এ কেমন অন্ধকার

ঢাকা, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

এ কেমন অন্ধকার

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৩৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯

print
এ কেমন অন্ধকার

পাবনায় পুলিশের উদ্যোগে থানার ভেতরে ধর্ষকের সঙ্গে নারীর বিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থাসহ সার্বিক পদক্ষেপে নজর রাখছেন হাইকোর্ট। এর আগে, খুলনায় তিন সন্তানের জননীকে জিআরপি থানা পুলিশ আটক করে গণধর্ষণের ঘটনায় মামলা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধে পুলিশের সম্পৃক্ততার যেসব অভিযোগ উঠছে তাতে রীতিমতো শঙ্কিত নাগরিক ও মানবাধিকার কর্মীরা। তাদের ভাষ্য, আইনের রক্ষক হয়ে যেখানে সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানো প্রয়োজন সেখানে কিছু পুলিশ ঠিক উল্টো অপরাধের সঙ্গেই জড়িয়ে পড়ছে। এ ধরনের অপরাধকে ‘অন্ধকার’ বলে মনে করছেন তারা।

পাবনার ভুক্তভোগী গৃহবধূর করা লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নের সাহাপুর যশোদল গ্রামে স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন ওই গৃহবধূ। ২৯ আগস্ট রাতে একই গ্রামের আকবর আলীর ছেলে রাসেল আহমেদ চার সহযোগীকে নিয়ে ওই গৃহবধূকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে সদর উপজেলার টেবুনিয়া খাদ্যগুদামের পেছনে দাপুনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ঘন্টুর অফিসে চারদিন আটকে রেখে পালাক্রমে ধর্ষণ করে পাঁচজন। সেখান থেকে কৌশলে পালিয়ে স্বজনদের বিষয়টি জানালে গত ৫ সেপ্টেম্বর গৃহবধূকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

পরে গৃহবধূ বাদী হয়ে পাবনা সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে ধর্ষকদের একজন রাসেলকে আটক করে পুলিশ। তবে বিষয়টি মামলা হিসেবে এজাহারভুক্ত না করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যস্থতায় স্বামীকে তালাক দিয়ে ধর্ষক রাসেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে ঘটনার নিষ্পত্তির করেন ওসি ওবাইদুল হক। এরই মধ্যে ডাক্তারি পরীক্ষায় গৃহবধূকে গণধর্ষণের আলামত মিলেছে। পুরো ঘটনাটি গতকাল হাইকোর্টের নজরে এনেছেন অ্যাডভোকেট জামিউল হক ফয়সাল নামে একজন আইনজীবী। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চে বিষয়টি নজরে আনা হয়। আইনজীবী জামিউল হক আদালতের কাছে বলেন, থানায় বসে গণধর্ষণের শিকার নারীর সঙ্গে ধর্ষণের মূল হোতার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন ওসি। আদালত বলেন, টিভিতে দেখলাম মূল অভিযুক্ত ব্যক্তি আটক হয়েছেন। ওসিকেও শোকজ করা হয়েছে।

তখন আইনজীবী বলেন, পত্রিকায় দেখেছি ভিকটিম ও কাজীকে ওসির লোকজন ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। তাতে তদন্ত ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে। আদালত বলেন, আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। আগে দেখি প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেয়। যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে আগামী সপ্তাহে বিষয়টি আদালতের নজরে আনতে আইনজীবীকে বলা হয়।

এদিকে কিছুদিন আগে খুলনা জিআরপি থানা পুলিশ তিনসন্তানের জননীকে চোর সন্দেহে আটক করে। পরে থানার মধ্যে আটকে রেখে ওসিসহ একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ওই নারীকে ধর্ষণ করে। নির্যাতিতা নারী জবানবন্দি ও এজাহারে উল্লেখ করেন, পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন জিআরপি খুলনা থানার অফিসার ইনচার্জ নিজে তল্লাশির নামে তার যৌনাঙ্গের ভেতর আঙ্গুল প্রবেশ এবং এর কিছুক্ষণ পর ডিউটি অফিসারের সহায়তায় তার ওপর ব্যাপক শারীরিক নির্যাতন করেন। পরবর্তীতে রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে একই ডিউটি অফিসারের সহযোগিতায় তাকে চোখ বেঁধে অন্য একটি রুমে নিয়ে গিয়ে মুখে কাপড় বেঁধে অফিসার ইনচার্জ নিজে তিনবার, ডিউটি অফিসার একবার ও বাকি তিনজন পুলিশ সদস্য সর্বমোট পাঁচজন মিলে পালাক্রমে অসংখ্যবার ধর্ষণ করে। এ বিষয়টি কাউকে বললে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি প্রদান করেন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো দাবি করেছে, আটকদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য নানাভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। জেনেভাভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন অ্যাগেইন্সট টর্চার (ওএমসিটি) ও বাংলাদেশভিত্তিক সংগঠন অধিকার যৌথভাবে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৩০০টি কেসের পর্যালোচনার ভিত্তিতে ‘সাইকেল অফ ফিয়ার’ বা ভয়ের চক্র শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। নির্যাতনের শিকার অভিযুক্ত, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের সদস্যরা এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আটকদের ওপর ‘চূড়ান্ত মাত্রার শারীরিক নির্যাতন’ করা হয়। নির্যাতনের মধ্যে ধর্ষণও রয়েছে। তবে সরকার এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে।

মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বুধবার খোলা কাগজকে বলেন, পাবনার ঘটনাটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। থানায় ধর্ষিতাকে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়াটা একটি ন্যক্কারজনক ঘটনা। কিভাবে থানায় বসে ধর্ষকের সঙ্গে ধার্ষিতাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা তা খতিয়ে দেখবে বলে আমি আশা করি। এবং যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক সেটাই এখন দেখতে চাই। একজন নারী তার স্বামী আছে, সন্তান আছে তাকে কিভাবে ধর্ষিতার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হলো? ওই নারীর সঙ্গে পুলিশ অন্যায় করেছে। জড়িত পুলিশ সদস্যদের শাস্তি হওয়া দরকার।