রুপালি ইলিশে সোনালি সম্ভাবনা

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

রুপালি ইলিশে সোনালি সম্ভাবনা

কুন্তল দে ১০:৫৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯

print
রুপালি ইলিশে সোনালি সম্ভাবনা

বাঙালির ঐতিহ্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে রুপালি ইলিশ। পুষ্টি ও স্বাদে অনন্য ইলিশ মাছ সবারই প্রিয়। জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশের জাতীয় এ মাছ। বছরে দুইবার ইলিশ মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা, কারেন্ট জাল নিষিদ্ধ করাসহ নানা উদ্যোগের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের উৎপাদন বেড়েই চলেছে। গত বছর ইলিশ আহরণ ৫ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এ বছরও এ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইলিশের ওপর বৈজ্ঞানিক গবেষণা বাড়ানো, নদী দখল ও দূষণমুক্ত করা গেলে রুপালি ইলিশের উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খাদ্য উপাদান ও খাদ্যমানে সমৃদ্ধ ইলিশের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বিশ্ববাজারে। ইলিশ মাছের উৎপাদন বাড়ানো গেলে দেশের ১৬ কোটি মানুষের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর পরও বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।

বিশ্বে প্রতি বছর যে পরিমাণ ইলিশ আহরণ করা হয় তার ৭০ ভাগই বাংলাদেশে। দেশে তিন ধরনের ইলিশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুটি প্রজাতি (চান্দনা ও গোর্তা) সামুদ্রিক। ইলিশের অন্য যে প্রজাতি লোনা ও মিঠা পানিতে বিচরণ করে, সেটার চাহিদাই সিংহভাগ। এ প্রজাতির ইলিশ প্রজনন ও ডিম পাড়ার জন্যই স্রোতের বিপরীতে অভিপ্রয়াণ করে। একটা ইলিশ এভাবে দৈনিক প্রায় ৭০ কিলোমিটার জলপথ পাড়ি দিতে পারে। ডিম দিয়ে আবার ফিরে যায় সাগরে। এক সময় ইলিশের মৌসুমে বাংলাদেশের প্রায় সব নদ-নদীতে মিলত এ মাছ। কিন্তু দশকের পর দশক ধরে দখল ও দূষণের ফলে ইলিশের বেশিরভাগ বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া পরিবেশ বিপর্যয়, নির্বিচারে জাটকা নিধন ও অধিকমাত্রায় ডিমওয়ালা ইলিশ আহরণের ফলে ইলিশের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়। ফলে বাঙালির প্রিয় ইলিশ মাছ দুর্লভ হয়ে ওঠে।

বিগত কয়েক বছরে সরকারের নানামুখি উদ্যোগের কারণে ইলিশের উৎপাদন ফের বাড়তে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, ইলিশ রক্ষার জন্য সরকার গবেষণা কার্যক্রম ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমে জোর দিয়েছে। ইলিশ মাছের ৫টি অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, ইলিশের প্রজননক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ, প্রজননকাল নির্ধারণ, জাটকা ধরা নিষিদ্ধকরণ, ডিমওয়ালা ইলিশ রক্ষা কার্যক্রম, ইলিশ জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগ গ্রহণ ও খাদ্য সহায়তা প্রদানসহ নানা কার্যক্রম নিয়েছে। বছরে দুইবার ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে মে-জুলাই মাসে ৬৫ দিন আর অক্টোবর মাসে ২২ দিন। মে-জুলাই মাসের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে যাতে ইলিশ সাগর থেকে নির্বিঘ্নে নদীতে এসে ডিম ছাড়তে পারে। আর অক্টোবর মাসের নিষেধাজ্ঞার কারণ হচ্ছে যাতে মাছগুলো সমুদ্রে যেতে পারে। ধারাবাহিক এসব উদ্যোগের ফলে ইলিশ সংরক্ষণের পাশাপাশি উৎপাদন দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে ইলিশ মাছের মোট উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার মেট্রিক টন। এর আর্থিক মূল্য ছিল ৭ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা (৪০০ টাকা কেজি ধরে)। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন। আর্থিক মূল্যে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা (৪০০ টাকা কেজি ধরে)। ২০১৮-১৯ সালে ইলিশের উৎপাদন বেড়ে ৫ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যায়। গত বছরে বার্ষিক জাতীয় আয়ে ইলিশ যুক্ত করেছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা (৫০০ টাকা কেজি ধরে)। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশ মাছের অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। বিগত ৮ বছরে বৃদ্ধির হার প্রায় ৩০ শতাংশ। জিডিপিতেও ইলিশের অবদান প্রায় ১ শতাংশ।

