সুন্দরবনে আরেক বিদ্যুৎকেন্দ্র

ঢাকা, বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সুন্দরবনে আরেক বিদ্যুৎকেন্দ্র

আবুল হাসান, মোংলা ১১:০০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০১৯

print
সুন্দরবনে আরেক বিদ্যুৎকেন্দ্র

এবার সুন্দরবনের কোলঘেঁষে মোংলায় বেসরকারি উদ্যোগে নির্মাণ করা হচ্ছে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক নতুন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে সুন্দরবন রক্ষায় জাতিসংঘের ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ ফাইন্ডেশনসহ দেশি-বিদেশি পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর উৎকণ্ঠার মধ্যে নতুন করে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।

সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) ১০ কিলোমিটারের মধ্যে মাত্র পাঁচ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে ১০০ মেগাওয়ার্ট এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ হচ্ছে।

মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে সাত একর জমির ওপর ‘পাওয়ারপ্যাক’ নামে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবকাঠামো নির্মাণ কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার বলেছেন, মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। তবে এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) রিপোর্ট ও পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়েছে দাবি নির্মাণাধীন পাওয়ারপ্যাক বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ।

এদিকে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর বলছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ হলে আবারও সুন্দরবনের ‘শেলা ট্রাজিডি’র সৃষ্টি হবে। অস্তিত্ব সংকটে পড়বে বাংলাদেশের ফুসফুস সুন্দরবন। তারা দাবি জানিয়েছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সুন্দরবনের ইসিএভুক্ত এলাকা থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার।

‘দেশের অক্সিজেনের ভাণ্ডার’ ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইট ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতির জীবন্ত হুমকি হচ্ছে ফার্নেস অয়েল। দেশের সর্বমোট বনাঞ্চলের ৫১ ভাগই হচ্ছে সুন্দরবন। ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর মোংলার অদূরে সুন্দরবনের শেলা নদীতে ৩ লাখ টন ফার্নেস অয়েল নিয়ে ডুবে যায় একটি ট্যাঙ্কার। দিনে দুবার জোয়ারের পানিতে প্লাবিত বিশ্বের বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের কয়েক লাখ হেক্টর বনভূমির গাছের শ্বাসমূলসহ নদী-খালে ছড়িয়ে পড়ে ফার্নেস অয়েল। অস্তিত্ব সংকটে পড়ে সুন্দরী, গেওয়া, গরান, পশুরসহ ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদরাজি, ‘বিলুপ্ত প্রজাতির ইরাবতীসহ ছয় প্রজাতির ডলফিন, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণসহ ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও ২৯২ প্রজাতির মৎস্য সম্পদ। তখন সুন্দরবনকে বাঁচাতে খোদ জাতিসংঘের ২৫ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দলকে ছুটে আসতে হয় সুন্দরবনে।

সুন্দরবনে ফার্নেস অয়েল ছড়িয়ে পড়ার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কয়েক বছর সময় লেগেছে। এখন ম্যানগ্রেভ এই বনের পশুর চ্যানেল দিয়ে অয়েল ট্যাঙ্কারে করে ফার্নেস অয়েল এনে সুন্দরবন সন্নিহিত মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে চালানো হবে বিদ্যুৎকেন্দ্র। সুন্দরবনের ইসিএভুক্ত এলাকার মাত্র পাঁচ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ১০০ মেগাওয়ার্ট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের খবরে শুধু পরিবেশবাদীরাই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও সুন্দরবন গবেষক ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হচ্ছে ফার্নেস অয়েল। আমরা সুন্দরবনে আর একটি শেলা ট্র্যাজিডি দেখতে চাই না। ১৯৯৭ সালের জাতীয় পরিবেশ কমিটির চতুর্থ সভার (৩, ৪, ৫) সিদ্ধান্ত ও আমার দায়ের করা হাইকোর্টের রিট মামলায় (১২৪৬৭/২০১৭) সুন্দরবনের ইসিএভুক্ত এলাকাতে বিপজ্জনক শ্রেণিভুক্ত শিল্প-প্রতিষ্ঠান স্থাপনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এরপরও সুন্দরবনের ইসিএভুক্ত এলাকার মাত্র পাঁচ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরোধী নই। কিন্তু সুন্দরবনকে আর অস্তিত্ব সংকটে ফেলতে দেওয়া যাবে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সুন্দরবনের ইসিএভুক্ত এলাকা থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে।

মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে নির্মাণাধীন পাওয়ারপ্যাক ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম জানান, পাওয়ারপ্যাক মুটিয়ারা খুলনা পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেড নামের এই বেসরকারি কোম্পানিটি ২০১২ সালে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় থেকে এই বিদ্যুৎ প্রকল্পটির অনুমোদন পায়। আর ২০১৭ সালে মোংলা বন্দর সংলগ্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে এটি স্থাপনের জন্য আবেদন করে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। ইতিমধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) রিপোর্ট ও পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়েছেন দাবি করেন তিনি।

প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম আরও বলেন, প্রকল্প এলাকার মাটি পরীক্ষা হয়ে গেছে। ডিজাইনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এখন পাইলিংয়ের কাজ চলছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি করবে না বলেও জানান তিনি। যে কোনো দিন শুরু হবে মূল নির্মাণকাজ।

তবে বাস্তব অবস্থা হচ্ছে ইতিমধ্যেই অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। নির্মাণাধীন পাওয়ারপ্যাক বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায় বহিরাগতদের প্রবেশ করতে না দিয়েই কোম্পানিটি ২০০ একর জমির ওপর বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ একাধিক লাল বিপজ্জনক শ্রেণিভুক্ত শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড দিয়ে পুরো দমে চলছে বালু ভরাটসহ সড়ক, পাইলিং ও অবেকাঠামো নির্মাণ কাজ।

বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার জানান, মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। রামপাল-মোংলা আমার নির্বাচনী এলাকা। সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন ১০ কিলোমিটার ইসিএভুক্ত এলাকাতে বিপজ্জনক শ্রেণিভুক্ত শিল্প-প্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হবে না। সুন্দরবন শুধু আমাদের জাতীয় সম্পদই নয়, ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ এই ম্যানগ্রেভ বন ‘দেশের অক্সিজেনের ভাণ্ডার।

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যকে রক্ষায় সরকার সচেতন রয়েছে। তাই মোংলায় পরিবেশ দূষণ করার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান পরিবেশ ছাড়পত্র পাবে না। এখন থেকে মোংলায় বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ ভারী বা বিপজ্জনক শ্রেণিভুক্ত শিল্প-প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে হলে সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপাশে করতে হবে।