দুধে এন্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্ট

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৫ কার্তিক ১৪২৬

দুধে এন্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৫৯ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০১৯

print
দুধে এন্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্ট

বাজারে বিক্রি হওয়া তরল দুধে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর এন্টিবায়োটিক, ফর্মালিন, ডিটারজেন্টের মতো উপাদান পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ। শুধু দুধ নয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঘি, ম্যাংগো ড্রিঙ্কস, সয়াবিন তেলেও মিলেছে ভেজাল। মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ঢাবির ফার্মেসি অনুষদ। বাজার থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন পণ্য ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা শেষে তারা এ প্রতিবেদন তৈরি করে।

এদিকে মাস ছয়েক আগে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষও বাজারে তরল দুধ এবং দুগ্ধজাত সামগ্রীর নমুনা পরীক্ষা করে বলেছিল বেশির ভাগ দুধেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নানা উপাদানের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। অথচ গতকাল বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই) হাইকোর্টে দেওয়া এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে তাদের দ্বারা অনুমোদিত পাস্তুরিত তরল দুধে কোনো ক্ষতিকারক উপাদান নেই।

তারা জানায়, মে মাসের ২৩ তারিখ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত বিএসটিআইর অনুমোদিত ১৮টি কোম্পানির পাস্তুরিত তরল দুধের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এ নিয়ে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদিও উভয় পরীক্ষার মধ্যে সময়ের ব্যবধান প্রায় ছয় মাস।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন প্রায় একই রকম। গতকাল ফার্মেসি বিভাগের সংবাদ সম্মেলনে তরল দুধে ক্ষতিকারক উপাদানের অস্তিত্ব থাকার বিষয়টি জানাচ্ছিলেন ওষুধপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ।

তারা বলেছেন, বাজারে বিক্রি হওয়া প্রাণ, মিল্কভিটা ও আড়ং, ইগুল, ইগলু চকোলেট, ইগলু ম্যাংগো ও ফার্ম ফ্রেশ দুধ মানহীন। এসব দুধে মাত্রাতিরিক্ত কলিফর্ম এবং কিছু দুধে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর এন্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব মিলেছে। অপাস্তুরিত দুধের তিনটি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে রাজধানীর পলাশী, গাবতলী ও মোহাম্মদপুর বাজার থেকে। এ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের টিনে বিক্রি হওয়া ঘিতেও মান কম পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ফ্রুট ড্রিংকস, সরিষার তেল, সয়াবিন তেল, ঘি, গুঁড়া মসলা, শুকনা মরিচ, হলুদ, পাম অয়েল নিয়েও পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে।

অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, আমরা যে ফলাফল দিয়েছি তা নমুনার ফলাফল। তার মানে এই না যে ওইসব কোম্পানির সব পণ্যই এরকম। আমরা কিন্তু থাকব না মরে যাব, যদি এভাবে যত্রতত্র এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার করা হয়। এন্টিবায়োটিক যে গরুকে খাওয়ানো হলো ওই গরুর দুধ ও মাংস আমরা খেলে তা আমাদের শরীরে প্রবেশ করবে। মানুষকে বাঁচাতে আপনারা এখনই গরুকে এন্টিবায়োটিক খাওয়ানো বন্ধ করুন।

এসব দুধে এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগের উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের পরীক্ষায় পাস্তুরিত দুধের সাতটি নমুনার সবগুলোতেই মানব চিকিৎসায় ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিক লেভোফ্লক্সসিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন ও এজিথ্রোমাইসিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এছাড়াও অপাস্তুরিত দুধের একটি নমুনাতে ফরমালিনও মিলেছে। অন্য একটিতে পাওয়া গেছে ডিটারজেন্ট।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিএসটিআই স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী দুধে ফ্যাট ইন মিল্ক থাকতে হবে ৩ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি। বিশ্লেষণে পাস্তুরিত দুধের সাতটি নমুনার মধ্যে ছয়টিতেই এই পরিমাণে ফ্যাট ইন মিল্ক ছিল না। সলিড নট ফ্যাট থাকতে হবে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশের বেশি। কিন্তু বিশ্লেষণে এসব দুধের সবগুলোতেই কম ছিল। আর টোটাল ব্যাকটেরিয়া কাউন্টও ছিল পাস্তুরিত দুধের সবগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। কলিফর্ম কাউন্ট পাস্তুরিত দুধের দুটি নমুনাতে ছিল অনেক বেশি। আর স্টেফাইলোকক্কাস স্পেসিজ শূন্য থাকার কথা থাকলেও পাস্তুরিত দুধের পাঁচটিতে এর জীবাণুর উপস্থিতি তো ছিলই, এমনকি এর পরিমাণও ছিল অনেক বেশি। অর্থাৎ বিএসটিআই মানদণ্ড এসব দুধের সবগুলোই বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মানোত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছে।