নদী দখল ও দূষণমুক্তের নানা পদক্ষেপ নেওয়ায় গত কয়েক বছরে ইলিশের আহরণের ব্যাপ্তিও বেড়েছে। বর্তমানে পদ্মার শাখা নদী মহানন্দা থেকে শুরু করে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেদির হাওরেও গত বছর ইলিশের দেখা মিলেছে। ১০ বছর আগে যেখানে দেশের মাত্র ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত, সেখানে বর্তমানে ১২৫টি উপজেলার জেলেরা ইলিশ আহরণ করছেন।

দেশের কর্মসংস্থানে ইলিশের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। ইলিশ মাছ ধরা, বিপণন, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি ও জাল-নৌকা তৈরিতে সার্বিকভাবে ৩০ লাখ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

ইলিশ মাছের খাদ্য উপাদান ও পুষ্টিমান অত্যন্ত উচ্চ। ১০০ গ্রাম ইলিশ মাছে ৩০০ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়, যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক চাহিদার ৭ ভাগের একভাগ। এ মাছে উচ্চমাত্রায় আমিষ, চর্বি ও খনিজ পদার্থ পাওয়া যায়। ইলিশ মাছের চর্বিতে প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড থাকে। ওই অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের প্রায় ২ শতাংশ ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, যা মানুষের দেহের রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করে হৃদরোগ উপশম করে। ইলিশ মাছের আমিষে ৯ ধরনের অ্যামাইনো এসিড পাওয়া যায়, যা মানুষের পাকস্থলি উৎপাদন করতে পারে না। এছাড়া ইলিশ মাছে রয়েছে উচ্চ পরিমাণ ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও লৌহ। এ সব পুষ্টি উপকরণের কারণে এ মাছ দেশের মানুষের পুষ্টি ঘাটতি মেটাতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে পারে। সেইসঙ্গে ইলিশ মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বিশ^বাজারে।
ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ায় ২০১২ সাল থেকে এ মাছের রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এরপরও বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৫,০০০-১০,০০০ মেট্রিক টন ইলিশ মাছ বরফ দিয়ে ভারতে রপ্তানি হচ্ছে। হিমায়িত মাছ হিসেবে ৩০,০০০-৪০,০০০ মেট্রিক টন ইলিশ মাছ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ- যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপের অন্যান্য দেশ, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়ায় রপ্তানি করা হচ্ছে। ইলিশ ও ইলিশের ডিম রপ্তানি থেকে বর্তমানে ২০০ কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশ নিয়ে আরও ব্যাপক গবেষণা করা গেলে এবং দেশের নদ-নদীগুলো দখল ও দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে স্বাভাবিক নাব্য ফিরিয়ে আনা গেলে রুপালি এ মাছের বিদেশ থেকে সোনালি অর্থ আনার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যাবে।

ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিছুর রহমান মনে করেন, ইলিশের রপ্তানি আয় বাড়ার বহু সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে কৌটাজাতকরণের মাধ্যমে ইলিশ রপ্তানি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, নদী কেন্দ্রে, পরীক্ষামূলকভাবে উচ্চচাপ এবং তাপ প্রয়োগে এ মাছকে কাঁটামুক্ত করে সফলভাবে কৌটাজাত করা হয়েছে। এ ছাড়া মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোতে ইলিশ মাছের লবণাক্ত ডিমের ব্যাপক চাহিদা এবং উচ্চ বাজারমূল্য রয়েছে (প্রতি কেজি ৭০-৮০ মার্কিন ডলার)। ইলিশের লবণাক্ত ডিম রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

ইলিশ গবেষকরা জানান, সাগরের ইলিশ মাছ পুকুরে চাষের গবেষণা বহুদিন ধরেই বাংলাদেশে চলছে। দেশের মৎস্য বিজ্ঞানীরা এটা অনেকদূর এগিয়ে নিয়েছেন। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার খেপুপাড়ায় নদী উপকেন্দ্রের বদ্ধ পানিতে ইলিশ চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গবেষণার জন্য সাগরের মোহনা থেকে জাটকা ইলিশ পোনা সংগ্রহ করে পুকুরে ছাড়া হয়। এতে সাফল্য আসলে ইলিশে বিপ্লব ঘটবে বাংলাদেশে। এর ফলে জাতীয় মাছ ইলিশ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে। আবার রপ্তানি আয়েরও বড় সম্ভাবনা দেখা দেবে।