ডিবি’র পর এবার র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে যে তথ্য দিলেন সম্রাট

ঢাকা, বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ডিবি’র পর এবার র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে যে তথ্য দিলেন সম্রাট

নিজস্ব প্রতিবেদক ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৮, ২০১৯

print
ডিবি’র পর এবার র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে যে তথ্য দিলেন সম্রাট

শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনুরোধে যুবলীগের পদ দিতেন অস্ত্র ও মাদক আইনের মামলায় রিমান্ডে থাকা ঢাকা মহানগর যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব’র) জিজ্ঞাসাবাদে এমনই তথ্য দিয়েছে ক্যাসিনো সম্রাট। সংশ্লিষ্ট সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অস্ত্র ও মাদক আইনের মামলায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি’র) পর এখন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে ক্যাসিনো গডফাদার সম্রাট তথ্য দিয়েছেন ঢাকা মাহানগর দক্ষিণ যুবলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে কয়েকজন সহযোগীকে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনুরোধে দলে স্থান দিয়েছেন। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনুরোধে তার হাত ধরেই যে পাঁচ সহযোগী দলে পদ পেয়েছেন গ্রেফতারের পর এমন পাঁচ সহযোগীর নামও বলেছেন সম্রাট।

শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনুরোধে তাদের দলে অনুপ্রবেশ ঘটাতে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাদের তিনি ‘ম্যানেজ’ করেছেন। এছাড়া দলে তার চারজন গডফাদার আছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তাদের নিয়মিত বড় অঙ্কের টাকা দিয়েছেন। গডফাদারদের নাম প্রকাশ করে বলেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন, শুধু আমাকে কেন?

সম্রাট বলেন তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই আমি বেপরোয়া হয়ে উঠেছি। গডফাদার নেতাদের আপনারা জিজ্ঞাসা করে দেখেন, ঢাকায় একটি সমাবেশ করতে কত টাকা লাগে। কে দিয়েছে এই টাকা। আমার কাছ থেকেই সবাই টাকা নিয়েছে।

তিনি জানান, সিঙ্গাপুরে হুন্ডি হক নামে পরিচিত এক ব্যক্তির সহায়তায় বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার করেছেন। তার কাছ থেকে হকের একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর উদ্ধার করা হয়েছে। এটি ধরে হকের সন্ধান চলছে বলে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার রাতে সম্রাট এবং তার সহযোগী আরমানকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করেছে র‌্যাব। গ্রেফতারের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট যে চার গডফাদারের নাম বলেছেন, তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। নামগুলো এখনই প্রকাশ করছেন না।

এর আগে সম্রাট বলেছেন, দক্ষিণ যুবলীগের সহসভাপতি সোহরাব হোসেন স্বপন শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহম্মদ মানিক ও সৈয়দ নাজমুল মাহমুদ মুরাদের সহযোগী হিসেবে পরিচিত। তাদের অনুরোধে সোহরাবকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া হয়। এ দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গে সমঝোতা করে তাদের আরেক সহযোগী খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকেও সাংগঠনিক সম্পাদক করেন সম্রাট। তাকে যুবলীগে বড় পদ দিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানেরও তদবির ছিল। দক্ষিণ যুবলীগের সহসভাপতি আরমানের সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। কাইল্যা পলাশ নিজেই যুবলীগ দক্ষিণের পদপ্রত্যাশী ছিল।

কিন্তু তার পরিবর্তে আরমানকে পদ দেয়া হয়। এছাড়া দুই যুগ্ম সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কী এবং জাহিদ সিদ্দিকী তারেককেও যুবলীগের পদ দেয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের ভূমিকা ছিল।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের কমিটি গঠনের কিছুদিন পর ২০১৩ সালের জুলাইয়ে গুলশানে মিল্কীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরদিন এই খুনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত তারেক র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়।

