রেলের লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

রেলের লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়

শফিক হাসান ১০:৪৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৩, ২০১৯

print
রেলের লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়

নয়টার ট্রেন ক’টায় ছাড়ে এমন হাস্য-রসাত্মক বিষয় চালু থাকলেও বাংলাদেশ রেলওয়ের ‘বারোটা’ বেজে রয়েছে অনেক আগেই! বছরের পর বছর বিপুল পরিমাণ লোকসান দিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে রেলখাতই সবচেয়ে লাভজনক। দুই দেশের রেল ব্যবস্থাই ব্রিটিশ উপবেশনকালে প্রতিষ্ঠিত। তারপর ভারত-বাংলাদেশ আলাদা রাষ্ট্র হলো।

ভারত যদি রেলকে আরও লাভজনক অবস্থায় নিতে পারে বাংলাদেশ কেন পারছে না, গলদটা কোথায়! এমন প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন রেলে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়। সত্যিকার অর্থে রেল লোকসান করে না, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কারণেই সরকারকে দিতে হচ্ছে ভর্তুকি।

সড়কের মতো রেলপথেও বর্তমানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে, নানাভাবে মারা যাচ্ছে মানুষ। গত সোমবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা তূর্ণা নিশীথা ও সিলেটের উদয়ন এক্সপ্রেসের সংঘর্ষে হতাহত হয়েছে অনেকেই। এর মাধ্যমে নতুন করে আবার বেরিয়ে এসেছে রেলওয়ের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা সীমাহীন ফাঁক! এর আগে কয়েকবার ঘটেছে বড় দুর্ঘটনা। সেসব দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে নেওয়া হয়নি যথোপযুক্ত ব্যবস্থা। যে কারণে বারবারই দেখতে হচ্ছে রেলপথের বেলাইনে চলার দশা।

রেললাইন সমান্তরালে বইলেও এর সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের একাংশ বাঁকাপথের যাত্রী; দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত তারা। সেই মাশুল গুনতে বাধ্য হচ্ছে দেশের মানুষ ও সরকার। সরকার বঞ্চিত হচ্ছে ন্যায্য পাওনা থেকে, যাত্রীরা পাচ্ছে না প্রাপ্য সেবা। দুর্ভোগ যেমন বাড়ছে সেই সঙ্গে বাড়ছে ভাড়ার পরিমাণ। অথচ দিন দিন যেভাবে যাত্রীসংখ্যা বাড়ছে তাতে ভাড়া উল্টো কমারই কথা! এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর সঙ্গে।

বুধবার তিনি খোলা কাগজকে বলেন, রেলওয়ের ক্রমাগত লোকসান ও দুর্ঘটনা দুটোই অব্যবস্থাপনার ফসল। কেউ যদি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে হাজার টাকার ব্যবসা করেন তাহলে লোকসান গুনতেই হবে। কোটি টাকা বিনিয়োগ করে লাখ টাকা ব্যবসা করতে হবে। লাভজনক করার জন্য যে সমস্ত পদ্ধতি রয়েছে, সেগুলো রেলওয়ে ব্যবহার করতে পারছে কিনা সেখানেও প্রশ্ন রয়েছে। কর্তৃপক্ষের দক্ষতা, ঘাটতি এসব পূরণে কোনো প্রচেষ্টা আছে কিনা সেটাও বিবেচ্য। এগুলো যখন আমরা দেখি, রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতি রয়েছে। তাদের যে সাংগঠনিক দুর্বলতা তাও প্রকাশ পায়। সে কারণে ট্রেনের ক্রমাগতভাবে লোকসান বাড়ছে।

মোজাম্মেল হক চৌধুরী আরও বলেন, গত সোমবার রাতের যে ট্রেন দুর্ঘটনা এর ভবিষ্যদ্বাণী আমরা আগেই করেছিলাম। চলতি বছরের ২৪ জুন যখন উপবন এক্সপ্রেস দুর্ঘটনাকবলিত হলো, তখন আমরা (বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি) একটা ইঙ্গিত দিয়েছিলাম। তখনকার স্টেটমেন্ট সাংবাদিকদের কাছে সংরক্ষিত থাকার কথা। তখন আমাদের ভাষ্য ছিল, এটা একটা সিগন্যাল মাত্র। এটা বলে দেয়, আগামীতে ট্রেনের সামনে আরও বড় বড় দুর্ঘটনা উপস্থিত হবে।