ফ্রট ড্রিংকসের মধ্যে স্টারশিপ ম্যাংগো ফ্রুট ড্রিংক, সেজান ম্যাংগো ড্রিংক, প্রাণ ফ্রুটো, অরেনজি, প্রাণ জুনিয়র ম্যাংগো ফ্রুট ড্রিংক, লিটল ফ্রুটিকা ম্যাংগো ফ্রুট ড্রিংক, সানড্রপ, চাবা রেড অ্যাপল, সানভাইটাল নেকটার ডি ম্যাংগো, লোটে সুইডেন্ড অ্যাপল ড্রিংক ও প্রপিকানা টুইস্টার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। বিএসটিআই স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী কৃত্রিম মিষ্টিকারক সাইক্লামেট ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও ১১টি পণ্যের সবগুলোতেই এর ব্যবহার ছিল অতিমাত্রায়।

সয়াবিন তেলের মধ্যে রূপচাঁদা, ফ্রেশ, পুষ্টি, তীর, এসিআই পিওর, ভিওলা, মুসকান ও মিজান এর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। বিএসটিআই স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী তেলের অ্যাসিড ভ্যালু, স্যাপনিফিকেশন ভ্যালু, পারক্সাইড ভ্যালু স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। আয়োডিন ভ্যালু আটটি নমুনার চারটিতে কম ও একটিতে বেশি পাওয়া গেছে। জলীয় উপাদান আটটি নমুনাতেই স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।

বাজারে প্রচলিত আটটি ঘিয়ের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা চালানো হয়। এগুলো হলো-বাঘাবাড়ী, প্রাণ, মিল্কভিটা, মিল্কম্যান, সমির ও টিনে বিক্রি হওয়া নামবিহীন দুটি নমুনা। বিএসটিআই স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ঘিয়ে জলীয় উপাদান ও আয়োডিন ভ্যালু যতটুকু থাকার কথা রয়েছে এসব নমুনায় তার থেকে বেশি পাওয়া গেছে। আর তিলের তেলের কোনো উপস্থিতি থাকতে পারবে না উল্লেখ থাকলেও এসব পণ্যের সবগুলোতেই এর উপস্থিতি ছিল। এ বিবেচনায় আটটি নমুনাই মানোত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছে।

নিজেদের দ্বারা অনুমোদিত পাস্তুরিত তরল দুধে কোনো ক্ষতিকারক উপাদান নেই দাবি করে বিএসটিআই গতকাল হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিলের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক এ কে লুৎফর কবির বিএসটিআইয়ের পরীক্ষা নিয়ে পুরোপুরি আশ্বস্ত হওয়ার কোনো কারণ দেখছেন না তিনি। কারণ ছয়মাস আগে ঢাবির ওষুধপ্রযুক্তি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থীরা বাজার থেকে তরল দুধ এবং দুগ্ধজাত সামগ্রীর নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাগারে পরীক্ষা করেছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নমুনা পরীক্ষা করে তরল দুধে যেসব ক্ষতিকর উপাদান পেয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারেও মোটামুটি একই রকম ফলাফল এসেছে।

তিনি বলেন, ‘এই যে তারা সীসা এবং অ্যান্টিবায়োাটিক পাওয়া গেছে বলছে সেটা মিথ্যা কথা না। এটা সত্য।

বাজারে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়াও আরও অনেক কোম্পানি আছে যারা প্যাকেটজাত পাস্তুরিত দুধ বিক্রি করে। বিএসটিআই বলছে তারা শুধু তাদের দ্বারা অনুমোদিত কোম্পানিগুলোর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে।

যখন বিএসটিআই তাদের কাছে স্যাম্পল (নমুনা) চায়, তখন তারা বেস্ট স্যাম্পল দেয়। ওখানে কোনো সমস্যা থাকে না। কারণ ওরা সেভাবেই বিএসটিআইকে স্যাম্পল দেয়।

অধ্যাপক লুৎফর কবির মনে করেন, বিএসটিআই যদি বিভিন্ন জেলা থেকে ভিন্ন-ভিন্ন সময়ে তরল দুধের নমুনা সংগ্রহ করতো, তাহলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারতো। ফ্যাক্টরি থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত দুধ পৌঁছাতে যে সময় লাগে তখন অনেক ক্ষেত্রে সেটি যথাযথ মাত্রায় সংরক্ষণ করা হয় না। সেজন্য দুধে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি বাড়তে পারে।