেই। মালিক-শ্রমিকদের আপত্তির কারণ বিভিন্ন অপরাধে শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে নতুন সড়ক আইন কার্যকরে। এর বিরোধিতায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০টিরও বেশি জেলায় বাস চলাচল বন্ধ রাখে শ্রমিকরা। গতকাল সকাল থেকে আকস্মিক কর্মসূচিতে দূরপাল্লার যাত্রীদের পোহাতে হয়েছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। বাসস্ট্যান্ডে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে অনেককে ফিরে যেতে হয়েছে বাসাবাড়িতে। এতে ব্যাঘাত ঘটেছে কর্মতৎপরতায়।

জানতে চাইলে খুলনা বিভাগীয় শ্রমিক ফেডারশনের যুগ্ম সম্পাদক মোর্তজা হোসেন বলেন, ‘যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, মাগুরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গার পরিবহন শ্রমিকরা সকাল থেকে স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি পালন করেছে। শ্রমিকরা কাউকে ইচ্ছা করে হত্যা করে না। অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার জন্য নতুন সড়ক আইনে তাদের ঘাতক বলা হচ্ছে। তাদের জন্য এমন আইন করা হয়েছে যা সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য! নতুন আইনের অনেক ধারার ব্যাপারে শ্রমিকদের আপত্তি রয়েছে। সরকার সমাধানের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় তারা বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।’

যে আইনটি নিয়ে মালিক-শ্রমিকসহ পরিবহন নেতাদের এমন আপত্তি তার সূচনা গত বছর ঢাকায় বাসচাপায় দুই ছাত্রছাত্রীর মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলন। বিমানবন্দর সড়কে দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিম রাজুর মৃত্যুর প্রতিবাদে স্কুল শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে নতুন সড়ক আইন পাস হয় সংসদে। চলতি মাসের প্রথম দিন থেকে এটি কার্যকরের কথা বলা থাকলেও সাধারণ মানুষসহ পরিবহন সংশ্লিষ্টদের আইনটি সম্বন্ধে যথাযথভাবে অবগত করার জন্য একাধিক দফায় সময় বাড়ানো হয়। বেপরোয়া মোটরযানের কবলে পড়ে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে এ আইনে। এই আইন প্রণয়নের পর থেকেই বিরোধিতা করছে পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও তাদের সংগঠনগুলো।

ঝিনাইদহ বাস, মিনিবাস ও মাইক্রো শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুজ্জামান খোকন দাবি করেন, যান চলাচল ঠেকাতে সড়কে কোনো ব্যারিকেড দেননি তারা। শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখেছেন স্বেচ্ছায়।

এদিকে আইনটি প্রত্যাহারের দাবিতে রাজশাহী থেকেও বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয় গতকাল। সকাল থেকে রাজশাহীর সঙ্গে বিভিন্ন রুটের বাস চলাচল বন্ধ করে দেন শ্রমিকরা। ফলে রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সকালের দিকে ঢাকাগামী কয়েকটি বাস রাজশাহী থেকে ছেড়ে যায়। সকালে রাজশাহীর কয়েকটি স্থানে অবস্থান নিয়ে মোটর শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। অল্প কয়েকটি বাস ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে যাতায়াত বন্ধ করে দেন।

রাজশাহী জেলার পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘নতুন আইন সংস্কার করা প্রয়োজন। এই আইনে চালকের জন্য যে জরিমানা ধরা হয়েছে, সেটা চালক কোথা থেকে দেবে? সে বেতন পায় কত টাকা?’

যশোর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মামুনুর রশীদ বলেন, ‘ফাঁসির দড়ি নিয়ে শ্রমিকরা কাজ করতে পারবে না। তাই কর্মবিরতি পালন করেছে। আইনের সংস্কার করা হবে এমন আশ্বাসে আমরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেছি।’

গতকাল সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘যত চাপই থাকুক আইনটি বাস্তবায়ন করতেই হবে। কোনো প্রকার ধর্মঘট-বন্ধ এসব থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। আইন প্রয়োগের সময় অযথা যেন বাড়াবাড়ি না হয়। সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