উপবন এক্সপ্রেসের আমরা যে চিত্র দেখেছিলাম- স্লিপারগুলো উপড়ে গিয়েছে, সব মিলিয়ে অবস্থা খুব নাজুক। সে সময়ে অপরাপর এলাকাগুলোর বাস্তব চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে ভেসেছিল। নানা রকম ছবিতে দেখেছিলাম স্লিপারে পাথর নেই, সংযুক্ত ক্লিপের নাট-বোল্ট নেই। এসব ছবি ভাইরাল হয়েছিল। ছবিগুলো দেখে শিক্ষা নিয়ে যদি রেলওয়ে কাজে লাগাতে পারত; তখন থেকে কারিগরি দক্ষতার দিকে মনোযোগী হলে এরকম (তূর্ণা নিশীথা-উদয়ন এক্সপ্রেস) দুর্ঘটনা হতো না। এটা এড়ানো সম্ভব ছিল।

রেলওয়ে কর্মীদের সেবার অতীত-বর্তমানের তুলনামূলক বিচারে যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, এক সময়ে রেলওয়ের কর্মকর্তারা ট্রেন চালাতেন দরদি মনোভাব নিয়ে। তাদের মধ্যে পেশাগত প্রেম ছিল। কালের পরিক্রমায় যখন পুরনো কর্মী হারিয়ে গেছেন, বর্তমানে লোকজন নিয়োগ হচ্ছে অনিয়ম-দুর্নীতির মধ্যে। সঠিক মানুষ সঠিক জায়গায় নিয়োগ পাচ্ছেন না। রেলওয়েতে অনেক বিভাগ রয়েছে- কারিগরিসহ অন্যান্য অপারেশনাল বিভাগে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন লোকবল দরকার। কিন্তু দুর্নীতির মধ্য দিয়ে কারিগরি দক্ষতার লোকবলের পরিবর্তে সাধারণ লোকবল নিয়োগ পায়। এদের রেলওয়ে কাজে লাগাতে পারে না।

একটা উদাহরণ দিই- সুইপার নিয়োগ দিলে দেওয়া উচিত জাত সুইপারদের। অথচ সেখানে দেওয়া হচ্ছে বিএ পাস কর্মী! তার তো কাজের দিকে মনোযোগ থাকার কথা নয়। দেখা যাবে, সে হয়তো কোনো কর্মকর্তার বাসা বা অফিসে কম্পিউটারে কাজ করছে। সারা দেশের রেলওয়ের বাথরুমের অপরিচ্ছন্নতার জন্য এসবও অনেকাংশে দায়ী। ঘুষ নিয়ে নিয়োগ দিলে তাকে দিয়ে সুইপারের কাজ করানো যাবে না! এভাবেই রেল চলছে।

রেলওয়ের দুর্নীতির বিষয়ে আলোকপাত করে মোজাম্মেল হক বলেন, সামনের দিনে আমরা আরও বড় বড় দুর্ঘটনা দেখতে পাব। আরও প্রাণহানির পর হয়তো রেল কর্তৃপক্ষের বোধোদয় হবে। সীমাহীন লোকসানের দুটি কারণ- অনিয়ম ও দুর্নীতি। অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার কারণও দায়ী। এসব যদি বন্ধ করা যায় রেলওয়ে লাভের মুখ দেখবে। আমরা দেখেছি, ৭০০ কোটি টাকার ডেমো কেনা হয়েছে। ৬০০ কোটি টাকার তেলের ওয়াগন কেনা হয়েছে। মোট এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা জলে চলে গেছে। অথচ এই টাকা দিয়ে যাত্রীবান্ধব কাজ করা যেত, অনেক স্টেশন সংস্কার করা যেত, অনেক লোকোমোটিভ কেনা যেত, প্রয়োজনীয় কোচ কেনা যেত।

