শুরুতে প্রস্তুত সরকার ও ইউএনএইচসিআর

ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৩১ ভাদ্র ১৪২৬

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

শুরুতে প্রস্তুত সরকার ও ইউএনএইচসিআর

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:২০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০১৯

print
শুরুতে প্রস্তুত সরকার ও ইউএনএইচসিআর

প্রথম পর্যায়ে প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার ১ হাজার ৩৮ পরিবার থেকে ৩ হাজার ৯৯৯ জন রোহিঙ্গা সদস্যের তালিকা চূড়ান্ত করেছে। এদিকে আগামী ২২ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা ইউএনএইচসিআর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) দফতর ও জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ প্রস্তুতির সব বিষয় খতিয়ে দেখছেন বলে জানিয়েছেন এ কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট এক সরকারি কর্মকর্তা। এদিকে ফেরত নিতে মিয়ানমার যে তালিকা চূড়ান্ত করেছে ইউএনএইচসিআর গতকাল মঙ্গলবার থেকে তাদের সাক্ষাৎকার পর্ব শুরু করেছে। রোহিঙ্গারা রাখাইনে স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে চায় কি না, সাক্ষাৎকারে জানতে চাওয়া হচ্ছে।

এর আগে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা সদস্য বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সম্মত হয় মিয়ানমার। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর মিয়ানমারের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ।

পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ১৬ মে ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ নামে আরও একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। ওই চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরুর দুই বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার প্রত্যাশা করা হয়েছিল।

চুক্তি অনুযায়ী গত বছরের ১৫ নভম্বর প্রথম পর্যায়ে রোহিঙ্গাদের মাতৃভূমি রাখাইনে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ‘রাখাইনে উপযুক্ত পরিবেশ নেই’ বলে রোহিঙ্গাদের অনিচ্ছার কারণে তা থেমে যায়।

সাক্ষাৎকার দিতে আসেননি প্রত্যাবাসনের তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গারা
মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার বিষয়ে মতামত জানানোর কথা ছিল তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের। কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার কক্সবাজারের টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে নির্ধারিত স্থানে সাক্ষাৎকার দিতে আসেননি প্রত্যাবাসনের তালিকাভুক্ত কোনো রোহিঙ্গা।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, দুপুর দেড়টা পর্যন্ত কেউ সেখানে আসেননি। তবে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা তাদের সাক্ষাৎকার দিতে আসার জন্য উৎসাহিত করে যাচ্ছেন।
টেকনাফের জাদিমোরা শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ মোহাম্মদ খালেদ হোসেন বলেন, ‘প্রত্যাবাসনের তালিকায় নাম থাকা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের সাক্ষাৎকার দিতে আসার জন্য বলা হয়েছে। তবে কেউ সাক্ষাৎকার দিতে আসেননি।

এদিকে সাক্ষাৎকার ঘিরে শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর দেখা গেছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোহিঙ্গা বলেন, ‘সকালে ইউএনএইচসিআর ও ক্যাম্প ইনচার্জের প্রতিনিধিরা ঘরে এসেছেন। তারা বলেছেন তালিকায় আমার পরিবারের নাম রয়েছে, সাক্ষাৎকার দিতে বিকালে ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য বলেছেন। কিন্তু আমরা মিয়ানমারে ফেরত যাব না। যে দেশ থেকে নির্যাতনের স্বীকার হয়ে এসেছি, সেখানে ফিরে যেতে চাই না। নির্যাতনের বিচার পেলেই কেবল ফিরে যাব।’

২০১৭ সালে আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন শুরু করে দেশটির সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। পুরনো ও নতুন মিলিয়ে এখন উখিয়া- টেকনাফের ৩০টি শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, উখিয়া টেকনাফে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৭। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। জাতিগত নিধন ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়।

৫ দাবি পূরণ হলে মিয়ানমারে ফিরতে রাজি রোহিঙ্গারা
প্রত্যাবাসন আদৌ হবে কি-না বা হলে কবে হবে তা নিয়ে অবিশ্বাস আরও জোরালো হচ্ছে রোহিঙ্গাদের মধ্যে বাংলাদেশে এখন যে এগারো লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে, তার বড় অংশই বাংলাদেশে প্রবেশ করা শুরু করেছিল ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। এরপর জাতিসংঘসহ নানা সংস্থার নানা উদ্যোগের পর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সরকারের আলোচনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি প্রত্যাবাসন শুরুর কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। বরং রোহিঙ্গারা তখন আট দফা দাবি তুলেছিল প্রত্যাবাসনের শর্ত হিসেবে। এর মধ্যে ছিল- নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, বাড়িঘর জমি ফেরত পাবার নিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলো।

এসব দাবি নিয়ে তখন বিক্ষোভ করেছিল আরাকান রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস সোসাইটি নামের একটি সংগঠন। এবার আবারও ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসনের একটি সম্ভাব্য তারিখ মিয়ানমারের তরফ থেকে প্রকাশের পর বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন বিষয়ক কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম জানিয়েছেন, তারাও প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোহিঙ্গাকে ২২ আগস্ট ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কাজ করছেন।

