গুজবের নেপথ্যে কী

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

হার্ডিঞ্জ থেকে পদ্মা সেতু

গুজবের নেপথ্যে কী

কুন্তল দে ১০:৩৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০১৯

print
গুজবের নেপথ্যে কী

বাংলাদেশের জনগণের টাকায় নির্মাণ হতে চলা পদ্মা সেতু নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। ফেসবুকের ইনবক্সে ছড়িয়ে পড়া ওই গুজবে বলা হয়, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য এক লাখ মানুষের মাথা দরকার। এজন্য দেশজুড়ে বেশ কয়েকটি দল বের হয়েছে। তারা ধারালো ছুরি হাতে হাটে, মাঠে, ঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন বয়সী ছেলেমেয়ে অপহৃত হচ্ছে।’

এ রকম নিষ্ঠুর, নির্মম ও আতঙ্ক জাগানিয়া গুজব খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে। ফলে ভিত্তিহীন আতঙ্ক তৈরি হয় মানুষের মনে। পরিস্থিতি এমন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছে যে, পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষকে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানাতে হয়, মাথা লাগার বিষয়টি ভিত্তিহীন ও পুরোপুরি গুজব। এ ধরনের গুজব যারা ছড়াচ্ছে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশও দিয়েছেন।

সরকারের তরফ থেকে সরাসরি না বললেও ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে, এ গুজবের পেছনে গত নির্বাচনে হেরে যাওয়া বিএনপি-জামায়াত রয়েছে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘সরকারকে কোণঠাসা করে বিপদে ফেলতে দেশে-বিদেশে আড়ালে-আবডালে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। যারা পদ্মা সেতু চায় না, তারাই পদ্মা সেতুতে মাথা বা রক্ত লাগবে এমন গুজব ছড়াচ্ছে। কী নির্মম, কী নিষ্ঠুর! এমন অপপ্রচারও তারা করে! আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে, নির্বাচনে ব্যর্থ হয়ে এখন তারা শুরু করেছে অপপ্রচার। অপপ্রচার ছাড়া তাদের আর কোনো পুঁজি নেই। এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’

পদ্মা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষ প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ পরিচালনায় মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি কুচক্রী মহল বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে অপপ্রচার চালাচ্ছে তা প্রকল্প কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এটি একটি গুজব। এর কোনো সত্যতা নেই। এমন অপপ্রচার আইনত দ-নীয় অপরাধ। এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ করা যাচ্ছে।’

পদ্মা সেতু নিয়ে কারা পরিকল্পিত এ গুজব ছড়িয়েছে তা খুঁজে বের করতে এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী মাঠে নেমেছে। এরই মধ্যে ভোলায় একজন গ্রেফতার হয়েছে। সরকার এ গুজব নিয়ে উদ্বিগ্ন। শুধু সরকার নয়, জনসাধারণের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে এই নির্মম, অসত্য ও আতঙ্ক সৃষ্টিকারী গুজবের নেপথ্যে আসলে কি? যদিও এ সেতু বা বড় কোনো স্থাপনা ঘিরে এ অঞ্চলে নরবলি বা মানুষের মাথা লাগার গুজব নতুন কোনো বিষয় নয়। বছরের পর বছর ধরে বংশপরম্পরায় এখানকার মানুষের মধ্যে সরল এ বিশ্বাস রয়েছে। অজ্ঞানতা, অশিক্ষা বা কুসংস্কার থেকে এ ধরনের লোকবিশ্বাস চালু ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। শিক্ষা ও বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসার ঘটেছে মানুষের মাঝে। এ রকম সময়ে এ ধরনের গুজব প্রত্যাশিত নয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মা সেতু নিয়ে এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ার কারণ সরল লোকবিশ্বাস হলেও, এখানে একটা মহল সুপরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করে চলেছে।

১৯১৫ সালে উদ্বোধন হওয়া পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এ অঞ্চলের বড় স্থাপনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো। এ রেল সেতু নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে এখনো নানা লোকমিথ প্রচলিত আছে। এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের বাসিন্দা ও ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকের স্টাফ রিপোর্টার জাফর আহমেদ বলেন, আমাদের ছোটবেলায় বয়স্করা হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নিয়ে নানা ভীতিকর গল্প শোনাতেন। তিনি জানান গল্পটা এমন, ইংরেজ আমলে নির্মিত লোহার এই রেল সেতুটি নির্মাণকালের এক পর্যায়ে আর এগুনো যাচ্ছিল না। তখন একজন স্বপ্নে দেখতে পান ব্রিজের পিলারে নরবলি দিলে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ হবে। স্বপ্ন অনুযায়ী ওই সেতুতে নরবলি দেওয়া হয়। এরপর সেতুটির ঠিকঠাক নির্মাণকাজ শেষ হয়।’ জাফর জানান এ ধরনের গল্পের আসলে কোনো সত্যতা নেই। কিন্তু বছরের পর বছর মানুষের মুখে মুখে এটি প্রচলিত।

