দোটানায় সরকার

ঢাকা, বুধবার, ২৬ জুন ২০১৯ | ১২ আষাঢ় ১৪২৬

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি

দোটানায় সরকার

সুলতান মাহমুদ ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৩, ২০১৯

print
দোটানায় সরকার

জ্বালানি খাতের ভর্তুকি কমাতে সরকার ফের গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী গত রোববার এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর আগেও গ্যাসের মূল বৃদ্ধির জন্য সরকার একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন মহলের তীব্র প্রতিবাদের মুখে সে পথে আর হাঁটেনি। এখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এলএনজি আমদানিতে ১৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। সামনে আরও ১৪ হাজার কোটি টাকা লাগবে। বর্তমানে এই টাকা সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ভর্তুকি কমাতেই সরকার নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর চিন্তা-ভাবনা করছে।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ফলে পণ্যের দামও হু হু করে বেড়ে যাবে। এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। যে কারণে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারে। একদিকে জ্বালানি খাতের হাজার হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি কমানোর চেষ্টা অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মন রক্ষা করে চলা, এরকম একটি পরিস্থিতিতে সরকার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি নিয়ে দোটানায় পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষের ওপর সরকারকে আরও বেশি মানবিক হতে হবে। সাধারণ মানুষের কষ্টটা বুঝতে হবে। জ্বালানি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির আগে তিতাসসহ সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। দেশের প্রায় ৭০-৮০ ভাগ গ্যাস সরবরাহ করছে তিতাস। বর্তমানে তিতাসের সিস্টেম লস হচ্ছে ১০ ভাগ। বছরে যার মূল দাঁড়ায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি।

অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে অনেকে গ্যাস ব্যবহার করছেন এগুলো বন্ধ করতে হবে। গত বছরের এপ্রিল থেকে দেশে এলএনজি আমদানি শুরু হয়, যার দাম পড়ছে প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৩০ টাকা। এ দর দেশীয় গ্যাসের চার গুণের বেশি। এলএনজির কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। গণশুনানি করে বিইআরসি গ্যাসের দাম কিছুটা বাড়িয়েছিল। অবশ্য ভোটের আগে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় গ্যাসের বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপায়নি। ভোটের দুই মাস পর আবার গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিইআরসি। ওই প্রস্তাবে সব ধরনের গ্যাসের দাম গড়ে প্রায় ১০৩ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলা হয়, যা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

ওই প্রস্তাবে বিদ্যুতে ২০৮ শতাংশ, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯৬ শতাংশ, শিল্পে ১৩২ শতাংশ, সার কারখানায় ২১১ শতাংশ ও বাণিজ্যিক খাতে ৪১ শতাংশ, আবাসিকে ৮০ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির কথা বলা হয়। আবাসিকে একচুলা বর্তমান দর ৭৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৩৫০ টাকা, দুই চুলা ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৪৪০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়। গড়ে ১০২ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করে। পরে বিভিন্ন মহলের প্রতিবাদের মুখে গ্যাসের দাম আর বাড়ায়নি। এরপর আবার তিন মাস অতিক্রম না হতেই গত রোববার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু সাংবাদিকদের ফের গ্যাসের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন আমাদের গ্যাস আমদানিতে ১৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। এখন সামনে আরও গ্যাস কিনতে ১৪ হাজার কোটি টাকা লাগবে। যে কারণে গ্রাহকের কাছ থেকে আগের দাম নেওয়া যাচ্ছে না। গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সমন্বয় করা হবে। যদি সমন্বয় না করা হয় সমস্যা দেখা দেবে।