এর আগে বাংলাদেশ যে ২২ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারকে দিয়েছিল তা থেকে সাড়ে তিন হাজারের মতো রোহিঙ্গার নাম প্রত্যাবাসনের জন্য নির্বাচন করে বাংলাদেশকে দিয়েছে মিয়ানমার। তালিকা পাওয়ার পর এসব রোহিঙ্গার মতামত যাচাই করার জন্য জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাকে অনুরোধ করে বাংলাদেশ এবং সংস্থার কর্মীরা মঙ্গলবার ক্যাম্পগুলোতে সে কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের জন্য নির্বাচিত যেখানে রাখা হবে ও যেখান থেকে বিদায় দেওয়া হবে, সেসব স্থানগুলোতে অবকাঠামোগত প্রস্তুতি আগেই নেওয়া শুরু হয়েছে বলে প্রত্যাবাসন বিষয়ক কমিশনার নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, প্রত্যাবাসনের জন্য তাদের সুনির্দিষ্ট দাবি আছে এবং সেগুলো বাস্তবায়ন না হলে প্রত্যাবাসনে কেউ রাজী হবেন না।

এক্ষেত্রে এবার পাঁচটি দাবির একটি তালিকা সংবলিত লিফলেট গত দুদিন ধরে ক্যাম্পগুলোতে প্রচার করছে ‘ভয়েস অফ রোহিঙ্গা’ নামের একটি সংগঠন। লিফলেটে যে পাঁচটি দাবির বাস্তবায়ন চায় রোহিঙ্গারা সেগুলো হলো- ১. রোহিঙ্গারা আরাকানের স্থানীয় আদিবাসী এবং সে জন্য তাদের ন্যাটিভ স্ট্যাটাস বা স্থানীয় মর্যাদা সংসদে আইন করে পুনর্বহাল করতে হবে যার আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি থাকতে হবে। ২. নাগরিকত্ব : প্রথমত, আরাকান রাজ্যে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ‘সিটিজেন কার্ড’ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরও সিটিজেনশিপ কার্ড দিয়ে প্রত্যাবাসন করে স্থানীয় নাগরিক মর্যাদা দিতে হবে।

তৃতীয়ত, একই সঙ্গে বিশে^র অন্যান্য জায়গায় থাকা রোহিঙ্গাদের সিটিজেনশিপ কার্ড দিয়ে স্থানীয় নাগরিক মর্যাদা দিতে হবে। ৩. প্রত্যাবাসন : রোহিঙ্গাদের তাদের নিজস্ব গ্রামে ফিরিয়ে নিতে হবে এবং তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া জমিজমা যথাযথ ক্ষতিপূরণসহ ফেরত দিতে হবে। ৪. নিরাপত্তা : আরাকানে রোহিঙ্গাদের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য রোহিঙ্গা পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করতে হবে। ৫. জবাবদিহিতা বার্মার স্থানীয় আদালতের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির মতো কোনো ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনালে অপরাধীদের বিচার করতে হবে।

কিন্তু এগুলো কি রোহিঙ্গাদের সবার দাবি?
ভয়েস অফ রোহিঙ্গা নামের সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন শমসু আলম। তিনি জানান, তাদের মধ্যে সক্রিয় আরও অন্য সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করেই তারা এসব দাবি চূড়ান্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় সভা করেছি। রোহিঙ্গাদের নিয়ে বসেছি। মতামত নিয়েছি। সবাই এসব দাবি আদায়ে একমত হতে রাজি হয়েছে।’ আলম দাবি করেন, এগুলো প্রত্যাবাসনের জন্য তাদের দাবি এবং ৭৫ ভাগ রোহিঙ্গাই এর সঙ্গে একমত।

তিনি জানান, সব ধরনের বিদেশি ডেলিগেশন কিংবা বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার কাছেও তারা বারবার এসব দাবি তুলে ধরেছেন যাতে করে কার্যকর প্রত্যাবাসন হয় ও রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে নিরাপদে জীবন যাপন করতে পারে।

গতকাল মঙ্গলবার বেলা বারোটার দিকে প্রত্যাবাসনের তালিকায় থাকা রোহিঙ্গাদের মতামত যাচাইয়ের কাজ করছিলেন জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার কর্মীরা। কুতুপালংয়ে ২৬ নম্বর ক্যাম্পে তাদের সঙ্গে ছিলেন রোহিঙ্গাদের একজন নেতা বদরুল আলম। তিনি বলেন, ‘এখানে এগারো লাখ রোহিঙ্গার দেখভাল করতে আমরা ক্যাম্প ভিত্তিক প্রতিনিধি নিয়ে ৫৫ জনের একটি কমিটি করেছি যে কমিটিতে আমিও আছি। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা, ঘর-বাড়ি ভিটা জমি ফেরত দেওয়া ও নিরাপত্তাসহ ৫টি দাবি আমাদেরও।’

তিনি আরও বলেন, এসব দাবি বাস্তবায়ন ছাড়া প্রত্যাবাসনের কাজ সফল হবে না কারণ নাগরিকত্ব ও স্থানীয় হিসেবে মর্যাদা না পেলে রোহিঙ্গারা সেখানে ফিরলে সেই আগের মতোই নির্যাতন নিপীড়নের মুখে পড়তে হবে।

বদরুল আলম বলেন, ‘জাতিসংঘ আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক আর বার্মা সরকার তার অবস্থান পরিষ্কার করুক রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়ে।’