বিদেশ সিনড্রোম

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

বিদেশ সিনড্রোম

সুলতান মাহমুদ ১০:৪৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

print
বিদেশ সিনড্রোম

সরকারি টাকায় বিদেশ ভ্রমণের হিড়িক চলছে। শুধু মন্ত্রী-সচিবই নন, সরকারি ও প্রকল্পের টাকায় বিদেশ যাচ্ছেন প্রকল্প পরিচালক, মন্ত্রীদের পিএস, এপিএস এমনকি পিও পর্যন্ত। কেউ যাচ্ছেন মশা মারার কৌশল শেখার জন্য, কেউ যাচ্ছেন নিরাপদ পানির অভাবে কলেরায় আক্রান্ত দেশ উগান্ডায় প্রশিক্ষণের জন্য, কেউ যাচ্ছেন পুকুর খননের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। যারা বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছেন তাদের বেশির ভাগই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দফতরের প্রভাবশালী কর্মকর্তা। কোনো বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য সংশ্লিষ্ট লোক যাওয়ার নিয়ম থাকলেও প্রশাসনিক পদে ক্ষমতাশালী কর্মকর্তরাই প্রভাব খাটিয়ে বেশি বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছেন। সবার মধ্যে এক ধরনের বিদেশ সিনড্রোম কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

তারা বলছেন, মন্ত্রী-সচিবদের ম্যানেজ করে কিছু কর্মকর্তা বার বার বিদেশ যাচ্ছেন। অথচ সংশ্লিষ্ট কাজে বিদেশ যাওয়ার জন্য তারা সঠিক ব্যক্তি নয়, কিন্তু প্রভাব খাটিয়ে তারা এ কাজটি করছেন। এতে বঞ্চিতদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে, আর সংশ্লিষ্ট উদ্দেশ্যও সঠিকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে না।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সরকার যেসব প্রকল্প নেয় সেগুলো মনিটরিং করা হয় মন্ত্রণালয় থেকে। মনিটরিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে খুশি করার জন্য অনেক সময় প্রকল্প পরিচালকরা ওইসব কর্মকর্তাকে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ করে দেওয়া হয়। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরও সরকারি টাকায় বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগ রয়েছে।

অনেক দিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে উগান্ডার নাম ধরে ট্রল চলেছে। এবার সত্যি সত্যি সেই উগান্ডার বাস্তবতা ধরা দিল আমাদের কাছে। চট্টগ্রাম ওয়াসা ২৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ‘প্রশিক্ষণের’ জন্য পূর্ব-মধ্য আফ্রিকার এই দরিদ্র দেশে পাঠিয়েছে। তাদের সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের আরও ১৪ জন কর্মকর্তাও দেশটি ভ্রমণ করেন। সব খরচ বহন করার পাশাপাশি প্রায় দুই লাখ টাকা করে ‘পকেটমানিও’ দেওয়া হয় তাদের। সত্যিটা হলো, উগান্ডার বেশির ভাগ মানুষ নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত। সেখানে উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধারও অভাব। কিন্তু চট্টগ্রাম ওয়াসা সেখানেই শিক্ষা সফরে পাঠিয়েছে তার কর্মকর্তাদের, সঙ্গে গেছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও। আফ্রিকার দেশ উগান্ডায় বিশুদ্ধ পানির অভাবে সম্প্রতি কলেরার প্রকোপ দেখা দেওয়া দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে মানবিক সহায়তা সংস্থা রিফিল ওয়েব এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ৫টি জেলায় কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। গত তিন মাসে অন্তত ২৪১ জনের মধ্যে কলেরা রোগ ধরা পড়েছে এবং অন্তত ২ জন মারা গেছেন। এমতাবস্থায় আক্রান্ত জেলার মানুষদের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে সরকারি কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

মশা মারার কৌশল শেখার জন্য কোনো বিশেষজ্ঞকে না পাঠিয়ে মশক নিবারণ দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (উপসচিব) নিজেই বিদেশ সফরে গেছেন বলে অভিযোগ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। শুধু তিনিই নন, মশা মারার টাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রায় ১২ জন কর্মকর্তা গত চার বছরে বিদেশ সফর করেছেন বলে অভিযোগ এসেছে কমিশনের কাছে। এসব অভিযোগ পেয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালও জানিয়েছেন, মশাকে আকৃষ্ট করে মারা শিখতে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা কয়েকটি দেশ সফর করেছেন। তারা পরবর্তী সময়ে সিঙ্গাপুর যাবেন।

পুকুর খনন করা শিখতেও সরকারি কর্মকর্তারা বিদেশ যাচ্ছেন। বরেন্দ্র অঞ্চলে বহু আগে থেকে যে পুকুরগুলো স্থানীয় লোকজন সেচের কাজে ব্যবহার করতেন, সেই পুকুরগুলো পুনঃখনন করা হবে। সেগুলোর পানি আবার সেচের কাজে ব্যবহার করা হবে। এ জন্য বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ‘পুকুর পুনঃখনন ও ভূ-উপরিস্থ পানি উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষুদ্র সেচে ব্যবহার’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এ কাজে দক্ষতা লাভের জন্য এই প্রকল্পের ১৬ জন কর্মকর্তা বিদেশ সফর করবেন। এ জন্য ব্যয় হবে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রকল্পের ১৬ কর্মকর্তা অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডসসহ যেকোনো একটি দেশ সফর করবেন। প্রথম পর্যায়ে আটজন ও পরবর্তী পর্যায়ে আট কর্মকর্তা এই সফরে যাবেন। এর মধ্যে অর্ধেক থাকবেন মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। এছাড়াও সেতু বিভাগের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ গত ডিসেম্বরে অবসরে গেছেন। কিন্তু এরপরও তিনি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুবারে তিনটি দেশ ভ্রমণ করেছেন। সেতু ভবনের ষষ্ঠ তলার একটি কক্ষে নিয়মিত অফিস করেছেন। কখনো কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের, কখনো পদ্মা সেতু প্রকল্পের দামি গাড়ি ব্যবহার করেছেন। কোন আইনে কবির আহমেদ সরকারি অর্থে বিদেশ ভ্রমণ ও গাড়ি-অফিস ব্যবহার করেছেন, তার কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি। মেয়রদের অনর্থক বিদেশ ভ্রমণে দেখে বিরক্ত হয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন- যেসব পৌরসভায় এক মাস বা তার বেশি সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা বকেয়া রয়েছে এমন পৌর মেয়র, সচিব বা সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিদেশ ভ্রমণ স্থগিত ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রদান করবে না স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে সারাদেশে দশ মাস বা তারও বেশি সময় বেতন-ভাতা বকেয়া রয়েছে এমন ৫৯ পৌরসভার বিগত ৫ বছরের সকল প্রকার আয়-ব্যয়, উন্নয়নসহ সার্বিক কার্যক্রম যাচাই করতে এ সম্পর্কিত সকল তথ্য অতিদ্রুত প্রদান করতে চিঠি দিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।