কী বার্তা প্রধানমন্ত্রীর

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯ | ৭ কার্তিক ১৪২৬

কী বার্তা প্রধানমন্ত্রীর

মন্ত্রী-এমপি, সব পর্যায়ের নেতা এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কড়া ইঙ্গিত

কুন্তল দে ১১:০০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৯

print
কী বার্তা প্রধানমন্ত্রীর

মেয়াদ শেষের আগে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনন্য এক নজির স্থাপন করলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাদের পদচ্যুতির মধ্য দিয়ে শুধু ছাত্রলীগ নয়, মন্ত্রী-এমপি, সব পর্যায়ের নেতাদের উদ্দেশে কঠোর এক বার্তা দিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তা থেকে বাইরে নন দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তারাও। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, দল ও দলের বাইরে যারা উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়াবে, দলীয় পদ ব্যবহার করে যারা দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের কেউই পার পাবে না। দলের শৃঙ্খলা রক্ষা ও দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা এখন প্রধানমন্ত্রীর সামনে একটাই চ্যালেঞ্জ।

তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ নিয়ে বারবার সতর্কও করেছেন তিনি। কিন্তু আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতার মধ্যে ধরাকে সরা জ্ঞান করার মনোভাব তৈরি হয়। ক্ষমতা ও ব্যক্তিস্বার্থে অন্ধ হয়ে তারা একের পর এক অপকর্ম করে যাচ্ছিল। তৃণমূল পর্যায়ে অনেক জায়গাতেই বর্তমান এমপি ও আগের এমপিদের মধ্যে বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। একে অন্যের বিরুদ্ধে শত্রুর মতো আচরণ করছেন। আর এ সুযোগে দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ঘুষ, দুর্নীতি, নারী কেলেঙ্কারিসহ এমন সব অপকর্মে তারা জড়িত হচ্ছে যে, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছেন তা আগে থেকেই ইঙ্গিত মিলছিল। শনিবার রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় তিনি তার অবস্থান ফের পষ্ট করার সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনের কাছে লাগাম টেনে ধরার বার্তা দিলেন।

শনিবারের সভায় ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর গতকাল আওয়ামী লীগের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা দলীয় প্রধানের বার্তা দলের সবার উদ্দেশে জানিয়ে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বাংলাদেশে এই প্রথম শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো। তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং বাধ্যতামূলক পদত্যাগ করানো হয়েছে। বাংলাদেশের অন্য কোনো ছাত্রসংগঠনে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের নজির নেই।

সংগঠনের নেতাকর্মী ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, ‘অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে। সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। যে অন্যায় করবে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

এর আগে, শনিবার রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভা ও এর আগে দলের মনোনয়ন বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনা তার আলোচনায় শুধু ছাত্রলীগের দুই নেতার অপকর্ম ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের আচরণ, কর্মকা- নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কাউকে কাউকে ইঙ্গিত করেও কথা বলেছেন।

