যৌনকর্মী পরিচয়ে মামলা হয় না

ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৩১ ভাদ্র ১৪২৬

যৌনকর্মী পরিচয়ে মামলা হয় না

আলো-আঁধারির জীবন ২

ছাইফুল ইসলাম মাছুম ১০:০৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০১৯

print
যৌনকর্মী পরিচয়ে মামলা হয় না

রাজধানীর জনশন রোডে স্থানীয় কয়েকজন বখাটের হাতে গত ২৯ মার্চ নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন ভাসমান যৌনকর্মী নদী (২৫) (ছদ্মনাম)। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। খোলা কাগজকে নদী জানান, বিচারের আশায় কোতোয়ালি থানায় বেশ কয়েকবার গেলেও, পুলিশ পেশাগত পরিচয় জানার পর আর মামলা নেয়নি।

যৌনকর্মীরা এ ধরনের নানা নির্মমতার শিকার হন প্রায়শই। খুনের ঘটনাও ঘটে কখনো-সখনো। উচ্ছেদের ঘটনা তো নৈমিত্তিক। উচ্ছেদের মাধ্যমে স্থানীয় প্রভাবশালীরা জায়গা দখল করে নেয়। এ ছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালীরা মাদক ব্যবসা করে যৌনকর্মীদের নামে চালিয়ে দেয়। শারীরিক নিপীড়ন তো নিয়মিত ঘটনা। জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রশাসনকে জানানোর পরও তারা আইনি সুরক্ষা পান না। উল্টো নানা হয়রানি আর আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হন।

বেসরকারি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভাসমান যৌনকর্মীদের ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অথবা স্থানীয় ক্ষমতাসীনদের মারধরের শিকার হয়েছেন। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ১১ ধারায় দেশের সব মানুষের মানবাধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, যৌনকর্মীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে সচেতন হতে হবে, সেই সঙ্গে সমাজের মূল স্রোতধারার মানুষকেও সচেতন করতে হবে।

যশোর শহরে আলাদা করে পতিতাপল্লী রয়েছে দুটি। একটি বাবুবাজার পতিতাপল্লী অন্যটি মারুয়া মন্দিরে। যশোর মারুয়া মন্দির পতিতাপল্লীর তিন বাড়িতে নিবন্ধিত যৌনকর্মী রয়েছে ৮৫ জন। সেখানে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাসি (সর্দারনি) খোলা কাগজকে জানান, ৩০ বছর ধরে এই পাড়ায় রয়েছেন তিনি।

চোখের সামনে যৌনকর্মীদের ওপর অনেক অত্যাচার-নির্যাতনের ঘটনা দেখেছেন। কখনো সুবিচার পেতে দেখেননি। বরং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও আইনজীবীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুবিধা নিয়েছে, এখনো নিচ্ছে। পুলিশকে প্রতি মাসে মাসোহারা দিতে হয়। নতুন কোনো মেয়ে এলে পুলিশকে ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়। এছাড়া লাইসেন্স করতেও মোটা অংকের টাকা লাগে। পাড়ায় রাতে কোনো খদ্দের থাকলে, খদ্দের প্রতি পুলিশকে দিতে হয় বাড়তি টাকা।

বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) যৌনকর্মীদের আইনি সহায়তা করে থাকে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন খোলা কাগজকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের রায় আছে, যৌনকর্মীরা যাতে নিরাপদভাবে বাঁচতে পারে, সে বিষয়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু তারা নানা ধরনের সামাজিক বৈষ্যমের শিকার হচ্ছে। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তাদের জন্য আইনের সমান সুযোগ থাকা উচিত।’

সেক্স ওয়ার্কার নেটওয়ার্ক-র সভাপতি চুমকি বেগম জানান, যৌনকর্মীরা প্রায়শই মারধরের শিকার হন। পুলিশের কাছে গেলে তারা হয়রানি করেন। অনেক সময় একজনের কথা বলে একাধিক ব্যক্তি সুযোগ নেয়। ভাসমান যৌনকর্মীদের ক্ষেত্রে বাড়ির মালিক পরিচয় জানতে পারলে, যৌন হয়রানির চেষ্টা করেন বা বাড়ি থেকে বের করে দেন।

এ বিষয়ে মানবাধিকার আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া খোলা কাগজকে বলেন, যৌনপেশা আদিমতম পেশা হলেও, সেই অর্থে বাংলাদেশে পেশাটির আইনি স্বীকৃতি নেই। তবে সরকার যখন কিছু যৌনপল্লীর স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হলফনামা (হলফনামাকে অনেকে লাইসেন্স মনে করে) সংগ্রহকারী যৌনকর্মীদের বৈধতা দিয়েছে, তখন সরকারের উচিত তাদের আইনি সুরক্ষাও দেওয়া। তিনি বলেন, যৌনকর্মীরা আইনি সুরক্ষা পাচ্ছে না, তারা সব সময় সামাজিক নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন। এমনকি রাষ্ট্রীয় নিগ্রহের শিকার হয়ে অনেক যৌনপল্লী উচ্ছেদেরও ঘটনা ঘটেছে।

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কিছু আইন, যৌনকর্মীদের আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে। আইন অনুযায়ী, খারাপ মেয়ে (চরিত্রহীন) ধর্ষণের শিকার হলে সেটা ধর্ষণ হবে না। এ ধরনের আইন সংশোধন হওয়া জরুরি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘যৌনকর্মীদের জীবিকার এই যে একটা পথ, এটা করতে গিয়ে তারা পদে পদে লাঞ্ছিত হচ্ছে, উপেক্ষিত হচ্ছে, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।’ তিনি বলেন, রাষ্ট্রের উচিত পিছিয়ে পড়া এই মানুষদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া এবং সমাজের মূল স্রোতধারায় আসতে সহযোগিতা করা।

বাংলাদেশে সরকার অনুমোদিত প্রায় ১১ যৌনপল্লী রয়েছে। আর নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলিয়ে যৌনকর্মী রয়েছেন লক্ষাধিক।