কেমন হবে বন্যার্তের ঈদ

ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯ | ৪ ভাদ্র ১৪২৬

কেমন হবে বন্যার্তের ঈদ

নিজস্ব প্রতিবেদক ১১:০৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ২১, ২০১৯

print
কেমন হবে বন্যার্তের ঈদ

বোরো ধানের দাম না পাওয়া কৃষকের কান্নার ক্ষত এখনো শুকায়নি। রাগে-দুঃখে ক্ষোভে কৃষকরা পাকা ধানে আগুন পর্যন্ত দিয়েছে। সে বঞ্চনার ব্যথা না সারতেই বন্যার মতো বড় বিপদ এসে হাজির। যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা ঢলে প্রধান প্রধান নদীর পানি বেড়ে গিয়ে তলিয়ে গেছে উত্তর ও উত্তরপূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। শেষ তিন দিনে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও বগুড়ার বিস্তীর্ণ জায়গা পানির নিচে তলিয়ে আছে।

অব্যাহত ঢলে গাইবান্ধার প্রায় ১০০ গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় আমন বীজতলা, ভুট্টা, পাটক্ষেতসহ বিভিন্ন ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। এছাড়া বন্যাক্রান্ত সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, টাঙ্গাইল, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ অন্যান্য এলাকায় বিস্তীর্ণ সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিয়েছে বন্যা। এ অবস্থায় সামনের কোরবানি ঈদ কীভাবে কাটবে সে চিন্তা গ্রাস করেছে দুর্গত মানুষকে।

প্রতিবছর কোরবানি ঈদে বাজারে সবচেয়ে বেশি পশু সরবরাহ হয়ে থাকে উত্তরাঞ্চল থেকে। কিন্তু এবার বন্যার কারণে হাটে পশু সরবরাহে বড় ধরনের টান পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বন্যায় নানা রোগের প্রাদুর্ভাব চলছে। মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে গরু-ছাগলসহ অন্যান্য গবাদিপশু। সীমিত পরিসরে ব্যক্তি পর্যায়ে যেসব কৃষক গবাদিপশু পালন করতেন এবার তাদের পশুর দাম না পাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই অনেক গরু ব্যবসায়ী গরু পালনকারীদের আগাম টাকা দিয়ে রেখেছেন। যারা আগাম টাকা নিয়েছেন তারা এখন মহাসংকটে পড়েছেন। বন্যার কারণে রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে বাঁচাতে আগেভাগেই কম দামে গবাদিপশু বিক্রি করে দিচ্ছেন অনেকে।

পূর্বাভাসে আগামী তিন দিন বৃষ্টি পরিমাণ কমবে এমনটা জানালেও ২৪ থেকে ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে ফের ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখছে আবহাওয়া বিভাগ। আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম খোলা কাগজকে বলেছেন, ২৪-২৬ জুলাই থেকে শুরু হয়ে মাসের শেষ সময় পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির এ ধারা সারা দেশে অব্যাহত থাকবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন জুলাই মাসের শেষ পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকেই বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তার পাশাপাশি ভারত ও চীনের বন্যার পানি যদি বাংলাদেশে ঢুকতে শুরু করে তাহলে চলমান বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ারও আশঙ্কা আছে। এতে দুর্গতদের কোরবানির ঈদ ম্লান ও মানবেতরভাবেই কাটবে বলে মনে করছেন তারা।

বন্যাদুর্গত অঞ্চলের কৃষকরা জানাচ্ছেন, এবার মৌসুমি সবজি বেগুন, মুলা, চিচিঙ্গা, মিষ্টি কুমড়া, শসা ও ঢেঁড়স রোপণ করেছিলেন অনেকে। কিন্তু বন্যায় সবজির সব ক্ষেত তলিয়ে গেছে। এছাড়া কয়েক হাজার একর আউশ ধান ও আমনের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। এ মৌসুমে নতুন করে আউশের বীজতলা তৈরি করে আউশ ধান চাষ করতে পারবে কি-না তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।

শুধু ফসল নয় বন্যায় ভেসে গেছে বিভিন্ন জেলার বিস্তীর্ণ মাছের ঘেরও। নদী, হাওর ও বিল পানিতে থই থই করছে কিন্তু কোথাও মাছ পাচ্ছেন না জেলেরা। এ কারণে বাজারে মাছের সরবরাহও কমে গেছে।

জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলে বন্যাকবলিত এলাকায় ফসলি জমির বেশি ক্ষতি হয়েছে লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামে। নীলফামারীতে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় ১১৮ হেক্টর জমির ফসল।

লালমনিরহাটের দু’দফা বন্যায় ডুবে গেছে ৩২৫ হেক্টর, গাইবান্ধায় ৬৪৭ হেক্টর, কুড়িগ্রামে ৯ উপজেলার প্রায় ১৪০০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। অন্যদিকে, বগুড়ায় তিন উপজেলায় ৮ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে পানিতে। এসব এলাকায় চলছে মানুষের হাহাকার। শুকনো খাবার ও পানীয় জলের তীব্র হাহাকার চলছে এসব এলাকায়। পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। ইতোমধ্যে গাইবান্ধা কুড়িগ্রামসহ উত্তরের কয়েকটি জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন অনেকে।

এদিকে ভারতের পাশাপাশি চীনের বন্যার পানি বাংলাদেশে এলে বন্যা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ ও স্থায়ী রূপ নেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। রোববার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলাম জানান, বর্তমানে দেশের ২৮টি জেলা বন্যাকবলিত। চীনের পানি যখন পুরোদমে আসা শুরু করবে তখন বন্যা ভয়াবহ হতে পারে। সরকার আশঙ্কা করছে এবারের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সেইভাবে আগাম প্রস্তুতিও সরকারের আছে।