ঈদের প্রার্থনা ডেঙ্গুমুক্ত দেশ

ঢাকা, বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯ | ৫ ভাদ্র ১৪২৬

ঈদের প্রার্থনা ডেঙ্গুমুক্ত দেশ

সুলতান মাহমুদ ৯:১৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০১৯

print
ঈদের প্রার্থনা ডেঙ্গুমুক্ত দেশ

ঈদ আনন্দ স্বজনদের সঙ্গে ভাগাভাগি করার জন্য ইতোমধ্যে ৫০ লাখের মতো মানুষ গ্রামের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন। উচ্ছ্বাস নিয়ে গ্রামে ঈদ করতে গেলেও এবার মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু আতঙ্ক বিরাজ করছে। কেননা এ বছর ঢাকাসহ সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত সরকারি হিসাবেই ৩৮ হাজার ৮৪৪ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ৯ হাজার ৪২০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষ এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

চলতি বছর সরকারি হিসাবে ২৯ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তবে বেসরকরি হিসেবে নিহতের সংখ্যা ৮০ ছাড়িয়েছে। সারা দেশে এখন ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব চলছে। চলতি আগস্ট মাসের ১০ দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি মানুষের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। যা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ১৭৬ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আক্রান্তদের সংখ্যা ঢাকার চেয়ে গ্রামেই বেশি। এমন পরিস্থিতিতে ঈদে সবার প্রার্থনা থাকবে দেশ যেন দ্রুত ডেঙ্গু মুক্ত হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান গতকাল খোলা কাগজকে বলেন, ঈদে সবার প্রার্থনা থাকবে দেশ যেন দ্রুত ডেঙ্গুমুক্ত হয়। যারা আক্রান্ত হয়েছেন দ্রুত সুস্থ হন। তবে শুধু প্রার্থনা করলেই দেশ ডেঙ্গুমুক্ত হবে। দেশ ডেঙ্গুমুক্ত করার জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে। সবাইকে বাসা-বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখতে হবে। ডেঙ্গুর উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করে দিতে হবে, কাজটি সবাইকে করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ঢাকা মেডিকেলে শনিবার ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় ঈদের ছুটি চলছে। বেশির ভাগ বেসরকারি হাসপাতালে নতুন করে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করানো হচ্ছে না। সেই চাপ ঢাকা মেডিকেলে পড়েছে। যাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং বাড়িতে বসে চিকিৎসা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই, আমরা কেবল তাদেরই ভর্তি করছি। আর যাদের চিকিৎসা বাসায় দেওয়া সম্ভব তাদের দেখে নির্দেশনা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের ভয় হচ্ছে ঢাকায় আক্রান্ত যারা গ্রামে গেছেন, তাদের গ্রামের ফ্রেস এডিস মশায় কামড়ালে ওই মশাটিও জীবনুযুক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং ওই মশাটায় নতুন যত মানুষকে কামড়াবে তাদের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকবে। তাই সবাইকে বলব ডেঙ্গুর উৎপত্তি স্থল ধ্বংস করুন এবং নিরাপদে থাকুন। জ্বর আসলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

