সত্যি কি, কান নিয়েছে চিলে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সত্যি কি, কান নিয়েছে চিলে

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভারত সফর

শফিক হাসান ১০:৫২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০১৯

print
সত্যি কি, কান নিয়েছে চিলে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফর নিয়ে নানা কারণেই চলছে তর্ক-বিতর্ক। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে এ বৈঠকে সাতটি সমঝোতা ও তিনটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এ সফরে ভারতের কাছ থেকে তিস্তা নদীর ন্যায্য হিস্যা পাবে বাংলাদেশ- এমন প্রত্যাশা ছিল। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের জোরালো ভূমিকা এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া হবে মোটাদাগে; এসব প্রত্যাশা থাকলেও শেষপর্যন্ত বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এ বিষয়গুলোর তেমন কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

অন্যদিকে ফেনী নদীর পানির একটি অংশ ভারতের ত্রিপুরাকে দেওয়ার পাশাপাশি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) রপ্তানির বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন অনেকেই। তিস্তা নদীর পানির হিস্যা পাওয়ার বিপরীতে ভারতকে ফেনী নদীর পানি দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন জনগণের একাংশ।

আমদানিকৃত গ্যাস রপ্তানির বিষয়ে সমালোচকরা বলছেন, দেশের সব জায়গাতেই এখনো গ্যাস পৌঁছেনি, চাহিদা মেটানো যায়নি সবার- এ অবস্থায় ভারতে এলপিজি রপ্তানি কতটা যুক্তিযুক্ত! এ বিষয়গুলো নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মানবিক কারণেই ত্রিপুরাকে ফেনী নদীর অল্প পানি দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে তিস্তার হিস্যা আলোচনাসাপেক্ষ। প্রক্রিয়া এখনো চলমান। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি করা হচ্ছে না। আমদানিকৃত এলপিজি প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে রপ্তানি করা হবে শুধু।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভারত সফর নিয়ে বিচার-বিবেচনাহীনভাবেই একপক্ষ সমালোচনায় মেতে উঠেছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা দিয়ে জোরালো অবস্থান নেওয়া হচ্ছে না। এতে করে ‘ভারতের কাছে দেশ বিক্রি’ করে দেওয়া হচ্ছে এমন গুজব ছড়াচ্ছেও একটি পক্ষ। তর্ক-বিতর্কের পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বাংলা প্রবাদ ‘কান নিয়েছে চিলে’ এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। সত্যিই কি, কান নিয়েছে চিলে- তা জানতে গতকাল সোমবার এ বিষয়ে খোলা কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন চার বিশিষ্ট ব্যক্তি।

এরা হলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহফুজা খানম ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বাংলাদেশের প্রাপ্তি বলতে যেটা বুঝি- দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যে নানা বিষয় থাকে, পারস্পরিক আলোচনা করতে হয়, বাংলাদেশ-ভারত দুই প্রধানমন্ত্রীর যে শীর্ষ বৈঠক, এটাই বড় প্রাপ্তি। দুই দেশের দুই সরকারপ্রধান যখন মিলিত হন, অনেক সমস্যারই সমাধান হয়, অনেক সমস্যার আলোচনা হয়। সেভাবেই সম্পর্ক এগিয়ে চলে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে সম্পর্ক সেটি অন্যমাত্রার সম্পর্ক। দুটি দেশের মধ্যে পারস্পরিক যে সম্পর্ক সেটি কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নয়। এ সম্পর্ক রক্তের সম্পর্ক। এটা নিয়েই আমরা এগিয়ে চলেছি।

তিনি আরও বলেন, ফেনী নদীর পানি দেওয়া হচ্ছে ভারতের ত্রিপুরার একটি শহরের মানুষের পান করার জন্য। সেখানে পানি সংকটে বাংলাদেশ পানি দিচ্ছে। খুবই সামান্য পানি- ১.৮ কিউসেক। এটি যে কোনো মানবতার বিচারে দেওয়ার যৌক্তিকতা- সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। তিস্তার পানির বিষয়ে যে বক্তব্য, সেটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো সমাধানে পৌঁছানো যায়নি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সদিচ্ছা বারবার প্রকাশিত হচ্ছে। সেটি শুধু নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যে আসেনি, অতীতে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহও বলেছিলেন। ঢাকায় এসেও তিনি সদিচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

গ্যাস রপ্তানির বিষয়ে আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, গ্যাসের ব্যাপারে যেটা হয়েছে, বিষয়টা একেবারেই দুটি দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ এখানে দেওয়া হচ্ছে না। আমরা জানি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ৫০ বছরের গ্যাস রিজার্ভ রেখেই রপ্তানির কথা সেই প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সামনেই সাহসী উচ্চারণ করেছিলেন। সেখান থেকে তিনি সরে আসেননি।

এখন তিনি যে সমঝোতা করেছেন সেটি হচ্ছে, আমদানিকৃত গ্যাস এখানে প্রক্রিয়াজাত করে সেটা বাইপ্রোডাক্ট, এদেশের চাহিদা পূরণ করে যেটা উদ্বৃত্ত থাকবে সেটা রপ্তানি করছেন। আমদানিকৃত গ্যাসকে প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি স্বাভাবিক বিষয়।