এ জন্যই গ্যাসের দামটা সমন্বয় করা দরকার। ব্যসায়ীরা বলছেন গ্যাসের দাম বাড়লে সবক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়বে। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির চাপ শিল্পপ্রতিষ্ঠান সইতে পারবে না। এমনিতে নানা প্রতিকূলতায় একের পর এক শিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই অন্তত দুই বছর পর যৌক্তিকভাবে পর্যায়ক্রমে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো উচিত। তবে তার আগে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে। তৈরি পোশাক খাত মোট গ্যাসের ৭-৮ শতাংশ ব্যবহার করে। আর পুরো শিল্প খাতে ১৬-১৭ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার হয়। ২০১২ থেকে গ্যাস সংযোগ পাওয়া যায়নি। সবেমাত্র কিছু কারখানায় কানেকশন দেওয়া হচ্ছে। মালিকরা হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বছরের পর বছর গ্যাস সংযোগের জন্য ঘুরছেন। এখন মাত্র সংযোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে নতুন করে ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

ব্যবসায়ীদের আক্ষেপ, শূন্য থেকে এই শিল্পকে দাঁড় করানো হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে শুধু বিজেএমইএর ৬ হাজার সদস্যের মধ্যে ৩ হাজার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। মনে রাখতে হবে, উদ্যোক্তা প্রতিদিন জন্মায় না। একটা উদ্যোক্তা জন্মাতে অনেক সময় লাগে। কিন্তু তার গলাটিপে হত্যা করা উচিত না। যুগে যুগে তা-ই করে আসা হচ্ছে। বিগত সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংকের উচ্চ সুদের কারণে উদ্যোক্তাদের গলাটিপে মেরে ফেলা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা আর রক্ত দিতে রাজি না। যে কোনো কিছু করতে হলে আলাপ-আলোচনা করে করতে হবে।

আগে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে : গোলাম রহমান, ক্যাব সভাপতি
গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির আগে তিতাসসহ গ্যাস কোম্পানিগুলোয় যে দুর্নীতি হচ্ছে সরকারের উচিত আগে তা বন্ধ করা। আগে দেশীয় কোম্পানি সম্পূর্ণ গ্যাস সরবারহ করত। তারপর বিদেশি কোম্পানি এলো। এখন দেশি কোম্পানি এবং বিদেশি কোম্পানির সরবরাহ গ্যাসের পরিমাণ প্রায় সমান। যেহেতু বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানি করতে খরচ বেশি হচ্ছে তাই গ্যাসের দামও ক্রমান্বয়ে বাড়া স্বাভাবিক। এখন এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। এলএনজির দাম অনেক বেশি। দেশে উৎপাদিত গ্যাসের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। এ নিয়ে ক্যাবের তরফ থেকে মামলা হয়েছে। এ নিয়ে হাইকোর্ট কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন। সেখানে বলা হয়েছিল যদি তিতাসের দুর্নীতি বন্ধ করা যায় তাহলে গ্যাসের দাম বাড়ানো দরকার হবে না। গ্যাসের দাম বাড়ানোর আগে বিআরসিকে ব্যাখ্যা করতে হবে গ্যাসের অপচয় দুর্নীতি রোধে তারা কি ব্যবস্থা নিয়েছে। অপচয় দুর্নীতি রোধের পরেও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি যৌক্তিক হবে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন থেকেই যায়। মূল কথা হলো মূল্য নির্ধারণ করতে হবে যুক্তিসঙ্গত এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে। যদি যুক্তিসঙ্গতভাবে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা না হয় তাহলে অন্যায় হবে। আর এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে।

