পেঁয়াজের দামে বিশ্বরেকর্ড

ঢাকা, শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

পেঁয়াজের দামে বিশ্বরেকর্ড

চরম অস্বস্তিতে সরকার

শফিক হাসান ১১:১০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৫, ২০১৯

print
পেঁয়াজের দামে বিশ্বরেকর্ড

পেঁয়াজের দামে অবশেষে বিশ্বরেকর্ড করল বাংলাদেশ, মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় প্রথম হলেও দ্বিতীয় ‘আসন অধিকার করা’ মিয়ানমারের সঙ্গে পার্থক্য যোজন দূরের! শুক্রবার বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ২৭০ টাকায় কেজিপ্রতি পেঁয়াজ বিক্রির খবর পাওয়া গেলেও গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে সর্বোচ্চ দাম দেখা গেছে মিয়ানমারে। দেশটিতে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৫৬ টাকা কেজিতে। অন্যদিকে গতকালের সংবাদপত্রে পেঁয়াজের সর্বোচ্চ দাম ২২০ টাকা ছাপা হলেও একদিনের ব্যবধানে গতকাল সেটা পৌঁছেছে আরও ৫০ টাকা বেশি দরে!

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় গতকাল পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে সর্বনিম্ন ২২০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৭০ টাকায়। এদিকে পেঁয়াজের মূল্যের উঁচু থেকে নিচুর তালিকায় বর্তমানে রাশিয়ায় ৩৯, নেপালে ৩৮, যুক্তরাজ্যে ৩৫, মিসর ও ভারতে ৩১, পাকিস্তানে ৩০ ও কাজাখস্তানে ২৭ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়- ভাবতেই হোঁচট খেতে হয়। কোনো বিশ্বরেকর্ড সম্মানের হলেও বর্তমানে পেঁয়াজের এমন বিশ্বরেকর্ড লজ্জা ও গ্লানির। অল্প কয়েকজন মুনাফালোভী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কারণে বাজারে সৃষ্টি হয়েছে অস্থিরতা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে আগে থেকেই পর্যাপ্ত পেঁয়াজ মজুদ ছিল, ভারত আমদানি না করার সিদ্ধান্তের পর কয়েকটি দেশ থেকে জরুরি ভিত্তিতে পেঁয়াজ আনাও হয়েছে। তারপরও কেন সংকট- এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্লেষকসহ সাধারণ মানুষের মনে। শিল্পমন্ত্রী-বাণিজ্যমন্ত্রীসহ সরকারের কর্তাব্যক্তিরা যতবারই পেঁয়াজ ইস্যুতে মুখ খুলেছেন ততবারই বেড়েছে দাম! তারা ‘বাজার নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে এমন আজগুবি দাবি করলেও ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি কখনই।

সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে সাধারণ মানুষ বলতে বাধ্য হচ্ছে- ব্যবসায়ীরা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নাকি সরকার ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও এ ইস্যুতে চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। সাধারণ মানুষের পাতে পেঁয়াজ না থাকলেও ফেসবুক সয়লাব পেঁয়াজ-কাণ্ডে। সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আগুনে পুড়লে নীলরঙা ফেসবুক। বিরোধী দল বিএনপি নেতারাও এ ইস্যুতে সরকারকে দুষছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘ভোট ছাড়া নির্বাচন হয়ে সরকার গঠন সম্ভব হলে পেঁয়াজ ছাড়া রান্নাও সম্ভব। দাম বৃদ্ধির সিন্ডিকেটের কারসাজিতে। বর্তমানে পেঁয়াজের অভাবের চেয়ে পেঁয়াজের সংকটের প্রচার সিন্ডিকেটকে আরও বেশি সুযোগ করে দিয়েছে।’

এদিকে সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে টিসিবির মাধ্যমে সরাসরি তুরস্ক থেকে, এস আলম গ্রুপ মিসর থেকে, বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আফগানিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জরুরি ভিত্তিতে কার্গো বিমানে পেঁয়াজ আমদানি করছে। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে, অল্প সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এছাড়া সমুদ্রপথে আমদানিকৃত পেঁয়াজ বাংলাদেশের পথে রয়েছে। বড় চালান পৌঁছবে কম সময়ের মধ্যেই।

বস্তুত, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত জানানোর পর থেকেই পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। বাজার পর্যবেক্ষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, আগে কখনই এত বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি হয়নি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাহিদার চেয়ে আমদানি কম হওয়ার কারণেই এ অস্থিরতা। তাদের ভাষ্যমতে, স্বাভাবিক সময়ে ভারত থেকে দেশের বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টন আমদানি হয়।

হিসাব অনুযায়ী, গত দেড় মাসে ভারত থেকে কমপক্ষে দেড় লাখ টন আমদানির কথা। রপ্তানি বন্ধ থাকায় বিকল্প উৎস থেকে আমদানি হয়েছে মাত্র ৩৯ হাজার টন। দেশি পেঁয়াজের সরবরাহও অপ্রতুল।