পৃথিবীতেই এভাবে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমরা জানি, জাপান সব সম্পদই প্রক্রিয়াজাত করে। তাদের নিজস্ব সম্পদ বেশি কিছু নেই। তারা বিভিন্ন দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে এটাকে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে পরবর্তীকালে রপ্তানি করে। সেখান থেকে আয়ও করছে। বাংলাদেশও একইভাবে প্রক্রিয়াজাত করে সেই গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে। সেটা দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ ও অন্যান্য জায়গায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আমার মনে হয়, এতে বাংলাদেশ সব দিক থেকেই উপকৃত হবে। শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির যে সম্পর্ক তাতে আমরা আশা করব, ভবিষ্যতেও এভাবে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে যাবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভারত সফর নিয়ে অনেক কথাই হয়েছে। এতে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা হয়নি, রক্ষা করা হয়েছে ভারতের স্বার্থ। ফেসবুকে এ বিষয়ে লেখায় আবরার ফাহাদকে হত্যা করা হয়েছে। আমার ধারণা, আবরার হত্যা বুয়েট ছাত্রলীগের সিদ্ধান্ত ছিল না; নিশ্চয়ই ওপর মহল থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল- ওকে সাইজ করতে হবে। সাইজটা একটু বেশি হয়ে গেছে তো, এজন্য মারা গেছে।

দিলারা চৌধুরী আরও বলেন, দেশের অবস্থা খুবই খারাপ। এখান থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ দেখি না। ভারত এখন যেটা চাচ্ছে সেটাই হচ্ছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থাকতে হলে যা যা করা দরকার, ভারতের জন্য সবই করবেন। আবরার মারা যাওয়ার পর এমনিতেই আমাদের মন-মেজাজ খুব খারাপ হয়ে আছে। কথা বলতে ইচ্ছা করে না। বুয়েটের মতো একটি বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে ছাত্রদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা থাকার কথা, সেখানে কীভাবে ছাত্রহত্যা হয়! আমি বুঝলাম না, প্রভোস্ট ও হাউস টিউটরের নামে মামলা হলো না কেন।

ডাকসুর প্রথম নারী ভিপি মাহফুজা খানম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্ন আছে। এসব বিষয়ে বেশি না বলাই ভালো। স্বাক্ষরিত চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভারত কি বেশি লাভবান হবে- এমন কথা বলা হচ্ছে। আসলে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ভারত অবশ্যই আমাদের প্রতিবেশী; শুধু প্রতিবেশীই নয়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সহায়ক শক্তি ছিল। আমরা বলব, পাশাপাশি দুটো দেশ; কেউ কাউকে ছোট বা বড় কথা না বলাই ভালো। দুটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে দুদেশের মধ্যে সুসম্পর্ক বিদ্যমান থাকা উচিত। সেটা এগিয়ে নেওয়া উচিত বাংলাদেশেরও, ভারতেরও। চুলচেরা হিসাবে সম্পর্ক হয় না।

মাহফুজা খানম আরও বলেন, চুক্তিকে কেন্দ্র করে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড অনাকাক্সিক্ষত। দেশটা তো এখন সঠিক জায়গায় নেই। আইনের শাসন, সুশাসনের দারুণ অভাবের ফলে দীর্ঘদিন যাবৎ যেভাবে প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাজে অবস্থা বিরাজ করছে। যে কোনো সমাজের উত্তরণের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা, তাই শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।

দীর্ঘদিন যাবৎ শিক্ষাঙ্গনগুলোতে ছাত্ররাজনীতির নামে যে অপরাজনীতি চলছিল এবং চলছে। এটা যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানে না, তা তো নয়। এই যে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে হত্যা করা হলো; তারপর বেরিয়ে এলো টর্চার সেলের কথা। হেন কোনো কাজ নেই যে অপকর্মের সঙ্গে ছাত্রলীগ যুক্ত নয়। আজ যারা শাসনক্ষমতায় আছেন, এর আগেও যারা ছাত্র সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করেছেন। এই ছাত্ররাও আখের গোছানোর চেষ্টা করেছে। তাদের যে সুষ্ঠু স্বাভাবিক জীবন, মানবিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দরকার ছিল, ছাত্রসংগঠনগুলো তাদের দায়িত্ব-কর্তব্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেনি। আমরা ’৫২ বলি, ’৬২ বলি, ৬ দফার আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ- তার ভেতর দিয়েই ছাত্রদের যে যাত্রা ছিল সেই যাত্রা থেকে ছাত্রদের সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

ছাত্ররাজনীতির সমালোচনা করে সাবেক এই ডাকসু ভিপি আরও বলেন, এখন আমরা কী দেখছি? সর্বশেষ আবরার হত্যাকাণ্ড! আমি মনে করি, এটা জাতিকে বড় একটা ধাক্কা দিয়ে গেছে। ৯০-এর দশকে মিলনহত্যা সমস্ত জাতিকে বিরাট একটা ধাক্কা দিয়েছে, ঠিক আবরার হত্যাকাণ্ডে ভেতর দিয়ে নতুন করে সবাইকে ভাবতে হবে। বড়রা, শিক্ষকরা যেন এসব ঘটনাকে না দেখার ভান করে এড়িয়ে না যান। প্রাপ্তির জায়গায় তারা আপস রক্ষা করেছেন। এ ঘটনা অবশ্যই জাতিকে একটা নতুন জ্ঞান দেবে। নতুন পথ খুঁজে পাবে।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে বাংলাদেশের কোনো প্রাপ্তি নেই। ভারত যা যা চেয়েছে, সবই পাচ্ছে। যা চুক্তি হয়েছে সবই ভারতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে অগ্রগতি নেই। ফলে বাংলাদেশের মানুষের ধারণা এটা বন্ধুত্ব নয়। বর্তমান সরকার যেহেতু জনগণের সম্মতি ছাড়া ক্ষমতায় আছে, তারা বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।