সব কিছুর দাম বেড়ে যাবে : অধ্যাপক ম. তামিম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ
গ্যাসের দাম বাড়লে এর প্রভাব পড়বে সব জায়গায়। গ্যাসের দাম বাড়লে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে। পরিবহন খরচ বাড়বে। মোটকথা সব কিছুর দাম বেড়ে যাবে। বিদেশ থেকে যে গ্যাস আমদানি করা হচ্ছে তার মূল্য পড়ছে বাংলাদেশে প্রাপ্ত গ্যাসের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি। তিতাসের এই মুহূর্তে প্রায় ১০ ভাগ সিস্টেম লস আছে, যেটা অচিন্ত্যনীয়-অকল্পনীয়। এর ফলে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার গ্যাস চুরি হয়ে যাচ্ছে। তিতাস বাংলাদেশে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করছে, সেখানে ১০ শতাংশ অর্থাৎ ৫০০ কোটি টাকার গ্যাস চুরি হয়ে যাচ্ছে। সেই চাপ এখন সবার ওপরে পড়ছে। এর থেকে বাঁচার উপায় হচ্ছে তিতাসসহ যারা এসব চুরি ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, সরকারকে কঠোর হস্তে তাদের দমন করতে হবে। জলে-স্থলে নতুন করে গ্যাসের অনুসন্ধান চালাতে হবে। এছাড়া এখন সময় এসেছে নিজস্ব কয়লার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কারণ এখনই আমাদের উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে উৎপাদন আরো কমে যাবে। আর উৎপাদন কমলে কর্মসংস্থানও কমবে। তাই সরকারের উচিত কঠোর হাতে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী গ্যাসে প্রিপেইড মিটারের যে কথা বলেছেন এটাকে শতভাগ সমর্থন করছি। প্রতিটি বাড়িতে চুলার জন্য প্রিপেইড মিটারের ব্যবস্থা করা দরকার এখনই। প্রিপেইড মিটারের খরচটা একটু বেশি তাই এ কাজ করতে সরকার এখনো অতটা সাফল্য লাভ করেনি। কিন্তু প্রিপেইড মিটার থাকা উচিত।

সাধারণ মানুষের কষ্ট দেখতে হবে : শামসুল আলম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ
গ্যাসের দাম বাড়ালে সব সেক্টরের ওপরেই এর প্রভাব পড়বে। হয়তো কোনো কোনো সেক্টরে প্রভাব বেশি পড়বে আর কোনো কোনো সেক্টরে কম পড়বে। কিন্তু এর প্রভাব পড়বে তা নিশ্চিত। বেশি ভুক্তভোগী হবেন সাধারণ ভোক্তারা। পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়লে পণ্যের দাম বাড়বে, সেই পণ্য সাধারণ ভোক্তাকে বেশি টাকা দিয়ে ক্রয় করতে হবে। আবার আবাসিকে গ্যাসের দাম বাড়লে সেখানেও সাধারণ ভোক্তাকে তা বহন করতে হবে। মোটকথা, গ্যাসের দাম বাড়লে সাধারণ ভোক্তারাই বেশি ক্ষতগ্রস্ত হবে। ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে পোষালেও সাধারণ ভোক্তাদের পোষানোর কোনো সুযোগ নেই। এটা আমাদের বিশাল বোঝা হবে। এলএনজি আমদানির ভর্তুকি কমানোর জন্য গ্যাসের দাম বাড়ানোর কথা সরকার বলছে। সব ধরনের ভর্তুকি যদি সরকার সাধারণ মানুষের ওপর চাপায় তাহলে তো সাধারণ মানুষের কিছুই করার থাকবে না। আর সরকার যদি মনে করে সাধারণ মানুষকে একটু ভালো রাখবে তাহলে সেটা করতে পারে। উন্নয়নের জন্য সাধারণ মানুষ কষ্ট করতে রাজি আছে কিন্তু জনগণের টাকা যদি প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটে চলে যায় সেটা হবে খুবই দুঃজনক এবং বেদনাদায়ক। এ রকম অনেক উদাহরণ আছে, গ্যাস কোম্পানিতে যারা চাকরি করেন তাদের অনেকে চাকরি জীবন শেষে বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়ে যান। এ টাকা কোথায় থেকে আসে সে বিষয়গুলোও কিন্তু চিন্তার বিষয়। মার্চে গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল পরে যে কোনো কারণেই হোক বাড়ানো হয়নি। এখন আবার বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। আসলে এখন গ্যাসের দাম বাড়ানোর কতটুকু প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে, সাধারণ মানুষের প্রতি আরও বেশি মানবিক দৃষ্টি দিয়ে তার পর বাড়ানো কিংবা না বাড়ানোর ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।