এতে যাত্রীসেবার মান বাড়ার পাশাপাশি আরও বেশিসংখ্যক যাত্রী বহন করা যেত। সেখানে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কেন! এসব দৃশ্যমান কেনাকাটা; রেলওয়ের কর্মকর্তাদের আমরা বিদেশভ্রমণ দেখতে পাচ্ছি- অনেকটাই অপ্রয়োজনীয়। অন্যান্য খরচও কম নয়। রেলওয়ে হেড কোয়ার্টারে কর্মকর্তাদের গাড়ির বহর দেখে অনেকেই আশ্চর্য হবেন। অথচ বাংলাদেশের বেসরকারি একটা কোম্পানি, ৭০০ বাস যারা অপারেট করে তারা ছোট্ট একটা রুম নিয়ে মাত্র পাঁচ-সাতজন কর্মী দিয়েই চালাতে পারে। রেলওয়ে হাজার হাজার কর্মীর পরেও যেসব ঘাটতি আমাদের সামনে তুলে ধরা হয় তা অত্যাশ্চর্য! এগুলো করছে মাথাভারী প্রশাসন; এদের কারণে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হয়ে যায়। তখন লোকসান দিতে বাধ্য হয় সরকার।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রেল ব্যবস্থার তুলনা করে এই সড়ক ব্যবস্থা সংস্কারক বলেন, পাশের দেশ ভারতে অনেক কিছুর উদাহরণ দিয়ে থাকি। সারা ভারতে রেল নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। রেলপথ মন্ত্রণালয় সবচেয়ে লাভজনক। অথচ ভারত খুব সাশ্রয়ী মূল্যে যাত্রী বহন করে। নিয়মিত কোনো কোনো যাত্রীকে নানা ধরনের প্রণোদনাও দিয়ে থাকে।

এখান থেকে আমরা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারি। অভিজ্ঞতা বিনিময় করে ব্যবহারের তৎপরতা আমরা দেখিনি। যাত্রী কল্যাণ সমিতির আন্দোলনের দুই যুগ পূর্ণ হচ্ছে। এ দীর্ঘ সময়েও আমরা ভারতের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় বা ব্যবহার করতে দেখিনি বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলওয়ের বর্তমান বেহাল অবস্থার জন্য বিগত সরকারগুলোও কম দায়ী নয়। স্বাধীনতার পর থেকে সব সরকারই রেলওয়ের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করেছে। নেয়নি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও সংস্কারমূলক উদ্যোগ। সত্যিকার অর্থে রেলওয়ের ডিজিটালাইজেশনও হয়নি। অনলাইনে টিকিট বিক্রির প্রথা শুরু হলেও সার্ভার ডাউন হওয়ার নজিরও অসংখ্য। বর্ধিত টাকায়ও যাত্রীরা পাচ্ছে না কাক্সিক্ষত সেবা।

একসময়ে সবচেয়ে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব, জনবান্ধব হিসেবে রেলের সুনাম থাকলেও সেটা কমতে কমতে বর্তমানে ধুলোয় মিশতে চলেছে। নীলফামারীর সৈয়দপুরে রেলওয়ের যে কারখানা ছিল বর্তমানে সেটা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সরকারি নীতিতে অসাম্য ও অস্বচ্ছতায় থাকায় লুটপাটের ভূত ভর করেছে রেলে। অথচ চাইলে সড়কের পাশাপাশি রেলকেই করা তুলনামূলক লাভজনক। ব্রিটিশ আমলের পর রেল সম্প্রসারণ হয়নি বললেই চলে। সাম্প্রতিক সময়ে যতটুকু হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই কম।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাত্রী কল্যাণে রেলওয়েতে চাইলে বিনিয়োগ করা যেত। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের খামখেয়ালি ও দুর্নীতির কারণে বিকশিত হয়নি। শীর্ষ থেকে নিম্নস্তর পর্যন্ত সমস্ত ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে। যে কারণে চালক ও সহকারী ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে রেল চালাতে পারেন, সিগন্যাল মানার তোয়াক্কাও করতে হয় না! সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে রেলওয়ে যেভাবে লোকসান করে চলেছে, তা বহাল থাকলে আগামীতে সরকার এবং জনসাধারণ উভয় পক্ষকেই যে চড়া মাশুল দিতে হবে বলার অপেক্ষা রাখে না!