জীবনত্রাতা সুন্দরবন

ঢাকা, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

জীবনত্রাতা সুন্দরবন

শফিক হাসান ১০:৫৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৯

print
জীবনত্রাতা সুন্দরবন

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের শক্তিকে প্রতিহত করে সেটাকে দুর্বল করে দেয় বাংলাদেশের রক্ষাতকবচ সুন্দরবন। যে কারণে গত শনিবার নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ভয়াল থাবা বিস্তার করতে পারেনি এ জনপদে। বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা ছিল। ১৪ জনের প্রাণহানি ও অসংখ্য ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার পরও বলা চলে অল্পের উপর দিয়েই হয়েছে রক্ষা। বিশ্লেষকরা বলছেন মহাপ্রাণ সুন্দরবনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অবিসংবাদিত হলেও জান-মাল রক্ষায় ম্যানগ্রোভ এ বনের ভূমিকাও অনবদ্য।

সিডর, আইলাসহ বড় বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবন বারবারই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে সুরক্ষা দিয়েছে এই বদ্বীপের নিরীহ মানুষকে। সুন্দরবন নিজে ক্ষতবিক্ষত হয়, ‘অসুন্দর’ করে তোলে নিজেকে তবুও আঁচড় লাগতে দেয় না তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জনগোষ্ঠীর ওপর। সিডর-আইলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও সুন্দরবন জেগেছে ফের। সময়ের পরিক্রমায় পেয়েছে আপন মূর্তি। সুন্দর সুন্দরবন নিজের শুশ্রুষা নিজেই করে বলে এখনো মনকাড়া- সুন্দরীতম; দেশ-বিদেশের পর্যটকের কাছে অতি আদরের।

সাত বিশ্বঐতিহ্যেও প্রতিযোগী ছিল বাংলাদেশের গর্বের এ ধন। গত শনিবার ঝড়ের তীব্রতা ঠেকাতে ঢাল হিসেবে কাজ করেছিল সুন্দরবনের গাছ। কীভাবে এ ‘অসাধ্য সাধন’ হলো ব্যাখ্যায় পরিবেশবিদ ড. এ কিউ এম মাহবুব বলেন, ‘মনে করেন আপনার বাড়ির সামনে একটা দেয়াল আছে। সেটার কারণে বন্যার পানি, দমকা বাতাস আপনার ঘরে ঢুকতে পারবে না। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জন্য সুন্দরবন ঠিক সেই দেয়ালের কাজটাই করে।’

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার তাণ্ডব থেকে এই বন উপকূলকে রক্ষা করেছে। সেই দুর্যোগে বড় ক্ষতির শিকার হয়েছিল বিস্তৃত বনাঞ্চল। যে সুন্দরবন বরাবরই রক্ষাকবচ হিসেবে বরাভয় দেয়, নিজে আঘাত সয়ে সুরক্ষা দেয় সাধারণ মানুষকে, তাকেই নানাভাবে নিপীড়ন করা হচ্ছে। দূষণে করা হচ্ছে ক্ষত-বিক্ষত। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হচ্ছে বড় প্রজেক্ট। পরিবেশ-প্রকৃতিবিদরা এমন ‘উন্নয়ন’ ঠেকাতে আন্দোলন করলেও সরকারসহ সংশ্লিষ্টরা কর্ণপাত করেনি।

জীববিজ্ঞানীরা বলছেন, সুন্দরবন এলাকায় আত্মবিধ্বংসী কোনো প্রকল্প রাখা একেবারেই অনুচিত। প্রকল্প বহাল রাখলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়বে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার হারাবে আপন শৌর্য-বীর্য; চপলা হরিণসুন্দরী হারাবে স্বতঃস্ফূর্ত গতি। সুন্দরবনকে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের ফুসফুস, ‘যুদ্ধের’ ময়দানের ঢাল-তলোয়ার তথা রক্ষণ-ঢাল। প্রাকৃতিক এ বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে গেলে বাংলাদেশের বিপর্যয় বাড়বে। তা হবে নিজেরই পায়ে কুড়াল মারার শামিল!

