বস্তি পুড়লে কী হয়

ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৩১ ভাদ্র ১৪২৬

বস্তি পুড়লে কী হয়

মনোজ দে ১১:০০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০১৯

print
বস্তি পুড়লে কী হয়

২০১৫ সালের বস্তিশুমারি অনুযায়ী দেশে বস্তিবাসীর সংখ্যা সাড়ে ২২ লাখ। এদের অর্ধেকের বেশি বাস করেন ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাঁচ হাজারের বেশি বস্তিতে। সরকারি জমিতে এসব বস্তি গড়ে উঠলেও সেখানকার ঘরের মালিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যু-গ্যাস-পানি-পয়ঃনিষ্কাশন কিংবা শিক্ষার ন্যূনতম সুবিধা না থাকলেও বস্তির বাসিন্দাদের প্রতি মাসেই গুনতে হয় ভাড়া। মাথা গোঁজার যেটুকু জায়গা এবং অপ্রতুল যে নাগরিক সুবিধা তার বিনিময়ে তাদের যে টাকা গুনতে হয় ঢাকার অনেক বাসিন্দার তুলনায় তা বেশি।

ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত এসব মানুষের জীবন নিরুপদ্রব নয়। কেননা, উচ্ছেদ আর আগুন বস্তিবাসীর পিছু ধাওয়া করে বেড়ায়। নদীভাঙন, জলবায়ুজনিত উদ্বাস্তু এসব ছিন্নমূল মানুষ নগরে রিকশা চালিয়ে, গৃহকর্মীর কাজ করে চার ফুট বাই চার ঘরে নতুন করে যে ঘরকন্না সাজায় নিমিষেই সে স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

সর্বশেষ গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ভয়াবহ আগুনে ছাই হয়ে গেছে মিরপুরের রূপনগরের ঝিলপাড় বস্তির প্রায় আট হাজার ঘর। সাড়ে তিন ঘণ্টায় আগুনের লেলিহান শিখা ৫০ হাজার মানুষকে আশ্রয়হীন করে দেয়। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে ফায়ার সার্ভিস প্রাথমিক তদন্তে তা বলতে না পারলেও বস্তিবাসীর অভিযোগ সেখানে দাহ্য পদার্থ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে আগুন জ্বলে ওঠার কথা বলছেন তারা।

আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় এ অভিযোগ অমূলক নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঈদের ছুটি থাকায় অধিকাংশ বস্তিবাসী ছিলেন গ্রামের বাড়িতে। এ কারণে হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। তালাবন্ধ ঘরেই পুড়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে তেল-নুন-কড়াইয়ের হিসাব থেকে তিলে তিলে টাকা বাঁচিয়ে গড়ে তোলা সম্বলটুকু। ঝিলপাড় বস্তিতে যে ভয়াবহ আগুন এর পেছনে নাশকতা থাকতে পারে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে অভিযোগ করেছেন। ঈদের ছুটিতে আগুন লাগায় তাদের এ সন্দেহ। আবার বর্ষা মৌসুমে আগুনের ঘটনা যেখানে কালেভদ্রে ঘটে সেখানে এত বড় অগ্নিকা- কীভাবে হলো- এ প্রশ্নও করেছেন অনেকে। এসব সন্দেহের পেছনে অবশ্য আগের অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। ঢাকার বস্তি উচ্ছেদে আগুন থেরাপির ব্যবহার অনেক পুরনো।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাক হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ এ দেশের মানুষের ওপর যে পৈশাচিক গণহত্যা চালায় সেই পরিকল্পনার অন্যতম টার্গেট ছিল বস্তিবাসী। চারদিক থেকে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে আর যারা আগুনের হাত থেকে বাঁচতে পালাতে চেয়েছিল তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। বস্তিবাসীদের প্রতি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এই আক্রোশের মূল কারণ ছিল ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের সর্বাত্মক অসহযোগিতা আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল ঢাকার বস্তিবাসী।

বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ হওয়ার বিষয়ে প্রবীণ গবেষক ও শিক্ষক আফসান চৌধুরী তার একটা লেখায় বলেছেন, মহাখালী এলাকায় (কড়াইল) সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বস্তি ও বাসস্থানে আগুন লেগেছে। অনেকে এটাকে বলছে ‘আগুন থেরাপি’ অর্থাৎ গরিব এখন ক্ষত বা রোগের মতো, সেটা সারানোয় আগুন ব্যবহার করা হয়। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের গরিবের সহ্য ক্ষমতা এতই বেশি যে আগুনে ছ্যাঁকা খাওয়ার পরও তারা রয়ে যাচ্ছে। এর ফলে আগুনে কাজ হচ্ছে- এমনটা বলা যায় না। কিন্তু গরিব তাড়িয়ে ঢাকায় সমস্যার সমাধান হবে কি না, সেটা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। বেশ কিছু গবেষণার কাজ চলছে বিত্তহীন মানুষের ওপর যা প্রমাণ করে গরিব ঢাকায় বেশ গেড়ে বসেছে অর্থাৎ তারা ঢাকা আর না-ও ছাড়তে পারে। এই ঢাকা শহর না-ছাড়া গরিবদের নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। কীভাবে তাড়াতে হয় সেটা বড়লোক শ্রেণি এবং প্রশাসন বুঝতে পারছে না। কোনো বা কোনোভাবে তারা টিকেই থাকছে।

আফসান চৌধুরীর যারা বস্তি উচ্ছেদে ‘আগুন থেরাপি’র কথা বলছেন পরিসংখ্যানও কিন্তু তাদের যুক্তির পক্ষে। কেননা এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত তিন মাসেই সারা দেশে ২৪টি বস্তি আগুনে পুড়ে যায়। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে শর্ট সার্কিট, বাঁশ-কাঠের লাগোয়া ঘর, প্লাস্টিকের পাইপে অবৈধ গ্যাসের সংযোগ, অসতর্কতা, প্লাস্টিক বা এ জাতীয় দাহ্য পদার্থ- এ সবকিছুই বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ বলে জানাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস। তবে বস্তিবাসীদের নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের অভিযোগ, পরিকল্পিত উচ্ছেদের অংশ হিসেবেই বস্তিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চের সভাপতি মাসুদ খান খোলা কাগজকে বলেন, বস্তিতে আগুন লাগার বিষয়টা সবসময় স্বাভাবিক নয়। অনেক সময়ই দেখা যায়, ঈদ বা বড় কোনো ছুটির সময়ে বস্তিতে আগুন ধরে। এর পেছনে দখল আর উচ্ছেদই বড় কারণ। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এমনটাই ঘটে আসছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানী ঢাকায় বস্তি গড়ে ওঠা ও বস্তি উচ্ছেদের পেছনে একই ধরনের গল্প রয়েছে। পরিত্যক্ত সরকারি জমি বা জলাশয়ে ময়লা ফেলে প্রথমে সেখানে দুই-এক ঘর বসতি গড়ে তোলে স্থানীয়রা। পরে সেখানে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা ও মাস্তানরা এসে দখল নেয়। তারা সেখানে ঘর তুলে ভাড়া দেয়। অবৈধভাবে গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ দেয়। ঘরগুলো থেকে ভাড়া তোলে। অবৈধ গ্যাস-বিদ্যুতের বিল থেকে বড় অঙ্কের টাকা তুলে নেয়।

গত শুক্রবার পুড়ে যাওয়া ঝিলপাড় বস্তিটিও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের জমিতে গড়ে ওঠে। জানা যায়, ১৯৭৩ সালে রূপনগর থানার পেছনের ওই ঝিলের ২০ একর জমি অধিগ্রহণ করে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।

স্থানীয়রা পরে ওই নিচু জমিতে ময়লা ফেলতে শুরু করে। এতে ঝিলটি ভরে যায়। এরপর কাঠের পাটাতন দিয়ে সেখানে ধীরে ধীরে বস্তিঘর গড়ে উঠতে শুরু করে। ২০০০ সালে জমি বস্তিতে ভরে যায়। প্রথমদিকে যারা বস্তিতে ঘর তুলেছিলেন তারা নিজেরা থাকার পাশাপাশি অন্যদের কাছে ঘর ভাড়া দেন। ২০০১ সালের পর স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কিছু নেতাকর্মী বস্তির নিয়ন্ত্রণ নেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নিয়ন্ত্রণ যায় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের হাতে। ঘর ভাড়া ও বিদ্যুৎ-গ্যাস থেকে এ বস্তি হতে মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা আয় হতো। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী এ টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিতেন।

