প্রশ্নবিদ্ধ অগ্রগতি

ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯ | ৪ ভাদ্র ১৪২৬

৯ বছরেও ফেরানো যায়নি বঙ্গবন্ধুর ছয় পলাতক খুনি

প্রশ্নবিদ্ধ অগ্রগতি

মনোজ দে ও শফিক হাসান ১০:১৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০১৯

print
প্রশ্নবিদ্ধ অগ্রগতি

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ৩৫ বছর পর ২০১০ সালে কার্যকর করা হয় পাঁচ খুনির মৃত্যুদণ্ড। একজন মারা যাওয়ায় বাকি ছয় আত্মস্বীকৃত খুনিকে বিচার শেষ হওয়ার পর দীর্ঘ নয় বছরেও দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। নানা আইনি জটিলতায় আটকে আছে তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ। এ নিয়ে সরকারের তরফ থেকে নানা কূটনৈতিক ও আইনি তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও এখনো তা আলোর মুখ দেখেনি। প্রতি বছর খুনিদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে আশ্বাস দেওয়া হলেও এর দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ধীর এ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে খোদ সরকারি দলের ভেতরেই।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে কিছু বিপথগামী সেনা সদস্য। বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক ও শোকাবহ এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের পরবর্তী সরকারগুলো দূতাবাসে চাকরি দেওয়াসহ নানাভাবে পুরস্কৃত করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিচারের পথ রুদ্ধ করার জন্য জারি করা হয় কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সংসদে কুখ্যাত ওই অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ার পর খুনিদের বিচারের পথ খোলে। দীর্ঘ ১৩ বছর পর ২০০৯ সালে আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয় এ মামলার। ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল থাকে। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ওই পাঁচজন হলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান, মেজর (অব.) শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যানসার), লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি) ও মেজর (অব.) বজলুল হুদা।

বাকি সাত আসামির মধ্যে মেজর (অব.) মো. আবদুল আজিজ পাশা ২০০১ সালে জিম্বাবুয়েতে মারা যান। বাকি ছয় আত্মস্বীকৃত খুনি কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পলাতক রয়েছেন। এদের মধ্যে নুর চৌধুরী কানাডায় ও রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। কিন্তু বাকি চার আসামির নিশ্চিত অবস্থান সম্পর্কে জানা নেই আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের।

এর আগে, ২০১৮ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছিল, খন্দকার আবদুর রশিদ পাকিস্তানে, শরিফুল হক ডালিম লিবিয়া বা জিম্বাবুয়ে আর আবুল মাজেদের সম্ভাব্য অবস্থান সেনেগালে। রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন জার্মানিতে আছেন এমন ধারণা করা হলেও এর সত্যতা মেলেনি।

গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলাপের সময় নুর চৌধুরীকে ফেরানোর প্রসঙ্গ তোলেন। ট্রুডো সে সময় তাদের দেশের আইন ও কানাডায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই বলে জানান। নুর চৌধুরী কানাডার নাগরিক না হওয়ায় তার ফেরাতে সেখানকার আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা রাশেদ চৌধুরীকে ফেরাতেও কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এ ব্যাপারে দেশ দুটির সরকারকে চাপ প্রয়োগ করতে প্রবাসীরা বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে বিভিন্ন দেশের আইন খুনিদের ফেরাতে জটিল হয়ে দেখা দিয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনা সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় বিশেষ টাস্কফোর্সের প্রধান ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, প্রক্রিয়া জটিল হলেও হাল ছাড়বে না সরকার। এর আগে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ফাঁসির আসামি মহিউদ্দিন আহমেদকে ২০০৭ সালের ১৭ জুন ফিরিয়ে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকার। বজলুল হুদাকে ফেরত পাঠিয়ে বিচারে সহায়তা করে থাইল্যান্ড।

এদিকে দেশবাসীর প্রত্যাশা, বঙ্গবন্ধুর বাকি খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করার মাধ্যমে জাতিকে কলঙ্ক থেকে মুক্তি দিতে হবে। কূটনৈতিক, আইনি সম্ভাব্য সব পথেই এজন্য এগোতে হবে। সরকারের অব্যাহত তৎপরতার পরও এত দিনেও তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হওয়ায় অনেকের মাঝে অসন্তোষ রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খুনিরা যে সব দেশে পলাতক রয়েছে সে সব দেশের সঙ্গে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি করা গেলে তাদের ফেরানো সহজ হবে।

খুনিদের ফেরাতে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে : আবদুল মতিন খসরু, সাবেক আইনমন্ত্রী
বঙ্গবন্ধু হত্যার দায়ে অভিযুক্ত পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে আনতে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হচ্ছে, সরকারের সঙ্গে সরকারের; জি টু জি। আসামিদের ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টার ত্রুটি করা হচ্ছে না। আপ্রাণ চেষ্টা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কমিটি করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রীসহ সবাই চেষ্টা করছেন খুনিদের ফিরিয়ে এনে কলঙ্কমোচনের।

বন্দি প্রত্যর্পণের চুক্তি থাকলে সহজ হতো : শামসুজ্জামান খান, লেখক ও ফোকলোরবিদ
পলাতক খুনিদের ফেরাতে সরকারের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। বিষয়টা হলো জটিল। এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ব্যাপার। যে সমস্ত দেশে তারা পালিয়ে আছে তাদের সঙ্গে আমাদের বন্দি প্রত্যর্পণের চুক্তি নেই। এ চুক্তি থাকলে অনেক সহজ হতো। যেহেতু যাদের বিচার হয়েছে এবং ফাঁসির রায় হয়েছে; ওই সব দেশে ফাঁসির প্রচলন নেই। সে কারণেও হয়তো তারা এদের আসতে দিতে চায় না। তবে চেষ্টা যেহেতু চলছে, কানাডার সঙ্গে কথাবার্তা বেশ কিছুটা এগিয়েছে বলে আমার ধারণা। হয়তো এ ব্যাপারে আমরা সফল হতে পারব।