গৃহকর্মীদের কান্না শোনার কেউ নেই

ঢাকা, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গৃহকর্মীদের কান্না শোনার কেউ নেই

ডেস্ক রিপোর্ট ১০:৩৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৮, ২০১৯

print
গৃহকর্মীদের কান্না শোনার কেউ নেই

বাংলাদেশে গৃহকর্মী নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না। নির্যাতনের শিকার কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়া ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু এর আইনি প্রতিকার হয় না। মামলা হয় অর্ধেকেরও কম।

মানবাধিবার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব বলছে, চলতি বছরের প্রথম আট (জানু-অক্টোবর) মাসে ৩২ গৃহকর্মী নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১ জন নিহত হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১২ জন। অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকারও হয়েছেন গৃহকর্মীরা। কিন্তু এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ১৫টি। নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।

ঢাকাসহ সারা দেশে যারা গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন তাদের ৯০ ভাগেরও বেশি নারী। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা ১৮ বছরের নিচে। জরিপে দেখা গেছে যারা হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয় তাদের অধিকাংশের বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। তারপরেই রয়েছে সাত থেকে ১২ বছরের শিশুরা।

২০১৮ সালে ১৮ জন গৃহকর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। আত্মহত্যা করেছেন পাঁচজন, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন চারজন। মোট নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৫৪চি। কিন্তু ২২টি ঘটনায় কোনো মামলাই হয়নি। ২০১৭ সালে নিহত হন ১৯ জন, ধর্ষণের শিকার হন সাত জন। ৪৩টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও মামলা হয়েছে মাত্র ২৫টির।

২০১৬ সালে সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন। ৪০ জন নিহতের মধ্যে ১৮ জনই ছিল শিশু। আসকের এই হিসাব কয়েকটি নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে করা, কিন্তু বাস্তবচিত্র অনেক ভয়াবহ। কারণ অনেক নির্যাতনের ঘটনায় অর্থ ও চাপের মুখে সমঝোতা করা হয়। গৃহকর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা দরিদ্র হওয়ায় তারা মামলা মোকদ্দমায় যেতে চান না বা যেতে সাহস পান না। প্রভাবশালীরা অনেক নির্যাতনের ঘটনাই ধামাচাপা দিয়ে ফেলেন।

গত মার্চে আইএলও বাংলাদেশের গৃহকর্মীদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, যারা বাড়িতে সার্বক্ষণিক গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন তাদের শতকরা প্রায় ১৩ ভাগ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। মানসিক নির্যাতনের শিকার হন প্রায় ২৬ ভাগ। যৌন নির্যাতনের শিকার হন তিন ভাগ। আর তীব্র মৌখিক নির্যাতনের শিকার হন শতকরা ৪৮ ভাগ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাতে ঘুমনোর সময় ৬৬ ভাগ গৃহকর্মীই নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না।

আইএলও বলছে, বাংলাদেশে গৃহকর্মীদের শতকরা ৯৭ ভাগ নারী। আর যে তিন শতাংশ পুরুষ তাদের প্রায় সবাই ছেলে শিশু। গৃহকর্মীদের নিয়ে কাজ করে ‘শ্রমিক জোট বাংলাদেশ’। এই সংগঠনের যুগ্ম আহবায়ক কাজী সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে গৃহকর্মী সুরক্ষা আইন হলেও তাতে নির্যাতন কমছে না। কারণ নির্যাতন হয় ঘরের মধ্যে। আর গৃহকর্মী ও তাদের পরিবার গরিব হওয়ায় আইনগত প্রতিকারও পায় না। তাদের চাপ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে সমঝোতায় বাধ্য করা হয়।

আরেকটি সমস্যা হলো মামলা করলেও সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া কঠিন, যা আগেই নষ্ট করে ফেলা হয় বলে জানান সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বলেন, আসলে এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। যারা গৃহকর্মী নিয়োগ দেন তাদের মানবিক দিক দিয়ে সচেতন করতে হবে। এর কোনো উদ্যোগ নেই। আমরা গৃহকর্মীদের তাদের অধিকার ও আইনের ব্যাপারে সচেতন করার চেষ্টা করছি। কিন্তু গৃহকর্তাদের সচেতন করবে কে? আমরা তো আর তাদের ঘরের মধ্যে যেতে পারি না।

মানবাধিকারকর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান বলেন, যে দেশে আইন ও বিচার ধনীদের নিয়ন্ত্রণে সেখানে গৃহকর্মী নির্যাতনের বিচার ও তাদের সুরক্ষা কঠিন। আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ নেই। আর প্রভাবশালীদের কারণে অনেক নির্যাতনের ঘটনাই প্রকাশ পায় না।

তিনি মনে করেন, গৃহকর্মীদের অভিযোগ গ্রহণ, তাদের আইনি সহায়তাসহ আরও সব সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকারের সহায়তা সেল থাকা দরকার। আর ওই সেলে তারা যাতে অভিযোগ জানাতে পারে তার সহজ ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে যদি পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়।