ঝিলপাড় বস্তিতে আগুনের পেছনে জমি খালি করার উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। সর্বস্ব হারানো বস্তিবাসীকে কাছের কয়েকটি স্কুলে আপাতত থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পোড়া জায়গায় আদৌ আবার বস্তি ঘর উঠবে কিনা তা কেউ জানে না। ক্ষতিগ্রস্তদের আশঙ্কা তাদের উচ্ছেদ করা হতে পারে।

এর আগে রাজধানীর কড়াইল বস্তি ও কল্যাণপুরের পোড়া বস্তিতে দফায় দফায় আগুন লাগার পেছনে বস্তিবাসীদের উচ্ছেদের উদ্দেশ্য ছিল বলে নানা সময়ে বাসিন্দারা অভিযোগ তুলেছেন। এ বছরের ৯ মার্চ রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগে। এর আগে ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ বস্তিটিতে আগুন লাগে। ২০১৬ সালের ৪ ডিসেম্বরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় প্রায় পাঁচশর বেশি ঘর।

একই বছরের ১৪ মার্চ আগুনে পোড়ে বস্তির অর্ধশত ঘর। ওই বস্তিটির জমির মূল মালিক বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। তারা আদালতের আদেশ নিয়ে ২০১২ সালে কড়াইলে জমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু করে। প্রথম দিনের অভিযানে ৪০০টি ঘর উচ্ছেদ করা গেলেও দ্বিতীয় দিন হাজার হাজার বস্তিবাসী গুলশান-মহাখালী এলাকার সড়কে নেমে ওই এলাকা কার্যত অচল করে দেয়। পরে আর তাদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। বস্তিবাসীর ধারণা, পরিকল্পিতভাবে বারবার আগুন দেওয়া হয় কড়াইল বস্তিতে।

কল্যাণপুরের পোড়াবাড়ি বস্তিতে ২০১৬ সালের ২৩ জানুয়ারি আগুন লাগে। ওই জমির মালিক হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞায় উচ্ছেদ অভিযানে ব্যর্থ হয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সহায়তায় বস্তির একটি অংশে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। বস্তি উচ্ছেদের ওই আগুনে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যেতেও বাধা দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বস্তিগুলোতে যে ঘন ঘন আগুন লাগছে এসব ঘটনার একটা বড় অংশের পেছনে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র রয়েছে। অনেক বস্তিতেই দেখা যায় পুড়ে যাওয়ার পর সেখানে অন্য কোনো স্থাপনা তৈরি হয়। আবার অনেক জায়গায় অগ্নিকা-ের পর বস্তিতে নতুন ঘর উঠলেও দেখা যায় মালিকানা বদলে যায়। আগের দখলদারদের স্থলে নতুন দখলদার চলে আসে। সরকারের তরফ থেকে বস্তিবাসীদের স্বস্তির আবাসনের জন্য প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে। তবে দিনে দিনে নগরে ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

২০১৪ সালের আগে ১৯৯৭ সালে বস্তিশুমারি করা হয়। সে সময়ে বস্তিবাসীর সংখ্যা ছিল ৭ লাখ। পরের সতের বছরে বস্তিবাসীর সংখ্যা বাড়ে ৩ গুণ। সর্বশেষ শুমারির পর ৫ বছর পেরিয়ে গেছে। এ সময়ে বস্তিবাসীর সংখ্যা কতটা বেড়েছে বা কমেছে তা নিয়ে কোনো পরিসংখ্যান নেই। আবার সরকার রাজধানীর ভাসানটেকে বস্তিবাসীদের জন্য যে ১০ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণ করছে সেগুলো চলে গেছে মধ্যবিত্তদের হাতেই।