১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বৃক্ষরোপণ সপ্তাহের উদ্বোধন করেন। সে সময় দেওয়া বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে সম্প্রতি। বুলবুল-কাণ্ডের পর এটাকে প্রাসঙ্গিক মনে করে শেয়ার করেছেন অনেকেই। বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমরা গাছ লাগাইয়া সুন্দরবন পয়দা করি নাই। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রকৃতি এটাকে করে দিয়েছে বাংলাদেশকে রক্ষা করার জন্য।

বঙ্গোপসাগরের পাশে দিয়ে যে সুন্দরবনটা রয়েছে এইটা হলো বেরিয়ার। এটা যদি রক্ষা করা না হয় তাহলে একদিন খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লার কিছু অংশ, ঢাকার কিছু অংশ এ পর্যন্ত সমস্ত এরিয়া সমুদ্রের মধ্যে চলে যাবে এবং এগুলো হাতিয়া, সন্দ্বীপের মতো আইল্যান্ড হয়ে যাবে। একবার যদি সুন্দরবন শেষ হয়ে যায়- তো সমুদ্র যে ভাঙন সৃষ্টি করবে সেই ভাঙন থেকে রক্ষা করার কোনো উপায় আর নাই।’

প্রায় ৫০ বছর আগে বঙ্গবন্ধু এমন বক্তব্য দিলেও আজকের আওয়ামী লীগ সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে অনেকটাই। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের পর সুন্দরবন নতুন করে বুঝিয়ে দিয়েছে অকৃত্রিম বন্ধুত্বের স্বরূপ। উপকারী সুন্দরবনের উপযোগিতা ব্যাখ্যা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব ড. আনু মুহাম্মদ। তিনি লিখেছেন- ‘...বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল আবারও প্রত্যক্ষ করল সুন্দরবনের শক্তি। যারা দেখেও দেখে না, বুঝেও বুঝতে চায় না, তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে চায় ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’- সুন্দরবন কী, কেন তার কোনো বিকল্প নেই!’

আনু মুহাম্মদ আরও উল্লেখ করেন, ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশ উপকূল পার হয়ে যাওয়ার পর আবহাওয়া অধিদফতর সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের তিন দিকজুড়েই ছিল সুন্দরবন। সুন্দরবনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের নিজস্ব শক্তিও কমে আসে। এ কারণে উপকূল অতিক্রম করতে গিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের দীর্ঘক্ষণ সময় লেগেছে। ফলে পূর্ণ শক্তি নিয়ে বুলবুল বাংলাদেশের স্থলভাগে আঘাত করতে পারেনি।

বরেণ্য এ শিক্ষক স্ট্যাটাসে আরও লিখেছেন- ‘...সবাই বুঝলেও একমাত্র সরকার এই প্রবল সত্য বুঝতে অনিচ্ছুক। সরকারের কাছে ধরিত্রীর এক অসাধারণ শক্তি, বিশ্বঐতিহ্য, আমাদের রক্ষক সুন্দরবন রক্ষার চাইতে ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা দেওয়া, ভারত সরকারের কথা শোনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। তাই গত ১০ বছরে বহুরকম তথ্যপ্রমাণ হাজির করা সত্ত্বেও সরকার বুঝতে অরাজি যে, সুন্দরবন বিনাশ মানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির মুখে বাংলাদেশ অরক্ষিত হয়ে যাওয়া।’

‘সেভ সুন্দরবন’সহ নানা নামে সুন্দরবন রক্ষায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন যাবৎ আন্দোলন চালিয়ে গেলেও মিলছে না সুফল। অন্যদিকে জীবন-জীবিকা নির্বাহে সরাসরি সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ বনবিবির পূজা করে। তাদের বিশ্বাস, পূজায় তুষ্ট করলে বনের দেবী অনিষ্ট করবে না। এভাবেই সুন্দরবন জড়িয়ে আছে জনজীবনে। সৃষ্টি করছে সংস্কৃতি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে সুন্দরবন যেমন আদরণীয়; সৌন্দর্যপিয়াসী ও বৈচিত্র্যসন্ধানীদের কাছে বরাবরই লোভনীয় দর্শনীয় স্থান। বাঘ, হরিণসহ নানা প্রাণীর অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র সুন্দরবনকে দিয়েছে অনন্য মাত্রা। ভৌগোলিকভাবেও সুন্দরবন সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বনের একাংশে পড়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে। যে কারণে সুন্দরবন উভয় দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এবার বুলবুল ভারতে আঘাত হানে প্রথমে, সেখান থেকে প্রবেশ করে বাংলাদেশ অংশে।