সূত্র জানায়, দুর্নীতি ও নানা অপকর্মের দায়ে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার পর যুবলীগের কিছু নেতার কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ছাত্রলীগের পদচ্যুত শোভন ও রাব্বানীর সঙ্গে তুলনা করে যুবলীগের কিছু নেতার উদ্দেশে বলেন, ‘এরা আরও খারাপ’।
সূত্র জানায়, যুবলীগ প্রসঙ্গে আলোচনার অবতারণা করেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির নানক। বৈঠকের এজেন্ডায় উল্লেখ থাকা শেখ হাসিনার জন্মদিন পালনের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, দল সাড়ম্বরে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার জন্মদিন পালন করতে চায়। কিন্তু শেখ হাসিনা ঘটা করে জন্মদিন পালনে অনীহা দেখালে নানক উদাহরণ হিসেবে যুবলীগের শেখ হাসিনার জন্মদিন পালন উপলক্ষে মাসব্যাপী কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন। একপর্যায়ে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও এ কথা উল্লেখ করে জানান, শনিবার যুবলীগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং আলোচনা সভা করেছে। তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চাঁদাবাজির টাকা বৈধ করতে মিলাদ মাহফিল করা হয়েছে। নিজের জন্য এমন মিলাদ মাহফিল তিনি চান না। এরপর যুবলীগ নিয়ে তার কাছে আসা নানা অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুবলীগের ঢাকা মহানগরের একজন নেতা ক্রসফায়ার থেকে বেঁচে গেছেন। আরেকজন এখন দিনের বেলায় প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে চলেন। সদলবলে অস্ত্র নিয়ে ঘোরেন। এসব বন্ধ করতে হবে। যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে তখন কেউ অস্ত্র নিয়ে বের হয়নি, অস্ত্র উঁচিয়ে প্রতিবাদ করেনি। যখন দলের দুঃসময় ছিল তখন কেউ অস্ত্র নিয়ে দলের পক্ষে অবস্থান নেয়নি। এখন টানা তিন বার সরকারে আছি। অনেকের অনেক কিছু হয়েছে। কিন্তু আমার সেই দুর্দিনের কর্মীদের অবস্থা একই আছে। যারা অস্ত্রবাজি করেন, যারা ক্যাডার পোষেন, তারা সাবধান হয়ে যান, এসব বন্ধ করুন। তা না হলে, যেভাবে জঙ্গি দমন করা হয়েছে, একইভাবে তাদেরও দমন করা হবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম মনে করেন, এ ঘটনা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর জন্য একটা সতর্কবার্তা। তিনি এ থেকে সকল পর্যায়ের নেতা–কর্মীদের সতর্ক হওয়ার আহ্বানও জানান। গণমাধ্যমকে আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, রেজওয়ানুল-রাব্বানীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেউই অপরাধ করে ছাড় পাবেন না, এটাই দলীয় প্রধান বলে দিয়েছেন। ফলে সবাইকে সতর্ক হতে হবে। কোনো অপকর্মে জড়ানো দলের নেতাকর্মীদের উচিত হবে না।

শুধু দুর্নীতি, সন্ত্রাস নয়, দলের মধ্যে যে শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনা ঘটছে তা নিয়েও কেন্দ্রীয় নেতাদের সতর্ক করেছেন আওয়ামী লীগ প্রধান। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন তিনি। তৃণমূলে নেতাকর্মীদের মধ্যে যে বিরোধ তাতে কেন্দ্রীয় নেতারা দায়ী বলে মনে করেন তিনি। তৃণমূলে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য নিজেদের পছন্দমতো লোকদের নিয়ে কমিটি যেন না করা হয় সে ব্যাপারে সতর্ক করেন তিনি। আগামী ২০-২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন ঘোষণা করেন তিনি। এর আগেই ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার সবগুলোতেই স্বচ্ছতার মাধ্যমে সম্মেলন অনুষ্ঠানের কথা বলেছেন তিনি। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ভোটে নেতা নির্বাচনের বার্তা দিয়েছেন তিনি। জেলা পর্যায়ের এসব সম্মেলনে মন্ত্রী, এমপি বা কেন্দ্রীয় নেতা কারো হস্তক্ষেপ যাতে না থাকে সে ব্যাপারে সতর্ক করেন।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী নেতাদের অভিমত, আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হবে। ওই কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্বে অপেক্ষাকৃত সৎ নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হবে। যারা বিভিন্ন অপকর্ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত এবং উপজেলা নির্বাচনসহ নানা সময়ে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সঙ্গে যুক্ত তাদের চেয়ে যাদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি আছে, এমন নেতাদের গুরুত্ব দেওয়া হবে। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের বেশকিছু শীর্ষ নেতার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ, তা বোঝাই যায়। শোভন-রাব্বানীর শাস্তি পুরো দলের জন্যই একটা কড়া বার্তা।