সৌদির জন্য বুমেরাং

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯ | ৭ কার্তিক ১৪২৬

সৌদির জন্য বুমেরাং

ইয়েমেনে হামলার পাল্টা জবাব দিচ্ছে বিদ্রোহীরা

সাজ্জাদ হোসেন ১০:১৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯

print
সৌদির জন্য বুমেরাং

ইয়েমেনে সৌদি জোটের হামলার পাল্টা জবাব দিচ্ছে হুতি বিদ্রোহীরা। সম্প্রতি সৌদি আরবের দুটি বৃহৎ তেল শোধনাগারে শক্তিশালী ড্রোন হামলা চালায় তারা। এতে তেল শোধনাগার দুটিতে আগুন ধরে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনার পর থেকে দেশটিতে আরও বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

হুতি বিদ্রোহীদের একজন মুখপাত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানান, তারা অন্তত ১০টি ড্রোন ব্যবহার করে এই আক্রমণ চালিয়েছেন। সৌদি লক্ষ্যবস্তুর ওপর তাদের আক্রমণ আরও বাড়বে এবং সৌদি আগ্রাসন ও অবরোধ অব্যাহত থাকলে অতীতের তুলনায় এসব হামলা তাদের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

২০১৫ সালে হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আবেদ রাব্বো মনসুর হাদির সরকারকে উৎখাত করলে সেখানে অভিযান শুরু করে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত জোট। তখন থেকেই ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের লড়াই চলে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে সৌদি হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে ১০ হাজার মানুষ নিহত ও ৬০ হাজার আহত হয়েছেন। তবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৫৭ হাজার ছাড়িয়েছে। ৩৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

গত কয়েক মাসে হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের ভেতরে সামরিক ঘাঁটি ও বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করের শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়ে পাল্টা জবাব দিতে শুরু করে। সেসব হামলায় বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও যে কোনো সময় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করে আসছিলেন নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা। এরই মধ্যে গত ১ সেপ্টেম্বর ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ দামারে হুতি বিদ্রোহীদের পরিচালিত এক বন্দিশালায় সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন জোটের একাধিক বিমান হামলায় কমপক্ষে ১০০ ব্যক্তি নিহত হন। হামলার ঘটনায় নিখোঁজ হন কমপক্ষে ৬৮ জন।

ধারণা করা হচ্ছে, ওই হামলার পাল্টা জবাব দিতে গত শনিবার সৌদি আরবের দুটি তেল ক্ষেত্রে হামলা চালায় হুতি বিদ্রোহীরা। দুটি শোধনাগারই রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তেল কোম্পানি আরামকোর পরিচালনাধীন। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত আবকাইকে তেল শোধনাগারটি বিশ্বের বৃহত্তম এবং সেখান থেকে একশ কিলোমিটার দূরের খুরাইস হচ্ছে সৌদি আরবের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেলক্ষেত্র। হামলার শিকার খুরাইসে বিশ্বের মোট চাহিদার এক শতাংশ তেল উৎপন্ন হয়, আর আবকাইক তেল শোধনাগার বিশ্বের সরবরাহের সাত শতাংশ তেল জোগান দিয়ে থাকে। হামলার পর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তেল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় দুটি তেল শোধনাগারে। ফলে দেশটির তেল উৎপাদনে স্মরণকালের মধ্যে ধস নামে। বিশ্ববাজারে পরে এর প্রভাব।

সাম্প্রতিক এসব হামলা থেকে এটা স্পষ্ট যে সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলো হুতি বিদ্রোহীদের হুমকির মুখে রয়েছে। সেই সঙ্গে হুতিদের ড্রোন আক্রমণ চালানোর দক্ষতা যেভাবে বাড়ছে তাতে এই বিতর্কটা আবার নতুন করে সামনে চলে আসছে যে তাদের এই সক্ষমতা অর্জনের পেছনে কোনো শক্তিশালী দেশের হাত রয়েছে। তাদের সাম্প্রতিক হামলার সক্ষমতা এবং লক্ষ্যবস্তুর ধরন দেখে সহজেই অনুমেয় ইয়েমেনে সৌদি জোটের অভিযানের মারাত্মক ফল ভোগ করতে হতে পারে সৌদি আরবকে। দেশটির তেলনির্ভর অর্থনীতিও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

ইতোমধ্যেই অভ্যন্তরীণ হামলা মোকাবেলায় দেশটির সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতেও শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠতে শুরু হয়েছে তবে কী ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের ওপর হামলা সৌদির জন্য বুমেরাং হতে চলেছে! রিয়াদ ও ওয়াশিংটন এসব হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে আসছে। তবে বরাবরের মতো ইরান এসব অভিযোগকে অমূলক বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, আরব বিশ্বের সরকার ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে মাঝে মাঝেই দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সংকট চরমে উঠতে দেখা যায়। ইয়েমেনকে কেন্দ্র করে আরব বিশ্বে চলমান যে অস্থিরতা তা ব্যতিক্রম কিছু নয়। একটি সরকারকে গায়ের জোরে হটিয়ে হুতিদের ক্ষমতা দখল যেমন সমর্থনযোগ্য নয়, তেমনি সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আরব জোটের ইয়েমেনে হামলা ও হত্যাযজ্ঞ দুর্ভাগ্যজনক।

হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার ধরন প্রমাণ করে তাদের পেছনে ইরানসহ অন্যান্য সৌদিবিরোধী শক্তির হাত রয়েছে। তবে এসব ঘটনার পেছনে যারাই থাকুক আর অপরাধী যেই হোক বর্তমান পরিস্থিতি বলে দিচ্ছে যা ক্ষতি হওয়ার সৌদিরই হবে। এখানে হুতিদের হারানোর কিছু নেই।

এ সব ঘটনার জন্য আরব দেশগুলোর অগণতান্ত্রিকতা দায়ী। দেশগুলোর সরকার ব্যবস্থার দুর্বলতার ফলে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ যেসব রাষ্ট্র আন্তর্জাতিকভাবে আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি করে থাকে তারা সুযোগ নিচ্ছে। আরব বিশ্বকে অস্থিতিশীল করতে এর আগেও ইরাক ইরান যুদ্ধ বাধানো হয়েছে। বর্তমানে সৌদি-ইরান যুদ্ধের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সাম্প্রতিক হুতিদের হামলা সৌদি আরবের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করছে। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে সৌদি আরবের উচিত হবে দ্রুত ইয়েমেন সংকট নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া। উদ্যোগ ব্যর্থ হলে নিজেদের সরিয়ে নেওয়াই মঙ্গল হবে। অপরপক্ষে নিজ দেশের মানুষের দিকে তাকিয়ে হুতিদেরও নিজ দেশের সরকারের আনুগত্য মেনে নেওয়া উচিত। নিজেদের সৃষ্ট এসব সমস্যা মুসলিম দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও শান্তির প্রতিষ্ঠার জন্য হুমকি।