জানা গেছে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা নির্বিঘ্ন করার জন্য সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার-নার্স এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঈদের সরকারি ছুটি বাতিল করেছে। সিটি করপোরেশনে কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করেছে। সিটি করপোরেশনের মশ নিধন কর্মীরা মশার ওষুধ দেওয়ার জন্য কাজ করছেন। সরকারের পাশাপাশি ক্ষমতাসিন দলের নেতাকর্মীরা দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাচ্ছেন। ৬৪ জেলায় মনিটরিং সেল খোলা হয়েছে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ ব্যক্তিরা প্রতিদিন ডেঙ্গু বিষয়ে পর্যালোচনা করছেন। এজন্য তারা নিয়িমিত বৈঠকে বসছেন। গতকালও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সকাল ১০টায় সর্বশেষ ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল কালাম আজাদ, রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনাসহ সংশ্লিষ্টরা এতে উপস্থিত ছিলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মনিটরিং দল ছুটির মাঝেও যাতে ডেঙ্গু রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করা যায়, সেজন্য বিভিন্ন হাসপাতালসমূহ পরিদর্শন করছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের এখন পর্যন্ত ৩৮ হাজার ৮৪৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এখনো হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৯ হাজার ৪২০ জন। গতকাল পর্যন্ত সরকারি হিসেবে মারা গেছেন ২৯ জন। আর বেসরকারি হিসেবে নিহতের সংখ্যা ৮০ ছড়িয়েছেন। গত দুই দিন ধরে ঢাকার চেয়ে বিভাগীয় শহরের আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেশি। গতকাল ঢাকায় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৬৫ জন। আর ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ১১১ জন। ঢাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা মেডিকেলে সর্বোচ্চ ২৫৩ জন ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি আছেন ৮৪৮ জন ডেঙ্গু রোগী, গত ২৪ ঘণ্টায় মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১১৩ জন। সেখানে বর্তমানে ভর্তি আছেন ৫৫৩ জন রোগী।

মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৪১৮ জন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতলে ভর্তি আছেন ৪৫০ জন। ঢাকা শিশু হাসপাতালে ভর্তি আছেন ১৬৭ জন। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৩৭৯ জন। ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরে সবচেয়ে বেশি হাসপাতালে চট্টগ্রামে ৭৬৭ জন। খুলনায় ৬৬৫ জন। রংপুরে ৩০৩ জন, রাজশাহী ৫০৬, বরিশালে ৬০০, সিলেটে ১০৭ জন এবং ময়মনসিংহে ৩০২ জন। ঢাকার বাইরে চলতি বছর ১২ হাজার ১৯৬ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

অ্যারোসল স্প্রে করে ঢাকা ছাড়ছে বাস

দেশজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ার কারণে সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় এডিস মশা থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন- ঢাকার বিভিন্ন টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার আগে বাসে যেন মশক নিধনের অ্যারোসল স্প্রে করা হয়।

কিন্তু প্রথমে নির্দেশনা না মানলেও, এখন উত্তর-পূর্বাঞ্চলগামী বিভিন্ন জেলার বাসগুলোতে অ্যারোসল স্প্রে করা হচ্ছে। এ নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন যাত্রীরাও।
গতকাল শনিবার সকালে থেকে দুপুর পর্যন্ত গাবতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।

সরেজমিন দেখা যায়, সকালে বরিশালগামী সাকুরা পরিবহনের একটি বাসে মশক নিধনে অ্যারোসল স্প্রে করছেন বাসের সুপারভাইজার রহমান। এ সময় গাড়ির বিভিন্ন কোনায়ও পরিষ্কার করতে দেখা যায় তাকে।

তিনি বলেন, আমরা বাস ছাড়ার ১৫ মিনিট আগে স্প্রে করছি। মন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশ আমরা পালন করছি। যাতে বাড়ি ফেরা মানুষ বাসের মধ্যে এডিস মশার কামড় না খান। মো. আতাউর রাজধানীর একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। তিনিও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে বাড়ি যাচ্ছেন।

বাসে ওঠার আগে তিনি বলেন, আমরা গাড়িতে ওঠার ১৫ আগে অ্যারোসল স্প্রে করা হয়েছে। আমরা অনেকটা সেভ মনে করছি। স্বস্তি অনুভব করছি।

বাস কর্তৃপক্ষ বলছেন- যাত্রীদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি চিন্তা করেই বাস ছাড়ার ১০-১৫ মিনিট আগে অ্যারোসল স্প্রে করা হচ্ছে। এতে গাড়িতে কোনো মশা কিংবা ক্ষতিকর কিছু থাকার সুযোগ নেই। তারা বলছেন- ডেঙ্গুর বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির বিষয়টি আমরা আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। তাই ঢাকা থেকে যাওয়ার সময় এবং গন্তব্য থেকে ফেরার সময়ও অ্যারোসল স্প্রে করা হচ্ছে।