সৌদি ফেরত ৩৮ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সৌদি ফেরত ৩৮ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার

নিজস্ব প্রতিবেদক ৯:৫৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০১৯

print
সৌদি ফেরত ৩৮ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার

সৌদি আরব থেকে ফেরা নারী শ্রমিকদের ৩৮ জনই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে এসেছেন বলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাদের ঠিকমতো তিন বেলা খাবার দেওয়া হতো না। মিলতো না বেতনও। এ নিয়ে কথা বলতে চাইলে চলত শারীরিক নির্যাতন।

সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপন করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ফেরা ১১১ নারীর মধ্যে ৩৮ জন যৌন নির্যাতনের কারণে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। এছাড়া ৪৮ জন নিয়মিত বেতন-ভাতা না দেওয়ায়, পর্যাপ্ত খাবার খেতে না দেওয়ায় ২৩ জন, চারজন ছুটি না দেওয়ায়, মালিক ছাড়া অন্য বাড়িতে কাজ করানোর জন্য সাতজন, ১০ জন অসুস্থতার কারণে, পারিবারিক কারণে একজন, ভিসার মেয়াদ না থাকায় আটজন, দুই বছরের চুক্তি শেষ হওয়ায় ১৬ জন এবং অন্যান্য কারণে দুজন ফিরে আসেন।

ভুক্তভোগী নারী শ্রমিকদের সাক্ষাৎ নিয়ে ওই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। সেখানে এক নারী তার জীবনে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কাজ করে আয়ের জন্য সৌদি আরব গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে মালিক প্রতি রাতেই শরীরের ওপর নির্যাতন চালাতো। প্রতিবাদ করলেই মারধর। এক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে পড়তাম। কিন্তু তাতে তারা থেমে যেত না। ওই অবস্থায়ই শরীরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। জ্ঞান ফিরলে বুঝতে পারতাম সেটা।

যৌন নির্যাতনের শিকার এসব নারীর কথায় ফুটে উঠেছে নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা। তারা বলছেন, সুস্থ মানুষ হিসেবে সৌদি যাওয়ার পর মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে অসুস্থ হয়ে ফিরতে হয়েছে। কাজ করতে গিয়ে কেন আমাকে নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হলো?

কীভাবে তিনি সৌদি গেলেন সেই কথা জানিয়ে ওই নারী শ্রমিক বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সি আমাকে ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে সৌদি আরবে পাঠায়। প্রথম এক বছর দেড় মাস একটি বাসায় কাজ করি। তারা নিজেদের বাসা ছাড়া আত্মীয়দের বাসায় নিয়েও কাজ করায়। অথচ তিনবেলা ঠিকমতো খেতেই দিত না। এমনকি এত কাজ করার পরও বেতন পেতাম না। দেশে থাকতে আমাকে দালালরা বলেছিল ২০ হাজার টাকা বেতন দেবে। তিনি বলেন, আমার কাছে মোবাইল দিত না। শুধু বলত, বেতন পাঠিয়েছি। তারপর আমার কাছ থেকে একটা কাগজে স্বাক্ষর নিত। তবে শেষ দিকে আমি যখন প্রতিবাদ করলাম, নিজে অসুস্থ হওয়ায় অন্য বাসায় কাজ করতে যেতে চাইতাম না। হঠাৎ একদিন আমাকে জোর করে অন্য একটি বাসায় পাঠানো হলো। নতুন বাসায় গিয়ে আমি পড়লাম আরেক বিপদে। সেখানে আমাকে শারীরিক নির্যাতন করত। নতুন মালিক বলল, বাংলাদেশি প্রায় চার লাখ টাকায় তার কাছে আমাকে বিক্রি করেছে। সেখানেও চলে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন। শেষমেশ বাধ্য হয়ে পুলিশের কাছে ধরা দিই।

দেশে ফেরার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, একদিন আমি পালিয়ে সৌদি পুলিশের কাছে ধরা দিই। আমার কাছে কোনো কাগজপত্র না থাকায় আমাকে জেলে পাঠায়। এদিকে মা আমার খোঁজখবর না পেয়ে দালালের শরণাপন্ন হন। তিনি দালালকে অনুরোধ করেন আমাকে ফেরত আনার। কিন্তু তারা উল্টো মাকে ভয়ভীতি দেখায়। পরে দালালকে ৬০ হাজার টাকা দিলে তারা আমাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে রাজি হয়। তবে তারা আমাকে ফেরত আনেনি। প্রায় দেড় মাস জেল খাটার পরে তারা আমাকে সৌদিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে পাঠায়। দূতাবাস আমাকে আরও অনেক নারীর সঙ্গে দেশে পাঠায়।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সৌদি আরবে কাজের জন্য গিয়ে ফিরে আসা নারীদের অধিকাংশই শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার। বিষয়টি সরকার অবগত আছে। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষের কথা হয়েছে।