ডেঙ্গুঝুঁকি বেশি গর্ভবতীদের

ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯ | ৪ ভাদ্র ১৪২৬

ডেঙ্গুঝুঁকি বেশি গর্ভবতীদের

নুরে রোকসানা সুমি ৯:৫৭ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০১৯

print
ডেঙ্গুঝুঁকি বেশি গর্ভবতীদের

রাজধানীতে কমছেই না ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রতিদিনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন নতুন নতুন রোগী। আবার কেউ কেউ সুস্থ হয়ে বাড়িও ফিরে যাচ্ছেন। ছোট্ট শিশু থেকে বয়স্ক কেউই বাদ যাচ্ছে না ডেঙ্গুর ছোবল থেকে। সর্বগ্রাসী ছোবলে প্রাণও যাচ্ছে অনেকের। এ তালিকায় থেকে বাদ যাচ্ছেন না গর্ভবতীরাও। মারাত্মক ঝুঁকি ও আতঙ্কে দিন যাচ্ছে তাদের। কারণ গর্ভাবস্থায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে এ সময় যে কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়।

শুধু তাই নয়, গর্ভাবস্থায় শরীরে হরমোনের যে পরিবর্তন হয় তাতেও গর্ভবতী নারীরা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। আর সবচেয়ে বড় ভয় রক্তক্ষরণ। এতে বাচ্চা ও মায়ের বড় ক্ষতি হতে পারে। মৃত্যুও হতে পারে। এ কারণে প্রসবের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা নিতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত নারীর প্রসবের সময় একাধিক রক্তদাতা প্রস্তুত রাখতে হবে। নবজাতককে মনিটর করতে হবে। খুব বাধ্য না হলে কোনোভাবেই অপারেশন বা ব্যথার ওষুধ দিয়ে প্রসব করানো যাবে না। কোনো রকম ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। সমস্যা মনে হলেই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক (ভাইরোলজি) ডা. নুসরাত সুলতানা বলেন, গর্ভাবস্থায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে এ সময় যে কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। গর্ভাবস্থায় শরীরে হরমোনের যে পরিবর্তন হয় তাতেও গর্ভবতী নারীরা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। সব রকম চিকিৎসা পদ্ধতি এ সময়ে প্রয়োগ করা যায় না বলে রোগের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়।

তিনি বলেন, গত বছর থেকে ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধি পেতে শুরু করলেও এ বছর তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ২০০২ সালে ডেঙ্গুর যে ধরনটি (উঊঘ ৩) অন্য ধরন দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছিল, ১৬ বছর পর তা আবার আবির্ভূত হয়েছে। ফলে ডেঙ্গু জ্বরে বহু লোক তো আক্রান্ত হচ্ছেই, উপরন্তু বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। এ সময়ে গর্ভবতীরা সবচেয়ে বেশি অবস্থায় থাকে। গর্ভস্থ শিশুরাও বিপদমুক্ত নয়। আমাদের পরামর্শ নিতে আসা অন্তঃসত্ত্বা রোগীদের

তাদের চারপাশটা পরিষ্কার-পরিছন্ন রাখতে বলছি। পা আর হাতের অনাবৃত অংশ ঢেকে রাখতে বলছি। কারণ পায়েই মশা কামড় দেয় বেশি। মশার কয়েলের ধোঁয়া থেকে দূরে থাকার পরামর্শও দিচ্ছি। ঘর বা অফিসে অ্যারোসোল বা যে কোনো ধরনের কীটনাশক স্প্রে করার বিশ মিনিট পর তাদের সেই স্থানে যেতে বলছি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরে কর্মরত গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. নাজনীন আরা বলেন, ডেঙ্গুতে এত বেশি আতঙ্কিত না হয়ে বরং সচেতন হওয়া দরকার। কারণ ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারীর ক্ষেত্রে এই ভাইরাস জ্বরে মৃত্যুর হার খুবই কম। ১০০-তে একজন। কিন্তু পরের তিনমাসের অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রে এটি কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে এ ধরনের ভাইরাসে মৃত্যুর হার ১০০-তে ২০ জন। আর তাই সতর্কতা ও সচেতনতা দরকার।

তিনি আরও বলেন, গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় ভয় ব্লিডিং (রক্তক্ষরণ)। তাই এ সময় ডেলিভারিতে নরমাল বা সিজার দুই ক্ষেত্রেই বাড়তি সতর্কতা নিতে হবে।

বিশেষ করে রোগী যদি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় তবে তার জন্য একাধিক রক্তদাতা প্রস্তুত রাখতে হবে। ডেলিভারির পরপরই নবজাতককে মনিটর করতে হবে (শিশু বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে)। তাছাড়া ডেলিভারির পর প্রচুর রক্তপাত হতে পারে। তাই খুব বাধ্য না হলে অন্তঃসত্ত্বা ডেঙ্গু রোগীকে কোনোভাবেই অপারেশন বা ব্যথার ওষুধ দিয়ে ডেলিভারি করানো যাবে না।

এদিকে, ১০ দিন আগে জ্বর নিয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন গর্ভবতী মালিহা মাহফুজ অন্নি। পরীক্ষায় তার ডেঙ্গু ধরা পড়ে। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিয়ে আসা হয় বিএসএমএমইউ হাসপাতালে। এখানে তাকে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাখা হয় কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ফারজানা আক্তার এখন সাতমাসের অন্তঃসত্ত্বা। তার ছেলে ও চিকিৎসক স্বামী দুজনেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। একদিকে স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটোছুটি অন্যদিকে অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা শঙ্কিত তিনি। তিনি বলেন, ছেলে আর তার বাবাকে নিয়ে খুব মেন্টাল প্রেশারে আছি। তার ওপর আবার নিজেকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা। সারাদিন ‘ওডোমাস’ মাখি। পুরো বাড়ি নেটিং করা। খুব জরুরি না হলে বাইরে যাই না। অফিস থেকে ছুটি নিয়েছি। আমার গাইনোকলোজিস্ট অবশ্য বলেছেন ভয়ের কিছু নেই। শুধু একটু সচেতন থাকতে হবে। দিনে-রাতে ঘুমালে মশারি ব্যবহার করতে পরামর্শ দিয়েছেন। সম্ভব হলে কটনের ফুলহাতা জামা কাপড় পরতে হবে। আর মানসিক চাপ না নিতেও বলেছেন তিনি। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে মানসিক শান্তি বা স্বস্তিতে থাকা কিভাবে সম্ভব?

ছয়মাসের অন্তসত্তা মরিয়ম বেগম বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে সব সময় আতঙ্কে থাকি। এই বুঝি এডিস মশা কামড় দিচ্ছে। তবে আমি চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চলছি। বাকিটা আল্লাহ ভরসা।

নয়মাসের অন্তসত্তা তৃপ্তি আক্তার বলেন, আমার পরিচিত অনেকেই ডেঙ্গু জ্বর। তাই আমিও ভীষণ আতঙ্কে আছি। যদিও চিকিৎসক কয়েলের ধোঁয়া থেকে দূরে থাকতে বলেছেন তবে ২৪ ঘণ্টায় কয়েল জ্বালিয়ে রাখি। তারপরেও স্বস্তি পাচ্ছি না।