কাউকে ছাড় নয়

ঢাকা, বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

কাউকে ছাড় নয়

এক নীতিতে প্রধানমন্ত্রী

শফিক হাসান ১১:০৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০১৯

print
কাউকে ছাড় নয়

চলমান শুদ্ধি অভিযানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাউকে ছাড় নয়, এ নীতি অবলম্বন করছেন। কঠোর অবস্থান নিয়ে অভিযান শুরু করেছেন ঘর থেকেই। ইতোমধ্যে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও কৃষক লীগের প্রভাবশালী নেতারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন। তছনছ করে দেওয়া হয়েছে তাদের অনিয়ম ও অপরাধের সাম্রাজ্য। আটককৃতদের অপরাধ তদন্তের পাশাপাশি খোঁজা হচ্ছে সহযোগীদেরও।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার এমন জোরালো মনোভাব প্রশংসিত হচ্ছে সবখানে। ইতিপূর্বে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে খোদ দলেই অভিযান চালানোর মতো এতটা কঠোর মনোভাব দেখা যায়নি।

আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড বলছে, ফায়দা হাসিল করতে নানাভাবে বিভিন্ন নেতাকর্মী আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছেন ঢাল হিসেবে। মওকা বুঝে অন্য দল থেকে এসে নব্য আওয়ামী লীগার হয়েছেন এমন কর্মীও কম নন। নীতি-নৈতিকতার চর্চা কিংবা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নয়, তারা এসেছেন স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে। দলকে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে যারা অর্জন করেছেন কাঁড়ি কাঁড়ি সম্পদ, এরা বিপাকে পড়েছেন বর্তমানে। ভাবতে পারেননি, খোদ দল থেকেই নেমে আসবে খড়গ।

এর আগে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধের বিচারসহ নানাভাবে চ্যালেঞ্জ নিয়ে ইতোমধ্যে ‘আপসহীন’ খ্যাতি লাভ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তার সাহসিকতা, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারার দক্ষতা, কোমলে-কঠোরে মেশানো মনোভাবের সঙ্গে পরিচিত দেশের মানুষ। বিদেশের বিভিন্ন জরিপেও তিনি প্রভাবশালী নেতা হিসেবে স্থান পেয়েছেন একাধিকবার।

দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের সময় এমন দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। নতুন করে যে বজ্র আঁটুনি সেটা দলের ভেতরে যেমন, বাইরের সাধারণ মানুষের কাছেও একপ্রকার অপ্রত্যাশিত ছিল। ক্ষমতার কেন্দ্রে বরাবরই একশ্রেণির দুধের মাছি ভনভন করে। দলের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করে এরাই কৌশলে আসন দখল করেন। দল পরিচালনার পাশাপাশি সরকারের কৌশলগত স্বার্থে কখনো কখনো এদের সয়ে যেতে হয়। এবার সমস্ত সমীকরণ ভেঙে প্রধানমন্ত্রী এগিয়ে এসেছেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কেউ কেউ দেশ ছেড়েছেন, অনেক দুর্নীতিবাজ দেশ ছাড়ার পাঁয়তারা করছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ অভিযান ঘিরে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার নজির রাখতে চান। এরইমধ্যে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে পরিষ্কার করে দিয়েছেন তার পরিবারের সদস্য বলতে আসলে কারা। এর বাইরে আত্মীয় পরিচয় দিয়ে যদি কেউ অনৈতিক পন্থায় সম্পদ অর্জন করে থাকেন তাদের কাউকেই ছাড় না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রয়েছে মন্ত্রিসভা থেকে শুরু করে সংসদ সদস্য, বিভিন্ন জেলা প্রশাসকসহ পদস্থ কর্মকর্তাদের ওপর। কে কোন তরিকায় চলেন, কী করতে চান- সেটাও অবিদিত নয় তার। সম্প্রতি গণভবনে শীর্ষ এক নেতার সম্পদলিপ্সায় ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেছেন, একজীবনে কত কোটি টাকা লাগে? চলমান শুদ্ধি অভিযানে তার নীতি একটাই, অপরাধী যেই হোক, ছাড় নয়।

