প্রতিশ্রুতি-বাস্তবতায় ফারাক

ঢাকা, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ভূমিকম্প মোকাবেলা

প্রতিশ্রুতি-বাস্তবতায় ফারাক

ডেস্ক রিপোর্ট ৮:৪৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০১৯

print
প্রতিশ্রুতি-বাস্তবতায় ফারাক

নেপালে ২০১৫ সালের ভূমিকম্প নাড়িয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশকেও। ওই ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশে সরকারিভাবে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু চার বছরেও এ সম্পর্কিত নীতিমালা কোনো দিনই মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

এক প্রতিবেদনে বিবিসি বাংলায় বলা হয়েছে, ২০০৪ সালেই জাতিসংঘের সহায়তায় সরকার ও কিছু সংস্থা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিতে গুরুত্ব দেওয়া শুরু করেছিল এবং সেই পরিকল্পনায় ভূমিকম্পের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পরে ২০০৯ সাল নাগাদ দেখা যায়, ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতায় প্রয়োজনীয় জনবল ও উপকরই নেই ফায়ার সার্ভিস বিভাগের। কর্তৃপক্ষেও দাবি, ফায়ার সার্ভিস এখন অনেক বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে। ভূমিকম্পজনিত আগুন বা অন্য বিপর্যয়ে তারা আরও বেশি সক্রিয়তা দেখাতে পারবে। প্রায় এক লাখ স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রয়োজনের সময় তারাও কাজ করতে পারেন।

যেসব প্রতিশ্রুতি এসেছিল নেপালে ভূমিকম্পের পর : নেপালের ভূমিকম্পের ভয়াবহতায় তখন বাংলাদেশজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল। কারণ এরপর বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল। এরপর প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার। সিদ্ধান্তটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তবে এ সম্পর্কিত কিছু কাজ চলছে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া ওই বৈঠকে ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এনডিএমআইএস) নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরির সিদ্ধান্তও হয় বলে তখন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেটিও এখনো হয়নি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম ওয়ারা বলছেন, এমন অনেক বিষয়ে এখনো কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। বিল্ডিং কোড খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হলেও সেগুলোর গেজেট হয়নি। বিল্ডিং কোড সহজবোধ্য করে মানুষের কাছে পৌঁছানো দরকার ছিল, যাতে করে ভবন নির্মাণের সময় মানুষ সত্যিকার অর্থেই সতর্ক হওয়ার গুরুত্ব বুঝতে পারে। কিন্তু এ কাজটিও করা হয়নি এখনো। আবার প্রস্তুতি বা যা কাজ হচ্ছে তার লক্ষ্য শহর এলাকা। কিন্তু ভূমিকম্পের জন্য শহর ও গ্রাম এলাকায় সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, একটা কক্ষ কতটুকু বড় হলে দরজার সংখ্যা বাড়ানো দরকার যাতে দুর্যোগজনিত আগুনের সময় সহজেই মানুষ বের হয়ে আসতে পারে- এ ধারণাটি এখনো জনপ্রিয় হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাফিজা খাতুন বলছেন, সচেতনতা তৈরির মতো রুটিন কিছু কাজ চলছে ভূমিকম্প বিষয়ে এবং এর বাইরে বড় ধরনের কাজ বলতে ফায়ার সার্ভিসের কিছু যন্ত্রপাতি দেখা যাচ্ছে। আসলে যখন ঘটনা ঘটে নানা উদ্যোগ নেই আমরা যা পরে ভুলে যাই। রুটিন কাজ হলো সচেতনতা। এটি নিয়ে অনেক কাজ হয়।

এমনকি বিল্ডিং কোডের পরিবর্তনগুলোও এখনো চূড়ান্ত করে মানুষকে জানানো হয়নি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ঢাকার মধ্যে বড় ভূমিকম্প সৃষ্টির মতো ভূতাত্ত্বিক অবস্থা না থাকলেও সিলেট এবং চট্টগ্রামে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাজধানী ঢাকার।

বুয়েটের সঙ্গে যৌথভাবে সরকারের সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি সিডিএমপির এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাড়ে সাত মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়বে। যেখানে তৈরি হবে সাত কোটি টন কনক্রিটের স্তূপ।

এমন ভয়াবহ আশঙ্কার বিপরীতে প্রস্তুতি কতটা সম্পন্ন হয়েছে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ঘরবাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এখন অনেকেই ভূমিকম্প বা এ ধরনের দুর্যোগের বিষয়টি বিবেচনা করে প্রকৌশলীদের সহায়তা নিয়ে ঘরবাড়ি নির্মাণে উৎসাহিত হচ্ছে। এ ধরনের ভবন গত দশ বছরে অনেকে বেড়েছে।

অগ্রগতি হয়েছে কি?
জানা গেছে, নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর বিশ্বব্যাংক ও জাইকার সহায়তা বাংলাদেশে ভবন পর্যবেক্ষণ ও অবস্থা যাচাই করার জন্য বেশ বড় ধরনের কর্মকাণ্ড শুরু হয়। যার আওতায় সরকারি ভবন বিশেষ করে স্কুল, হাসপাতাল ও ফায়ার সার্ভিস ভবনগুলো পর্যবেক্ষণের কাজ শুরুর পাশাপাশি রাজউকের মাধ্যমে প্রাইভেট ভবনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শুরু হয়।

এসব প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত আছেন বুয়েটের শিক্ষক মেহেদী হাসান আনসারী। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় রাজউকের আওতাধীন ভবন এসেসমেন্ট কাজ চলছে আর জাইকার অর্থায়নে সরকারি ভবনগুলো নিরীক্ষা করা ও মজবুত করার কাজ চলছে। এসেসমেন্ট প্রতিবেদন কয়েক মাসের মধ্যেই চূড়ান্ত হবে।
জানা গেছে, শুধু ঢাকাতেই প্রায় পাঁচ হাজার হাসপাতাল, স্কুল, ফায়ার সার্ভিস ভবনসহ সরকারি ভবনগুলো পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। তবে প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্প ও ভূমিকম্পজনিত দুর্ঘটনা প্রতিরোধে খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই এই ভবনগুলো-এমনটাই জানিয়েছেন মেহেদী হাসান আনসারী। তিনি বলেন, ৬০০ স্কুলকে টার্গেট করা হয়েছে এসেসমেন্টের জন্য এবং এর মধ্যে ২০০ স্কুলের এসেসমেন্ট শেষ হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. শাহাদৎ হোসেন বলেন, বিল্ডিং কোডকে শক্তিশালী করা হয়েছে এবং ভূমিকম্প সহনীয় অবকাঠামো নির্মাণে জোর দেওয়া হয়েছে। আমরা একই সঙ্গে পূর্বাচলে তিন একর জায়গায় মানবিক সহায়তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজ করছি। যাতে বড় দুর্যোগ হলে সেখান থেকেই জরুরি অপারেশন্স চালানো সম্ভব হয়। আর এয়ারপোর্টের কাছে বিবেচনায় সেখানে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি নিয়ে এখন কাজ চলছে। আমাদের মূল লক্ষ্য অবকাঠামো বিশেষ করে স্কুল, ঘরবাড়িকে ভূমিকম্প সহনীয় করে গড়ে তোলার সংস্কৃতি তৈরি করা। সে লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে।