নিরাপত্তা কোথায়

ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৩১ ভাদ্র ১৪২৬

আদালতে বিচারকের সামনেই খুন

নিরাপত্তা কোথায়

সুলতান মাহমুদ ৯:১৪ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০১৯

print
নিরাপত্তা কোথায়

কুমিল্লায় আদালত কক্ষে এজলাসের কাছে বিচারকের সামনে গত সোমবার এক আসামি আরেক আসামিকে ছুরি মেরে হত্যা করে। নিরাপদ জায়গায় এ ধরনের খুনের ঘটনায় সবার মাঝেই আতঙ্ক বিরাজ করছে। আদালত কক্ষে বিচারকের সামনে এ ধরনের খুনের ঘটনার পর বিচারক ও আইজীবী থেকে শুরু করে বিচার সংশ্লিষ্টরা আদলতেই কতটুকু নিরাপদ তা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার সময় আদালতে যারা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিলেন তাদের ভূমিকা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।

এর আগে, ২০০৫ সালে বাসভবন থেকে আদালতে যাওয়ার পথে মাইক্রোবাসে বোমা হামলা করে ঝালকাঠিতে দুই বিচারককে হত্যা করেছিল জেএমবির জঙ্গিরা। ওই সময় বিচারকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গত পরশু কুমিল্লার ঘটনার পর বিচারকদের পরিবারের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। 

বিচারকদের নিরাপত্তা চেয়ে গতকাল হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় একটি রিট দায়ের করেছেন এক বিচারকের স্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন এজলাস কক্ষে কীভাবে একজন মানুষ ধারালো অস্ত্র নিয়ে এলো, নিরাপত্তার দায়িত্বে যারা ছিল তাদের কোনো গাফিলতি ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আর আইনমন্ত্রী বলেছেন, কুমিল্লার ঘটনার পর আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে ৬৪ জেলার সব এজলাসে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, কুমিল্লার ঘটনার পর বিচারক, আইনজীবী, আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিচার সংশ্লিষ্ট সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। তাই এই উদ্বেগ দূর করার জন্য আদালত কক্ষের নিরাপত্তা কঠোর করতে হবে। আদালতে যেসব আসামি ঢোকানো হবে তাদের তল্লাশি করে ঢোকাতে হবে। আদালত চত্বরে যারা থাকে তাদের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। সব সময় শৃঙ্খলাবাহিনীকে সতর্ক হতে হবে। আর এ কাজটা পুলিশকেই করতে হবে। আদালত অত্যন্ত নিরাপদ জায়গা। এমন জায়গায় হত্যাকারী ছুরি পেল কোথায়? দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকাও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে।

জানা গেছে, গত সোমবার কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তৃতীয় আদালতের বিচারক বেগম ফাতেমা ফেরদৌসের আদালতে বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে বিচারক, আইনজীবী ও অন্য বিচারপ্রার্থীদের সামনেই আসামি মো. হাসান অপর আসামি মো. ফারুককে ছুরিকাঘাত করে। ছুরিকাঘাত করার পর ওই আদালতে থাকা এক এএসআই ঘাতক হাসানকে আটক করেন। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নিলে ফারুকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আদালত এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিহত আসামি মো. ফারুক (২৮) কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার কান্দি গ্রামের অহিদ উল্লাহর ছেলে এবং ঘাতক হাসান (২৮) জেলার লাকসাম উপজেলার ভোচপুর গ্রামের শহীদ উল্লাহর ছেলে। তারা সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই বলে পুলিশ জানিয়েছে।

আদালতের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে : ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, সাবেক আইনমন্ত্রী
আদালতের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা উচিত। আদালতে যেসব আসামি ঢুকানো হবে তাদের অবশ্যই তল্লাশি করে ঢুকাতে হবে, তা না হলে তারা (আসামিরা) যে কোনো অঘটন ঘটাতে পারে, যেটা কুমিল্লায় ঘটলো। কাজেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সতর্ক হতে হবে। কেননা বিচারক, আইনজীবী বা সাধারণ মানুষ যেই হোক সবারই তো নিরাপত্তা দরকার আছে। এক কথায় তল্লাশি করে ঢুকাতে হবে এবং নিরাপত্তা আরও শক্ত করতে হবে। আর এ কাজটা পুলিশকেই করতে হবে। আদালতে নিরাপত্তার দেওয়ার জন্য পুলিশকে সব সময়ই নির্দেশনা দেওয়া থাকে এজন্য তাদের নতুন করে নিদের্শনার দরকার নেই। পুলিশ অফিসাররা পরিস্থিতি বুঝে আদালতের নিরাপত্তা জোরদার করবে।

মানুষের কোথাও নিরাপত্তা নেই : সৈয়দ আবুল মকসুদ, লেখক-বুদ্ধিজীবী
মানুষের তো কোথাও নিরাপত্তা নেই। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যদি তৎপর থাকে তাহলে এই ধরনের (কুমিল্লায় আসামির হাতে আসামি খুন) ঘটনা ঘটতে পারে না। কারণ, আদালত অত্যন্ত নিরাপদ জায়গা, বাইরে যদি কোথাও হতো তাহলে আলাদা কথা ছিল। এখন জানা দরকার ওই ব্যক্তি ছুরি পেল কোথায়? দুই আসামি যে ঘটনাটা ঘটালো সেখানে তো আরও লোক থাকার কথা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য থাকার কথা। তাদের সামনে যখন এই ঘটনা ঘটে তাহলে বাইরে তো আরও ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারে ও ঘটছে। কিন্তু এই খুনের যে ঘটনাটা ঘটেছে এটা নতুন। এই ঘটনাটি অনেক উদ্বেগজনক। প্রতিদিনই তো দেশে শত শত আদালতে বিচার হচ্ছে। আমাদের দেশে যেটা হয়- একটি ঘটনা ঘটার পরে একই ধরনের আরও ঘটে। এখন যেটা করণীয় তা হচ্ছে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। ঘটনাটি ছোট বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ভেবে দেখলে এটা কোনো ছোট ঘটনা নয়। এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে জন্য সরকারের যারা সংশ্লিষ্ট আছেন তাদের সে বিষয়ে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে এবং পদক্ষেপ নিতে হবে। আদালতের মতো নিরপেক্ষ এবং নিরাপদ জায়গায় যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটে তাহলে সরকারি আরও যে অফিস আছে সেখানেও উদ্বেগ থাকতে পারে, সেখানেও নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। কেননা এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটা অস্বাভাবিক নয়। এই ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয়, আদালতে বিচারকরাও নিরাপদ নয়।