এই পাঁচজন ছাড়া সন্ত্রাসীদের অনুরোধে তাদের অনেক সহযোগীর যুবলীগে অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলেও গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে। এ বিষয়ে তারা খোঁজ নিচ্ছেন। এদিকে ক্যাসিনোর বিষয়ে কারা তার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়েছে, এ বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য দিয়েছেন সম্রাট।

এর আগে, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি’র) জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেলেও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন ঢাকা মহানগর যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। অস্ত্র ও মাদক আইনের মামলায় বুধবার দিনভর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ডিবির উচ্চ পদস্থ কয়েক কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি টিম তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

ক্যাসিনো, অবৈধ মার্কেট, দোকান, ফুটপাত, মাদক ব্যবসার কমিশনসহ বিভিন্ন খাত থেকে তার উপার্জিত টাকা কোথায় রাখা হয়েছে; দল ও দলের বাইরে আড়ালে থেকে এসব অপকর্মে কারা তাকে সহযোগিতা করতেন এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে তাকে।

সম্রাট ডিবিকে বলেছেন, ক্যাসিনোর টাকার ভাগ তো অনেকেই পেয়েছেন। শুধু তাকে কেন দায়ী করা হচ্ছে? তাকে কেন গ্রেফতার করা হয়েছে? অন্যদের কেন নয়? এদিকে সম্রাটের মামলা দুটি র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অস্ত্র ও মাদক আইনের দুই মামলা তদন্ত করছে র‌্যাব। মঙ্গলবার রাতে মামলা দুটি র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. আবদুল বাতেন। পরে বুধবার তাকে র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

রিমান্ড মঞ্জুরের পর সম্রাট ও তার সহযোগী এনামুল হক আরমানকে প্রথমে ডিবি হেফাজতে রাখা রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়- ক্যাসিনো বাণিজ্য, অবৈধ মার্কেট, দোকান, ফুটপাত, মাদক ব্যবসার কমিশনসহ বিভিন্ন খাত থেকে উপার্জিত টাকা কোথায় রাখা হয়েছে? উল্টো ডিবি কর্মকর্তাদের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন- শুধু আমি একা কেন? ক্যাসিনোর টাকা তো অনেকেই পেয়েছেন। তারা কেন বহাল তবিয়তে?

এর আগে, ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। মঙ্গলবার সম্রাটকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে পুলিশ। সেদিন ২০ দিনের রিমান্ড শুনানির জন্য দিন ধার্য ছিল। সম্রাটের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম তোফাজ্জল হোসেন অস্ত্র মামলায় ৫ দিন ও মাদক মামলায় ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

প্রসঙ্গত, গত ৬ অক্টোবর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের আলকরা ইউনিয়নের কুঞ্জুশ্রীপুর গ্রাম থেকে সম্রাটকে গ্রেফতার করা হয়। তখন তার সহযোগী আরমানকেও গ্রেফতার করে র‌্যাব। পরে তাদের যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর আগে গত ০৭ অক্টোবর সম্রাটের বিরুদ্ধে রমনা মডেল থানায় র‌্যাব-১ এর ডিএডি আব্দুল খালেক বাদী হয়ে দুটি মামলা করেন।

আলোচিত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ঢাকার জুয়াড়িদের কাছে ‘ক্যাসিনো সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত। জুয়া খেলাই তার পেশা ও নেশা। প্রতি মাসে ঢাকার বাইরেও যেতেন জুয়া খেলতে।

সম্প্রতি রাজধানীতে ক্লাব ব্যবসার আড়ালে অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনার অভিযোগে র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েন সম্রাটের ডান হাত হিসেবে পরিচিত যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া।

এর পর ধরা পড়েন রাজধানীর টেন্ডার কিং আরেক যুবলীগ নেতা জি কে শামীম। এ দুজনই অবৈধ আয়ের ভাগ দিতেন সম্রাটকে। তারা গ্রেফতার হওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাটের অবৈধ ক্যাসিনো সাম্রাজ্য নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। প্রকাশ্যে চলে আসে সুন্দর অবয়বের আড়ালে সম্রাটের কুৎসিত জগৎ। এতে করে বেকায়দায় পড়েন সম্রাট।