দুর্নীতিবাজদের সম্পদলিপ্সার শেষ নেই। যে কারণে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার পরও সংশ্লিষ্টরা থামেন না। এতে সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয়, উন্নয়নকর্মে চরমভাবে ব্যাঘাত ঘটে। উন্নয়ন প্রকল্প থেকে সংশ্লিষ্টদের চাঁদা দাবির কারণে অনেক জায়গাতেই গেছে কাজ। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হয়েই বন্ধ রেখেছে কাজ। দীর্ঘসূত্রতায় সরকার নানাভাবে সমালোচিত হলেও ‘পার্সেন্ট-বাজদের’ কিছু যায়-আসে না।

চলমান শুদ্ধি অভিযানে সরকারি নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। কী আছে তার মনে, জানে না কেউই। যে জন্য ছোট-বড় সবার মধ্যেই কাজ করছে একধরনের আতঙ্ক। শুধু সরকারি লোকজনই নন, এর বাইরেও যত দুর্নীতিবাজ যত জায়গায় ঘাপটি মেরে আছে সব বিষয়েই ওয়াকিবহাল শেখ হাসিনা। এখন সময় বুঝে অভিযান পরিচালনার অপেক্ষা।

সূত্র বলছে, ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেফতার হওয়া যুবলীগের খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ইতিপূর্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, টাকার ভাগ কোথায় কোথায় যায়। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা ছাড়া আইনবিরোধী এসব কাজ পরিচালনা অসম্ভব। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট গত বুধবার ডিবিকে জানান, ক্যাসিনোর টাকার ভাগ অনেকেই পেয়েছেন। শুধু তাকে কেন দায়ী করা হচ্ছে? তাকে কেন গ্রেফতার করা হয়েছে, অন্যদের কেন নয়!

এ বছরের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের সব সহযোগী সংগঠনের কাউন্সিল হবে। এতে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে ছাত্রলীগের পরীক্ষিত সাবেক নেতাদের স্থান দেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেউ কেউ সেলিব্রিটিরাই আসছেন যুবলীগের নেতৃত্বে এমন ধারণা প্রকাশ করলেও সপক্ষে শক্ত উদাহরণ নেই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজির অভিযোগে বহিষ্কার হয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। এটা নতুন দায়িত্ব নেওয়া কেন্দ্রীয় নেতাসহ সব ছাত্রলীগ নেতার জন্য একধরনের ‘চরমপত্র’। প্রধানমন্ত্রী শুদ্ধি ইস্যুতে যে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতেও রাজি নন- সর্বশেষ নজির বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আইনের আওতায় আনা।

শোভন-রাব্বানীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমেই শুরু হয় চলমান শুদ্ধি অভিযান। এরপর আওতায় আসে যুবলীগ ও কৃষক লীগ। যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, জি কে শামীম, এনামুল হক আরমান, ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের মতো টাকার কুমিররা বর্তমানে কারাগারে। বহিষ্কার করা হয়েছে ভারতে পলাতক যুবলীগের দফতর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানকে। কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ গ্রেফতার হয়েছেন ক্যাসিনোকাণ্ডে। সম্পৃক্ততা মিলেছে বিসিবি পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়ারও। ক্রীড়াঙ্গন অবৈধ ব্যবসায়ীদের দখলে, ক্রীড়াঙ্গনের কর্মকর্তাদেরও জড়িত থাকা বিস্ময়ের জন্ম দেয়; তবে অবাক হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন সাধারণ মানুষ। খোদ মতিঝিল থানার নাকের ডগায় যেভাবে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার স্বর্গরাজ্য কায়েম হয়েছে তাতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব-কর্তব্য। নেপথ্যে ছিল দেওয়া-নেওয়ার সমীকরণ।

যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে দলের অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করার। বর্তমানে সরকারের রোষানলে থাকা ৭১ বছর বয়সী এই ব্যক্তি স্বেচ্ছাবন্দি জীবনযাপন করছেন। তার বিরুদ্ধে গ্রহণ করা হয়েছে কয়েকটি নিষেধাজ্ঞা। আসন্ন কাউন্সিলে বাদ পড়তে পারেন এমন কানাঘুষা চলছে।