শুধু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নয়, পাকশিতে পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত লালন শাহ সেতু কিংবা কুষ্টিয়াতে গড়াই নদীর ওপর নির্মিত রেল বা সড়ক সেতু নিয়েও এ ধরনের লোককাহিনী প্রচলিত আছে। বাংলাদেশের সব ব্রিজ, সেতুর ক্ষেত্রেই একই ধরনের ভিত্তিহীন লোকবিশ্বাস প্রচলিত। এর ফলে ‘ছেলে ধরা বা গলা কাটা’ আতঙ্ক মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। শিশু-কিশোরদের মাঝে এ ধরনের ভীতিকর গল্পের প্রভাব মারাত্মক। এ ধরনের গল্প ঘিরে ভয়ের জগৎ তৈরি হতে পারে তাদের মনে। সমাজের মাঝেও ছড়িয়ে পড়তে পারে আতঙ্ক। অচেনা মানুষের প্রতি সন্দেহ, বিদ্বেষ, ভয় তৈরি হয়। ফলে অনেক সময় হৃদয়বিদারক ঘটানোও ঘটে যেতে পারে।

এমনই একটি ঘটনা গত বুধবারে ঘটেছে বরিশালের গৌরনদীতে। ‘ছেলেধরা ও গলাকাটা’ সন্দেহে দুই যুবককে পিটুনি দিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই দুজনকে উদ্ধার করেছে। ঘটনার শিকার ওই দুই যুবকের নাম তরিকুল ইসলাম (২৯) ও মিজানুর রহমান (২৮)। তারা মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার বাসিন্দা। এলাকাবাসী জানান, টেকেরহাট চরপ্রসন্নদী জামেয়া আরাবিয়া মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানার সাহায্যের জন্য টাকা তুলতে তরিকুল ও মিজানুর কাণ্ডপাশা গ্রামে যান।

এরপর কয়েকটি বাড়ি থেকে টাকা তোলেন। তবে এ সময় গ্রামের কাণ্ডপাশা নুরানী তালীমুল মাদ্রাসার সুপার মাহামুদুল ইসলাম গ্রামের যুবকদের ডেকে জানান, এলাকায় ছেলেধরা ও গলাকাটা প্রবেশ করেছে। এরপর যুবকরা ওই দুজনকে খুঁজে বের করে পিটুনি দেন। মাদ্রাসার সুপার বলেন, এখন এলাকায় এ বিষয়ে আতঙ্ক চলছে বলে ওই দুজনকে তার ছেলেধরা মনে হয়েছে।

কিন্তু এই যে ভিত্তিহীন গুজব ছড়িয়ে পড়েছে এর শেকড়টা আসলে কোথায়? এ বিষয়ে বিবিসি বাংলায় এক সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তী। তার মতে, এ দেশের শাসনব্যবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমি এবং গ্রামাঞ্চলের মানুষের চিন্তাধারার মধ্যে এর কারণ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখবেন আমাদের এই অঞ্চল বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন রাজা, সম্রাটদের মতবিভিন্ন ধাঁচের শাসকদের অধীনে ছিল। নানা কিংবদন্তিমূলক কাহিনী, আবহমান কাল ধরে চলে আসা জনশ্রুতি এবং স্থানীয় সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন গল্পের ওপর বিশ্বাস করার প্রবণতা মানুষের মধ্যে প্রবল। কথিত আছে, ১৫৮০ সালের দিকে মৌলভীবাজারে কমলার দীঘি তৈরি করার সময় দীঘিতে যখন পানি উঠছিল না, তখন রাজা স্বপ্ন দেখেন যে, তার স্ত্রী দীঘিতে আত্মবিসর্জন দিলে পানি উঠবে। পরবর্তীতে রাজার স্ত্রী আত্মাহুতি দেওয়ার ফলেই ওই দীঘিতে পানি ওঠে।’

দিনাজপুরের রামসাগর তৈরির সময় একই ধরনের কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। তিনি বলেন, এসব ঘটনার কোনো প্রামাণিক দলিল বা সুনিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ না থাকলেও শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে চলে আসার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ধরনের গল্পের একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। এ ধরনের গল্প সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন হলেও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বিদ্যমান থাকায় সরলমনা মানুষ সেগুলো বিশ্বাস করে।

যে পদ্মা সেতু নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে এ গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে গত ৩০ জুন পর্যন্ত সেই সেতুর সার্বিক অগ্রগতি ৭১ শতাংশ। এর মধ্যে মূল সেতুর বাস্তব কাজের অগ্রগতি ৮১ শতাংশ, নদীশাসন কাজের অগ্রগতি ৫৯ শতাংশ। মূল সেতুর ২৯৪টি পাইলের মধ্যে ২৯২টি বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। ৪২টি পিয়ারের মধ্যে ইতিমধ্যে ৩০টি পিয়ারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৪টি স্প্যান স্থাপন করা হয়েছে, যা এখন দৃশ্যমান।