পরিবহন ধর্মঘটের প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘তাদের সঙ্গে আমাদের সচিব আলোচনা করেছেন, আমিও কথা বলেছি। তাই বলে আইন প্রয়োগ না করে সরে যাব এটি কি আপনারা (সাংবাদিক) চান? আপনারাও আমাকে সহযোগিতা করুন, তারা তো চাপ দেবেই। গতকাল (রোববার) থেকে মাঠ পর্যায়ে কার্যকর করা শুরু হয়েছে। মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলে আইনটি সংযুক্ত করে যে বিষয়টি অসম্পূর্ণ ছিল গতকাল (রোববার) গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে, আজ (গতকাল) থেকে মোবাইল কোর্ট কার্যকর হচ্ছে।’

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আইন প্রয়োগে যাতে কোনো অসুবিধা না হয়, প্রয়োগকারী সংস্থার অযথা হয়রানি বন্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করেছি। সহনীয় মাত্রা মানে বাড়াবাড়ি যেন না করে এটাই বলছি। আইনটি আগের তুলনায় কঠোর করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নয়, সবার কল্যাণে সড়ককে নিরাপদ করা, দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা। নতুন বিষয় যুক্ত করা হয়েছে চালকদের জন্য পয়েন্ট সিস্টেম, উন্নত বিশ্বের মতো আইন অমান্য করলে পয়েন্ট কর্তন হবে।’

সেতুমন্ত্রী আরও বলেন, ‘পরিবহন মালিকদেরও আইনের আওতায় আনা হয়েছে। অভিযুক্ত যিনিই হোন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।’

শুধু বাস কিংবা মোটরচালিত ক্ষুদ্র বাহনই নয়, এদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন ট্রাকচালকরা। তারাও ধর্মঘটের ঘোষণা দেবেন বলে কানাঘুষা চলছে। ওবায়দুল কাদের জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতি শক্ত হাতে মোকাবেলা করা হবে। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

গতকাল ঢাকায় আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ৮৮টি মামলা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। বিআরটিএর পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) একেএম মাসুদুর রহমান জানান, ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে মামলার পাশাপাশি এক লাখ ২১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তবে প্রথম দিনে কাউকে কারাদ- দেওয়া হয়নি। বহুল আলোচিত আইনটি বাস্তবায়ন তদারকি করতে সকাল থেকে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ, উত্তরাসহ কয়েকটি এলাকায় অভিযানে নামেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। চট্টগ্রামেও দুটি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালায় বিআরটিএ।

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ সাদিয়া তাজনীন। এ সময় কয়েকটি বাসকে জরিমানা করা হয়। যাত্রীরাও বিভিন্ন সমস্যার কথা জানান আদালতকে। কাকলী বাসস্ট্যান্ডে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত-৪ পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এম এম সামিরুল ইসলাম। কাকলীতে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক সার্জেন্ট আফসানা ফেরদৌস পথচারীদের আইন না মানার প্রবণতা উল্লেখ করে বলেন, ‘সকাল থেকে কয়েকবার গাড়ি থামিয়ে পথচারীদের পার করে দেওয়া হয়েছে। একজন-দুজন করে আসতেই থাকে। সবার জন্য যদি গাড়ি থামাতে হয়, তাহলে তো সড়কে গাড়িই চলবে না! আর ফাঁক পেলেই সড়কের মাঝ দিয়ে দৌড় দেবে। পথচারী নিয়ন্ত্রণ অনেক কঠিন।’ গতকাল পথচারীদের কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি বলে জানান কাকলীতে আদালত পরিচালনা করা ম্যাজিস্ট্রেট।

বাংলাদেশে গণপরিবহনের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে আইন না মানার প্রবণতা প্রবল বলে অভিযোগ রয়েছে। দুর্ঘটনার নামে যত্রতন্ত্র ‘মানুষ হত্যা’ সড়কের নিত্যদিনকার চিত্র। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই ঢাকার এমইএস বাসস্ট্যান্ডে দুই বাসের প্রতিযোগিতায় দুই কলেজ শিক্ষার্থী নিহতের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে দেশজুড়ে। তাদের দাবি-দাওয়া মেনে সংসদে পাস হয় সড়ক পরিবহন আইন।