মহাপ্রাণ সুন্দরবন জনসাধারণকে রক্ষা করার পাশাপাশি এবার নিজেকেও রক্ষা করতে পেরেছে। একটি বাঘসহ পশুপাখির মৃত্যু, কিছু গাছ বিধ্বস্ত হলেও ভয়াল ছোবল বসাতে পারেনি বুলবুল। এ বিষয়ে খুলনা বন বিভাগের কর্মকর্তা বশিরুল আল মামুন জানান, গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বন্যপ্রাণীদের ওপর বড় ধরনের কোনো প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই। সুন্দরবনে যে সময়ে জোয়ার হয়, সে সময়ে ঘূর্ণিঝড় আঘাত করেনি। যার কারণে এবার পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চাইতে খুব একটা বেশি ছিল না। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে সুন্দরবনে জরিপ চালিয়ে সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি জানা যাবে বলে মন্তব্য করেন এই বন কর্মকর্তা।

বুলবুলের ছোবলে ১৩ জনের মৃত্যু
এদিকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে এ পর্যন্ত মারা গেছেন অন্তত ১৩ জন। এক শিশুসহ ১১ জন মারা গেছেন গত রোববার। দুজন মারা গেছেন গত শনিবার। একজন ছাড়া অন্যরা গাছ ও ঘরচাপায় মারা গেছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে হৃদ?রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে একজনের।

বিশ্বের বৃহত্তম প্যারাবন হিসেবে খ্যাত ও ইউনেস্কো বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব না হওয়া পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটকদের প্রবেশ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ। বুলবুলের প্রভাবে সুন্দরবনের যে ক্ষতি হয়েছে পরিমাপ করার কাজ শুরু করেছেন বনবিভাগের ৬৩টি ক্যাম্পের কর্মীরা।
সুন্দরবন লাগোয়া জেলা বাগেরহাটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১ লাখ ৩২ হাজার মানুষ। বিধ্বস্ত হয়েছে ৪৪ হাজার ৫৬৩টি ঘরবাড়ি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৮ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ও ৩৫ হাজার ৫২৯ হেক্টর জমির ফসল। পানিতে ভেসে গেছে চিংড়িসহ ৭ হাজার ২৩৪টি মৎস্য খামার। মাছচাষিদের দুই কোটি ৯৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ভেঙে পড়েছে ৭০টি বিদ্যুতের খুঁটি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন।

বাগেরহাট জেলা প্রশাসক মামুনুর রশীদ জানান, বিধ্বস্ত বাড়িঘর ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণের ভিত্তিতে জেলার ৭৫টি ইউয়িনের মধ্যে ৬২টি ইউনিয়নকে দুর্যোগকবলিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পটুয়াখালীতে বুলবুলের আঘাতে আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপড়ে পড়েছে বেশকিছু গাছপালা ও কাঁচা ঘরবাড়ি। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও খাবার পানি সংকটে রয়েছে পৌরবাসী। জেলার আটটি উপজেলায় ৩৯৮টি কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ও দুই হাজার ৪১২টি আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। ২৮ হাজার ৫০৮ হেক্টর জমির ফসল বিনষ্ট হয়। উপড়ে পড়েছে দুই লাখ এক হাজার ৩০০ গাছপালা। ২০টি গবাদিপশু ও এক হাজার ৪২৮টি হাঁস-মুরগি মারা গেছে। শরীয়তপুরে বিধ্বস্ত হয়েছে তিন হাজার ঘরবাড়ি।

এ ছাড়াও আরও কয়েকটি স্থানে ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে এলাকাবাসী। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জানা যাবে কয়েক দিনের মধ্যেই।