কোথায় পাব তুবার মাকে!

ঢাকা, শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

কোথায় পাব তুবার মাকে!

শফিক হাসান ১০:৩৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ২১, ২০১৯

print
কোথায় পাব তুবার মাকে!

সারা দেশে ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু সন্দেহবশত যাদের পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে, তাদের ফিরে পাওয়া যাবে না কখনই। ‘ছেলেধরা’ বদনাম নিয়ে তারা এতিম করে যেতে বাধ্য হচ্ছেন নিজ ছেলেমেয়েদের। এ বাবা-মায়ের অবর্তমানে কে ধরবে তাদের ছেলেমেয়ের হাল, কে দেবে বন্ধুর পৃথিবীতে প্রয়োজনীয় ছায়া- এমন প্রশ্ন উচ্চকিত হয়ে উঠেছে।

রাজধানীর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মেরে ফেলা একজন অভিভাবক তাসলিমা বেগম রেণুর (৪০) মৃত্যু নীরবে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে অনেকের। একজন মা যে হাতে আগলে রাখেন নিজ সন্তানকে তিনি কীভাবে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত ছেলেধরা বা শিশু অপহরণকারী হতে পারেন! এমন প্রশ্ন করছেন সংবেদনশীল অনেকেই। একই দিনে মেয়েকে দেখতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জে লাশ হয়েছেন একজন বাবা। ‘ছেলেধরা শনাক্তকারীদের’ হাতে যেভাবে অভিভাবকরা অকাতরে প্রাণ হারাচ্ছেন তাতে জনমনে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র আতঙ্ক। কে হবে পরবর্তী সন্দেহের শিকার! এ হুজুগ কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত শত্রুতা চরিতার্থের অভিযোগ মিলেছে শেষোক্ত খুনে।

ছেলেধরা আতঙ্ক ডালপালা মেলেছে পদ্মা সেতুতে নরবলি দিতে হবে, মানুষের মাথা লাগবে- এমন গুজবে। এ গুজবের আগুন উসকে দিয়েছে সম্প্রতি নেত্রকোণায় একটি শিশু খুনের ঘটনা। বস্তুত, ব্যক্তিগত রেষারেষির কারণে এ শিশু খুনের ঘটনার পর থেকে সারা দেশে চলছে ছেলেধরাকে কেন্দ্র করে গুজবের মচ্ছব। এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার রাজধানীর একজন অভিভাবক, যিনি তুবার মা হিসেবে পরিচিত, তার মৃত্যুতে অনেক প্রশ্ন চলে এসেছে সামনে। কে নেবে তার সন্তানদের দায়িত্ব? তার অবর্তমানে কি পাওয়া যাবে কোনো ‘ছেলে-মেয়েধরা’ দরদি! নিহত রেণু দুই সন্তানের মা ছিলেন। এক ছেলে তাহসিন আলমাহিদ (১১) ও এক মেয়ে তাসমিন তুবা (৪)। তুবার ভর্তির বিষয়ে স্কুলে গিয়েছিলেন রেণু। তারপরই পড়েন নিরীহ ‘মানুষধরা’র খপ্পরে। সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য খোঁজ নিতে গণপিটুনিতে প্রাণ হারানো রেণু ৫ বোন ও ১ ভাইয়ের মধ্যে ছিলেন সবার ছোট। নিহত রেণুর লাশ শনাক্ত করেন তার ভাগিনা সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু। তিনি জানান, তাসলিমা বেগম রেণু মহাখালীর জিপি জ ৩৩/৩ ওয়ারলেস গেট এলাকায় থাকতেন। এর আগে বাড্ডার ওই স্কুলেরই পাশে আলীর মোড় এলাকায় স্বামী তসলিম হোসেনের সঙ্গে থাকতেন। দুই বছর আগে পারিবারিক কলহে ডিভোর্স হয়ে যায় তাদের। এরপর থেকে ২ সন্তানকে নিয়ে মহাখালীতেই থাকেন।

শনিবার সকালে উত্তর বাড্ডায় ওই স্কুলে তুবার ভর্তি করার জন্য খোঁজখবর নিতে যান। তাকে পিটিয়ে হত্যার প্রসঙ্গ টেনে আক্ষেপ করে টিটু বলেন, পুলিশ প্রশাসন থাকতে কীভাবে ওই এলাকার লোকজন তাকে পিটিয়ে হত্যা করল! তিনি এর বিচার দাবি করেন। বাড্ডা থানার ওসি অপারেশন ইয়াসিন গাজী বলেন, প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হওয়ার পর এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য মৃতদেহটি রাখা হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে।

যে পাশবিকতা শুরু হয়েছে তার শেষ কোথায় কেউ জানে না। পুলিশ সদর দফতর থেকে গত শনিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। এ হুঁশিয়ারির পরও থামেনি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অশুভ প্রবণতা।

একজন মমতাময়ী মা রেণু বিনা অপরাধে মারা গেলেন, এটা যেমন বেদনার; তার চেয়েও কম বেদনার নয় ঘৃণ্য তকমা ‘ছেলেধরা’ সন্দেহ ও অপবাদ নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় হতে হলো তাকে; আরও অনেককে।

বাবা থেকেও ছিলেন না, এখন মাও নেই; কোথায় যাবে ছোট্ট তুবা? রঙিন জামা পরে প্রজাপতির মতো পেখম খুলে নাচা এবং বর্ণিল খেলনা নিয়ে মেতে থাকার দিন যে ফুরিয়ে এলো তার! এ সত্যটুকু তুবা যত পরে অনুধাবন করতে পারবে, পৃথিবী ততদিনই সুন্দর থাকবে তার জন্য।

এদিকে গত শনিবার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে গণপিটুনিতে নিহত যুবকের পরিচয় মিলেছে। তার নাম সিরাজ (৩৪)। ঘটনার দিন নিজের মেয়েকে দেখতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত হন তিনি। বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী হওয়ায় ঘটনার সময় আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারেননি। তার ভাই আলম সাংবাদিকদের জানান, ১০ বছর আগে সিরাজের সঙ্গে বিয়ে হয় শামসুন্নাহারের। বিয়ের পরে তাদের মিঞ্জু নামে এক কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। শামসুন্নাহার একপর্যায়ে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে আট মাস আগে সিরাজকে তালাক দিয়ে প্রেমিক মান্নানকে বিয়ে করেন। শামসুন্নাহার ৭ বছরের কন্যা মিঞ্জুকেও নিজের কাছে নিয়ে আসেন। এরপর থেকে প্রতিবন্ধী সিরাজ নিজের মেয়েকে দেখতে প্রায়ই সিদ্ধিরগঞ্জের পাগলা বাড়ি এলাকায় আসতেন।

গত শনিবারও এসেছিলেন মেয়েকে দেখতে। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মৃত্যুতে নিহতের ভাই দায়ী করছেন সাবেক স্ত্রী শামসুন্নাহার ও তার স্বামী মান্নানকে। তিনি জানান, সিরাজের সাবেক স্ত্রী ও তার বর্তমান স্বামী মান্নানই তাদের ভাইকে ছেলেধরার নাটক সাজিয়ে হত্যা করেছেন। তাদের কঠোর শাস্তি দাবি করেন তিনি।

অনাকাক্সিক্ষত এসব মৃত্যুতে সামাজিক যোগযোগমাধ্যম ফেসবুকে অনেকেই জানিয়েছেন তীব্র ও বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা লিখেছেন- ‘মানুষ কতটা অসভ্য আর জঙ্গি হলে ছেলেধরা সন্দেহে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারে!’ পৃথক আরেকটি স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন- ‘যে আজ গণপিটুনিতে বিচলিত, মাত্র কিছুদিন আগে নয়ন বন্ডের ক্রসফায়ারে সে হয়তো ছিল উল্লসিত।’

কবি ও সাংবাদিক সিফাত বিনতে ওয়াহিদ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন- ‘আমি তুবা নামের বাচ্চাটার দিকে তাকাতে পারছি না। যার মায়ের প্রাণ গেল কতিপয় মানুষের অজ্ঞতা এবং অতি উৎসাহের কারণে। তাদের কারোর কি ক্ষমতা আছে বাচ্চাটাকে তার মা ফিরিয়ে দেওয়ার? অসুস্থ লাগে আমার নিজেকে। রাতের পর রাত আমি ঘুমাতে পারি না। মানুষ ভাবে এগুলো আমার বিলাসিতা। অথচ আমি একা হলেই নানা ভাবনা মাথায় এসে ভর করে। ঘুমাতে গেলেই আঁতকে ওঠি। আমি আমার জীবনের চেয়ে বেশি শঙ্কিত আমার ছেলের মায়ের জীবন নিয়ে। মা হারিয়ে ফেললে আরেকটা মা তো পাবে না কোনো দুনিয়াতেই।’

প্রকাশক জহিরুল আবেদীন জুয়েল লিখেছেন- ‘এটা কেমন কথা! একজন মাকে ছেলেধরা বলে গণপিটুনিতে হত্যা! কী হচ্ছে দেশে... উফ্।’
বাবা-মায়ের কোনো বিকল্প হয় না। যে সন্তান সময়ের আগেই অভিভাবকের সুনিবিড় ছায়া থেকে বঞ্চিত হয়, তার সারাজীবন কাটে ঠেকে-ঠকে; দুঃখ-বেদনায়। অকালে মা হারানো শিশু তুবাকেও প্রচুর অশ্রু ঝরাতে হবে ভবিষ্যতে- বলার অপেক্ষা রাখে না।