পরিদর্শনেই থেমে আছে সমাধান

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৫ কার্তিক ১৪২৬

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

পরিদর্শনেই থেমে আছে সমাধান

তুষার রায় ১০:১৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০১৯

print
পরিদর্শনেই থেমে আছে সমাধান

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশে সফরে এসে ঘুরে গেলেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির। উখিয়ায় আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের অবস্থা দেখে সে চিত্রকে হৃদয়বিদারক বলে বর্ণনা করেন তিনি। রোহিঙ্গাদের মাতৃভূমি রাখাইনে ফেরত যাওয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারকে অনেক কিছু করতে হবে বলে মন্তব্য তার।

এর আগে পোপ ফ্রান্সিসসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি, প্রভাবশালী থিঙ্ক ট্যাংকের সদস্যরা রোহিঙ্গা শিবিরে ঘুরে গেছেন। নির্মমতার শিকার রোহিঙ্গাদের কথা শুনে ব্যথিত হয়েছেন। বাংলাদেশকে প্রশংসার বাণীতে ভাসিয়েছেন। নানা সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু আসল কাজ মানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনোই ভূমিকা রাখেননি।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়। আগে থেকে এখানে আশ্রয় নিয়েছিল সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গা। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় এই শরণার্থী সংকট দেখতে এসেছেন পোপ ফ্রান্সিস, জর্ডানের রানী রানীয়া আল আবদুল্লাহ, হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী অ্যাঞ্জোলিনা জোলি, যুক্তরাষ্টের সহকারী মন্ত্রী সায়মন হেনশ, জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াং হিলি, জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদল, জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারিসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চ পর্যায়ের কূটনীতিকরা। তারা রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে আশ্বস্ত করে গেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিশ্বের বিভিন্ন সেমিনারে এ ইস্যুতে তার আক্ষেপ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের ফেরাতে মিয়ানমার কার্যকর কিছু করছে না। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এর অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়।’

এদিকে বৈশ্বিক বিভিন্ন এনজিও সংস্থা রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারে যেন ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। সেখান থেকে এনজিওগুলো নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের কিছু কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশ সরকার এর আগেও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের অন্যতম মিত্র ভারত এ বিষয়ে সাদামাটা বিবৃতি দিয়ে দায় সেরেছে। আটলান্টিকের ওপার থেকে ট্রাম্প প্রশাসনও কাগুজে বিবৃতিতেই আটকে রয়েছে। একই পথের পথিক হয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ওআইসিসহ প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর কেউই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে উদ্যোগী হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে দেশ সফরে গেছেন সবখানেই এ সমস্যা সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। সর্বশেষ চীন সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদেশের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরেন। চীনা প্রেসিডেন্ট এ সমস্যার সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।

মানবিক কারণে সরকার তাদের সাময়িক ঠাঁই দিলেও দেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়ে। কক্সবাজারের স্থানীয় জনজীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। অসংখ্য রোহিঙ্গা নাগরিক বিভিন্ন কৌশলে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। ইয়াবা পাচার, খুনসহ নানা অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে। এদিকে এই ইস্যুতে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে নেমে পড়ে একাধিক দেশি বিদেশি চক্র। শুরুতে জাতিসংঘ নানা দৌড়ঝাঁপ করলেও পরে অজানা কারণে তাদের কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ে। বন্ধুরাষ্ট্র ভারত এ ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে আশা করা হয়েছিল তার ছিটেফোঁটাও পাওয়া যায়নি। ভারত এ বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থবহ কোনো আলোচনার উদ্যোগও নেয়নি।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, পেট্রোলিয়াম ও খনিজ সমৃদ্ধ রাখাইন রাজ্যে আগে থেকেই কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে ভারত। তাছাড়া দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চোখ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর দিকে। আর আসিয়ানের প্রবেশদ্বার মিয়ানমার। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা মিয়ানমারকে চটাতে চায় না। কারণ সেখানে ওঁত পেতে আছে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। এদিকে চীনও একই কারণে মিয়ানমারকে খোঁচাতে চায় না। রাখাইনে তাদেরও রয়েছে বিপুল বিনিয়োগ। সেখানে তারা বন্দর গড়তে চায়, কারখানা খুলতে চায়, অবকাঠামোগত কাজের পাশাপাশি অস্ত্রের বরাত পেতে চায়। ফলে যে দুটো দেশ সত্যিকার অর্থে এ সমস্যার সমাধান করতে পারে সেই ভারত ও চীন তাদের স্বার্থে চুপ রয়েছে।

এছাড়া দীর্ঘ কয়েক দশকজুড়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা মিয়ানমার সম্প্রতি এসব খাঁড়া থেকে অব্যাহতি পেয়েছে। দেশটিতে ব্যাপক সংস্কার চলছে। এজন্য দরকার বিপুল বিনিয়োগ। ঠিক এই সুযোগটাই নিতে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় দেশগুলো। বিপুল সম্ভাবনাময় মিয়ানমারের বাজারে ঢোকার জন্য তারা ডলারের বস্তা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মিয়ানমার এসব হিসাব নিকাশ ভালো জানে বলে সুযোগের শতভাগ সদ্ব্যবহার করছে। জান্তা সরকার ধরেই নিয়েছে, বিনিয়োগের মুলো ঝুলিয়ে এই যাত্রায় তারা পার পেয়ে যাচ্ছে। দেশটির আসল মনোভাব হলো তারা কখনোই রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চায় না। এটা তাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের রাখাইনে প্রত্যাবাসনে সফর- পাল্টা সফর, জ্বালাময়ী বক্তৃতাসহ সম্ভাব্য সবকিছুই হচ্ছে। কিন্তু আসল কাজের কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। শিগগিরই তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কোনো আলামতও দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বের প্রভাবশালী সব দেশ মৌখিকভাবে একাত্মতা প্রকাশ করলেও কেউ কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না। তবে আশার কথা চীন সফরকালে গত ৫ জুলাই শি জিনপিং রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি আলোচনার জন্য মিয়ানমারে মন্ত্রী পাঠাবেন বলে জানিয়েছেন। দেশটির গণমাধ্যমেও বিষয়টি ফলাও করে ছাপা হয়েছে। মনে করা হয়, এ সমস্যার সত্যিকারের সমাধান একমাত্র চীনই করতে পারে। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে চীনেরও ভূ-কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। তবে দুদেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে শি জিনপিংয়ের পাল্লা কোন দিকে ঝুঁকে থাকবে তার ওপর নির্ভর করেছে সবকিছু।