এ সংকটের কারণ বর্ণনা করে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতা মোহাম্মদ ইদ্রিস সাংবাদিকদের বলেন, ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের পরপরই দেশের আমদানিকারকরা বিকল্প উৎস থেকে আমদানি শুরু করেন। ওই সময় দাম স্বাভাবিক রাখতে পাইকারি বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অনেক ব্যবসায়ীকে জেল-জরিমানা করা হয়। এতে অনেক ব্যবসায়ী আমদানি থেকে বিরত থাকেন। চাহিদার তুলনায় আমদানি কম হওয়ায় দাম বেড়েছে।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, বিদ্যমান সংকট কাটাতে শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান প্রায় চার হাজার টন আমদানির ঘোষণা দিয়েছে। সিটি গ্রুপ, মেঘনাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ নিলেও পেঁয়াজ এখনো আসেনি। আবার বড় প্রতিষ্ঠানের ঘোষণায় ছোট আমদানিকারকরা পিছিয়ে গেছেন।

শুক্রবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে টেকনাফ স্থলবন্দর, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে পেঁয়াজ পরিবহনে কয়েক দিনের জন্য সমস্যা হয়েছিল। পরিস্থিতি মোকাবেলায় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, কম সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ বাজারে আসবে এবং মূল্য স্বাভাবিক হবে।

শুক্রবার ভোলায় সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, শিগগিরই দাম স্বাভাবিক হয়ে যাবে। পৃথিবীর বহু দেশে এবার উৎপাদন কম হয়েছে। প্রভাব কিছুটা পড়বেই। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ বিষয়ে দেখভাল করছেন। ইতিপূর্বে নিজে পেঁয়াজ ব্যবহার না করার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।

খোলা কাগজ প্রতিনিধিরা জানান, গতকাল টাঙ্গাইলের নাগরপুরে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ২৫০, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ২২০, নীলফামারীর সৈয়দপুরে ২০০, ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলে ২২০ টাকায়। লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বেড়েছে, বাজারে অভিযান চালিয়েও নিয়ন্ত্রণে করা সম্ভব হয়নি।

শুক্রবার চট্টগ্রামে একেকটি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৭০ টাকায়। চীন ও মিসর থেকে আসা একেকটি পেঁয়াজের ওজন ২০০ থেকে ৩৫০ গ্রাম পর্যন্ত। ২০০ টাকা কেজি হিসাবে বড় একটি পেঁয়াজের দাম পড়ছে ৪০ থেকে ৭০ টাকা।

এদিকে শীর্ষ পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা রাজবাড়ীর একজন আড়তদার জানান, কৃষকের কাছে এখন পেঁয়াজ তেমন নেই। মোকামগুলোতে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় দাম বাড়ছে।

ঢাকার শ্যামবাজারের এক আমদানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। সেটা কতদিন বন্ধ থাকবে কেউ জানি না। এ কারণে আমদানিকারকদের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে। তারা যদি অন্য দেশ থেকে আমদানি করেন আর তখন যদি ভারত আবার রপ্তানি শুরু করে তাহলে ব্যবসায়ীদের লোকসান হবে। বাংলাদেশের ক্রেতারা ভারতীয় পেঁয়াজ বাজারে পেলে চীন, তুরস্ক বা মিসরের পেঁয়াজ কেনেন না। একই আশঙ্কা সাধারণ মানুষেরও। কৃষকরা ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না কখনই। সাধারণ মানুষ ধারণা করছেন, এবার যখন কৃষকের উৎপাদিত পেঁয়াজ বাজারে আসবে তখন ভারত থেকেও আমদানি শুরু হতে পারে। এতে বাংলাদেশের কৃষকের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পেঁয়াজ আমদানি ও বিক্রিতে নেতিবাচক প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায়। ইতিপূর্বে কয়েকবার ব্যবসায়ীদের জরিমানার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ‘প্রতিবাদস্বরূপ’ পাইকারি ব্যবসায়ীদের অনেকেই পেঁয়াজ বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। সেটাও সামষ্টিক বাজার পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জরিমানা ও হয়রানির ভয়ে অনেকে অলস সময় কাটাচ্ছেন।

দেশের আবহাওয়া অনুযায়ী, পেঁয়াজের মূল মৌসুম হচ্ছে এপ্রিল-মে মাসে। কোনো কোনো এলাকায় আগামী ডিসেম্বরেই পেঁয়াজ উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে দাম নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চলতি বছরে ঝড়-বৃষ্টির কারণে পেঁয়াজ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে সংরক্ষণ ব্যবস্থাও ভালো হয়নি। দেশি পেঁয়াজের মজুদ কমেছে এ কারণে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে বাজারে থাকা ‘হালি পেঁয়াজের’ মজুদ শেষ হবে নভেম্বরের মাঝামাঝিতে। এরপর ধীরে ধীরে বাজারে আসবে নতুন পেঁয়াজ- ‘মুড়ি কাটা’। সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; ‘মুড়িকাটা পেঁয়াজ’ বাজারে আসতে দেরি হচ্ছে। আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে ‘মুড়ি কাটা’র সরবরাহ বাড়লে বাজারের অস্থিরতা কমবে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকার পাইকারি পেঁয়াজ বাজার শ্যামবাজারের আড়তদার নারায়ণ সাহা।