নীরবে চলে গেল বিশ্ব মশা দিবস

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯ | ৭ কার্তিক ১৪২৬

নীরবে চলে গেল বিশ্ব মশা দিবস

সুলতান মাহমুদ ১০:২১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২১, ২০১৯

print
নীরবে চলে গেল বিশ্ব মশা দিবস

মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ গত দুই মাসে বাংলাদেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মশার বিষয়ে সচেতন হওয়ার জন্য পৃথিবীর অনেক দেশ ‘বিশ্ব মশা দিবস’ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করলেও বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে পালন করা হয়নি দিবসটি। গত মঙ্গলবার অনেকটা নীরবে চলে গেছে দিনটি।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিবসটি ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে পালন করা হলে ভালো হতো। তারা বলছেন, মশা যেহেতু এখন একটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে, তাই মানুষের কাছে মশার ক্ষতিকারক দিক তুলে ধরে এবং এ থেকে বাঁচার দিকনির্দেশনা দিয়ে দিবসটি ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে পালন করলে ভালো হতো। আগামী দিনগুলোতে দিবসটিকে অবহেলা না করে, এটিকে সরকারের গুরুত্বসহকারে পালন করা উচিত।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে ডেঙ্গু। এই ডেঙ্গুর বাহক হচ্ছে এডিস মশা। মশার কামড়ে শুধু যে ডেঙ্গু জ্বর হয়, তা নয়। বিভিন্ন ধরনের মশা বিভিন্ন ধরনের ভয়ঙ্কর রোগের জীবাণু বহন করে। মানুষকে কামড় দেওয়ার মধ্য দিয়ে যা ছড়িয়ে পড়ে। ভয়ঙ্কর এসব রোগের মধ্যে এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু ছাড়াও চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া হতে পারে। কিউলেক্স মশার কামড়ে ফাইলেরিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ক্ষুদ্র প্রাণী মশা এমন ভয়ঙ্কর রোগের জীবাণু বহন করায় পৃথিবীব্যাপী মশাকে গুরুত্বসহকারে দেখা হয়। বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে দিবসটি পালন করা উচিত ছিল, কিন্তু পালন করা হয়নি। অনেকটা নীরবে দিনটি চলে গেছে। যদিও চট্টগ্রামে সীমিত পরিসরে কিছুটা পালন করা হয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মশার প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ছড়ায় স্ত্রী এডিস মশা। আর ম্যালেরিয়া ছড়ায় স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা। ব্রিটিশ চিকিৎসক স্যার রোনাল্ড রস ১৮৯৭ সালে আবিষ্কার করেন, স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে ম্যালেরিয়া ছড়ায়। তার এই আবিষ্কারকে স্মরণ করতে ওই ঘটনার কিছু দিন পর থেকেই ২০ আগস্ট বিশ্ব মশা দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হতো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ দেশে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ কমে যাওয়ায় দিবসটি আর সেভাবে পালন করা হয় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, মশা হলো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাণী। জীবাণু বহন ও তা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা থাকায় মশার কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর লাখো মানুষের মৃত্যু হয়। ২০১৫ সালে শুধু ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণ গেছে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের। ডব্লিউএইচওর তথ্যমতে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি এমন সব এলাকায় বাস করে, যেখানে মশার উপস্থিতি রয়েছে।

এ ছাড়া জিকা, চিকুনগুনিয়া ও ইয়েলো ফিভারের মতো রোগের প্রাদুর্ভাবও ঘটছে এডিস মশার কারণে। ডব্লিউএইচও বলেছে, গত ৩০ বছরে বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে ৩০ গুণ। এ ছাড়া জিকা, চিকুনগুনিয়া ও ইয়েলো ফিভারের প্রাদুর্ভাবও বেড়েছে।

ডব্লিউএইচও বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনসহ পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভ্রমণের কারণে দিনে দিনে মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। এসব বিষয় সামনে রেখেই গত মঙ্গলবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশ্ব মশা দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে এটি পালন না করা হলেও চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের উদ্যোগে শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

জানা গেছে, বাংলাদেশে ২৯ প্রজাতির মশা থাকলেও এখন পর্যন্ত ম্যালেরিয়া (পার্বত্য অঞ্চল), ফাইলেরিয়া (উত্তর বঙ্গ) এবং ডেঙ্গু এ বছর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ৪৭ জন মারা গেছেন। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে মারা গেছেন দেড় শতাধিক। আর চলতি বছর আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৮ হাজারের মতো মানুষ। স্বাভাবিকভাবে এ বছর বাংলাদেশে এডিস মশার দ্বারা ছড়ানো ডেঙ্গু আতঙ্ক মানুষের মাঝে বিরাজ করছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্বের অধ্যাপক ও মশা গবেষক কবিরুল বাশার খোলা কাগজকে বলেন, দিবসটি গুরুত্বসহকারে পালন করা উচিত ছিল। তিনি বলেন, দিবসগুলো তৈরি হয় মানুষকে সচেতন করার জন্য। অনেক দিবস আছে যা গুরুত্বসহকারে পালন করা হয়, কিন্তু এ দিবসটিকে কোনো বছরই গুরুত্বসহকারে পালন করা হয় না। উচিত ছিল এটা পালন করা এবং প্রতি বছরই গুরুত্বসহকারে পালন করা। আমি আশা করব সরকার আগামী বছরগুলোয় দিবসটি জোরেশোরে পালন করবে।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ডিন ও চিকিৎসা বিজ্ঞানী অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, দিবসটি ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালন করা উচিত ছিল। যেহেতু মশা এখন জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই দিবসটি ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে পালন করা উচিত। যাতে মানুষ জানতে পারে কোন কোন মশার কামড়ে কি কি ধরনের রোগ হয়। মানুষ কীভাবে মশার কামড় থেকে এড়িয়ে চলতে পারে এবং রোগবালাই থেকে মুক্ত থাকতে পারে।