হামাক সবাই হেলা করে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯ | ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

হামাক সবাই হেলা করে

উপেক্ষিত উত্তরবঙ্গ (শেষ)

সাজ্জাদ হোসেন ১০:১৯ অপরাহ্ণ, জুন ১৯, ২০১৯

print
হামাক সবাই হেলা করে

দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত জনপদ উত্তরবঙ্গ। রাজশাহীর আটটি ও রংপুরের আটটি জেলা নিয়ে উত্তরবঙ্গের বিস্তৃতি। এ অঞ্চল সাধারণত কৃষি অর্থনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। উত্তরের ১৬ জেলা যে সমানভাবে দুর্দশাগ্রস্ত তা কিন্তু নয়। উত্তরের কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাটসহ মোট পাঁচটি জেলায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি।

কুড়িগ্রাম শুধু উত্তরবঙ্গই নয়, সারা দেশের মধ্যে দরিদ্র অঞ্চল। কিন্তু কুড়িগ্রামের যে ক্ষুধা তা কিন্তু উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক চিত্র নয়। রংপুর বিভাগের দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড়ে প্রচুর পরিমাণে ধান জন্মে। এ ছাড়া উত্তরের প্রায় সব জেলাতেই প্রচুর আলু চাষ হয়। বর্তমানে আলু উৎপাদনে রংপুর দেশের শীর্ষে। শুধু রংপুর নয়, উত্তরের আরেক বিভাগ রাজশাহীর নওগাঁ, জয়পুরহাট, বগুড়া, রাজশাহী, নাটোরে প্রচুর ধান, আলুসহ খাদ্যশস্য জন্মে। ফলে এ অঞ্চলের উদ্বৃত্ত খাদ্য দিয়েই উত্তরের খাদ্য ঘাটতি রোধ করা সম্ভব। তারপরও কেন এত খাদ্যের অভাব?

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সম্পদ, জনশক্তি সব থাকার পরও দেশের নীতিনির্ধারণীদের কাছে সব ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত উত্তরবঙ্গ। এ অঞ্চলের মানুষের জন্য ‘আছে শুধু অবহেলা’। তাই এ অঞ্চলের মানুষ বলে, হামার কথা কাইয়্যো ভাবে না। হামাক সবাই হেলা করে।

কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর ও লালমনিরহাটের পশ্চাৎপদতার একটি বড় কারণ হলো এ অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নদনদী। বর্ষাকালে ভয়াল বন্যায় এলাকার কৃষকরা প্রতিবছর সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। শুধু কুড়িগ্রামেই রয়েছে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলাসহ ছোট-বড় মোট ১৫টি নদী। তবে এখানে এই নদীগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারত অর্থনৈতিক অঞ্চল। কিন্তু এই নদীই হয়েছে এ অঞ্চলের দুঃখ।

একটু পেছনের দিকে তাকালে এই কুড়িগ্রামেরও গর্ব করার মতো অতীত ঐতিহ্য ছিল। ব্রিটিশ আমলে এখানকার চিলমারী বন্দরকে ঘিরে এক সময় ছোট-বড় অসংখ্য ব্যবসা কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল, ভিড়তো জাহাজ। এখানে গড়ে উঠেছিল কলকারখানা। এখানকার পাট ও পাটজাতদ্রব্য চলে যেত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ দেশ ও দেশের বাইরে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে ১৯৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে নৌপথে মালামাল পরিবহনের জন্য একটি নৌ-প্রটোকল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিলমারী সফরে এসে চিলমারীকে নৌবন্দর হিসেবে ঘোষণা দেন। এর কিছুদিন পর চিলমারীর রমনাঘাট নামক স্থানে পন্টুন স্থাপন করে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নদীবন্দর উদ্বোধন করেন তৎকালীন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। কিন্তু বন্দরের ইজারা দেওয়াকে কেন্দ্র করে জেলা পরিষদ এবং বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে সেটিতে বাদ সাধে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ালে আরও জটিলতার সৃষ্টি হয়। ফলে সম্ভাবনাময় চিলমারী বন্দর আর আলোর মুখ দেখেনি। এতে এ এলাকার সম্ভাবনাময় নদীভিত্তিক অর্থনীতি লুটেরাদের কারণে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে পড়ে।

পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা, দিনাজপুরের হিলি ও বিরল, লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দরের মাধ্যমে এ অঞ্চলের সঙ্গে ভারত ও নেপালের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনের দুয়ার খুলে যেতে পারত। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা এবং স্থলবন্দরের সঙ্গে জড়িত কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এ অঞ্চলের বাণিজ্য মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না।

উত্তরাঞ্চলের জনগণের স্বাস্থ্যসেবার জন্য রয়েছে রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ ও নওগাঁয় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। কিন্তু রাজশাহী এবং রংপুর ছাড়া অন্য মেডিকেল কলেজগুলো সেভাবে মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারছে না, ফলে চাপ বাড়ছে এ দুটি মেডিকেলে। আর এ কারণে রোগীর ভিড়ে কাক্সিক্ষত সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। সরকার যদি সবকটি মেডিকেলকে সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে তাহলে এ অঞ্চল স্বাস্থ্যসেবার জন্য উদাহরণ হতে পারে।

উত্তরে রয়েছে রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জে পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। তার মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নানামুখী জটিলতার কারণে সেভাবে শিক্ষার আলো ছড়াতে পারছে না। ফলে এ অঞ্চলে শিক্ষার হার কমছে। যদি এ অঞ্চলের সব কটি বিশ্ববিদ্যালয়কে পাইলট প্রোগ্রামের আওতায় এনে দ্রুত উন্নত করা যায় তাহলে এ অঞ্চল শিক্ষাতেও দেশের কোনো অংশ থেকে পিছিয়ে থাকার কথা নয়।

দুই বিভাগের মধ্যে রাজশাহী এবং নীলফামারীতে চালু রয়েছে দুটি বিমানবন্দর। লালমনিরহাট ও বগুড়ায় রয়েছে আরও দুটি বিমানবন্দর। কিন্তু এ দুটি বিমানবন্দর সংস্কারের অভাবে চালু হচ্ছে না। ফলে এ অঞ্চলে আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন থমকে আছে। এ অঞ্চলের একমাত্র আন্তর্জাতিকমানের স্টেডিয়াম বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামটি বিমানবন্দর চালু নেই বলে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

উত্তরের জয়পুরহাট, দিনাজপুর, নওগাঁসহ নানা জায়গায় সন্ধান মিলেছে কয়লা, লোহা, চুনাপাথরসহ নানা প্রাকৃতিক সম্পদের। কিন্তু সেগুলো উত্তোলনে কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে এ অঞ্চলের অর্থনীতি সেভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। এছাড়া এ অঞ্চলের মধ্যে সম্ভাবনাময় অনেক শিল্প রয়েছে। যেমন রাজশাহীর সিল্ক ও আম, পঞ্চগড়ের চা। এসব সম্ভাবনাময় শিল্পের প্রতি সরকারের নজর না থাকায় বিকাশ ঘটতে পারছে না।

এতদিন উত্তরের উন্নতি না হওয়ার পেছনে এ অঞ্চল থেকে মন্ত্রী না থাকাকে অনেকে দুষছেন। কিন্তু এবার উত্তরের জেলাগুলো থেকে বেশ কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়েছে। ফলে উত্তরের উন্নয়ন আর বায়বীয় কোনো কারণে থমকে থাকার সুযোগ নেই। এরপরও যদি উত্তরের উন্নয়ন না হয়, পিছিয়ে পড়ে উত্তরের জনগণ তাহলে এ অঞ্চলের প্রতি, এ অঞ্চলের মানুষ সরকারের অবহেলাকেই দায়ী করবে।