কৌশল না অবিমৃশ্যকারিতা

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬

মির্জা ফখরুলের সংসদে না যাওয়া

কৌশল না অবিমৃশ্যকারিতা

কোন পথে বিএনপি (৪)

শফিক হাসান ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৩, ২০১৯

print
কৌশল না অবিমৃশ্যকারিতা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে ৬ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট জোটভুক্ত গণফোরাম থেকে জিতেছিলেন দুজন। নির্বাচিতদের মধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া নির্বাচিত অন্যরা শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দিয়েছেন। অনেক নাটকীয়তার পরও শেষ মুহূর্তে সংসদে যোগ দেননি তিনি। দল ও জোটের সংসদ সদস্যরা গেলেও নিজের না যাওয়াকে রাজনৈতিক কৌশল বলে বর্ণনা করেন মির্জা ফখরুল। তবে বিশ্লেষকরা এটাকে দোদুল্যমানতা ও অবিমৃশ্যকারিতা বলে মনে করছেন।

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পরপরই সংসদে না যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে। বিএনপিও আলাদাভাবে এ সংসদে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরামের নির্বাচিত দুজন সংসদ সদস্য অনেক কানাঘুষা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়ে শপথ নেন। দলের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই জায়গা করে নিয়েছিলেন সংসদে। গত মার্চে গণফোরামের নির্বাচিত দুজন সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদে যান। এরপর গত ২৫ এপ্রিল শপথ নেন ঠাকুরগাঁও থেকে নির্বাচিত বিএনপির সদস্য জাহিদুর রহমান। তিনিও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করেই সংসদে যোগ দেন। বস্তুত এরপরই টনক নড়ে বিএনপির। দলটি থেকে নির্বাচিত ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের নিরস্ত করার চেষ্টা থাকলেও শেষ মুহূর্তে পর্যায়ক্রমে শপথ নেন ৫ জন। এদের ওপর কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো প্রভাব ছিল না। পরে এটাকে দলের সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজনীতির সজ্জন হিসেবে পরিচিত মির্জা ফখরুল শেষ পর্যন্ত নিজেই শপথ নেননি। শপথ না নেওয়া সম্পর্কে তার বক্তব্য ও দলীয় অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

নির্বাচিত অন্য নেতাদের শপথের পর দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। তিনি লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে শপথ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। অথচ মাত্র একদিন আগেও বিএনপি শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল ছিল। নির্বাচিতদের কেউ শপথ নিলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার, সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আদালত পর্যন্ত যাওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।

নির্বাচিতদের যোগ দেওয়ার যৌক্তিকতা হিসেবে মির্জা ফখরুল বলেছেন, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতেই এ সংসদ-যাত্রা। কথা বলার সীমিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংসদ ও রাজপথের সংগ্রামকে যুগপৎভাবে চালিয়ে যাওয়ার বিষয় উল্লেখ করেন তিনি। এটাকে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ এবং কৌশলগত কারণ হিসেবে দলের অবস্থান হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু দলটির শীর্ষনেতা তিনি কেন এ ‘গণতান্ত্রিক চর্চা ও কৌশলের’ বাইরে থেকে গেলেন এর কোনো ব্যাখ্যা দেননি। বরাবরই বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। তার সংসদে যোগ দেওয়া না দেওয়ায় দল হিসেবে বিএনপি কতটুকু লাভবান হলো কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হলো এ বিষয়ে রয়েছে হরেক বিশ্লেষণ, ধোঁয়াশা ও বিভ্রান্তি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফখরুল সংসদে যোগদান করলে তার নেতৃত্বে দল আরও সংগঠিত হতো। নিজেদের দাবি-দাওয়া ও অধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারতেন সংসদে।

মির্জা ফখরুলের এ ‘দোলায়মান’ অবস্থা সম্বন্ধে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ খোলা কাগজকে বলেন, শপথ নিয়ে জাতীয় সংসদে না যাওয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বড় ভুল। কারণ হলো, নির্বাচনের পর বিধি অনুযায়ী বিএনপির প্রত্যেককেই পাঠানো উচিত ছিল। এর মাধ্যমে ছোট্ট একটা গ্রুপ সৃষ্টি হতো। সংসদে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলা, জনসাধারণের অধিকারের পক্ষে কথা বলার একটা সুযোগ হতো। পরে বিএনপির নির্বাচিত অন্য সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেও মির্জা ফখরুল গেলেন না। তিনি না গেলেও অন্যদের শপথ নেওয়া সমর্থন করলেন। এখন বাইরে থেকে মনে হচ্ছে, পুরো বিষয়টি পরস্পরবিরোধী। এটা ঠিক নয়, ভুল হয়েছে। প্রথম থেকেই ভুল হয়ে এসেছে বলে মন্তব্য করেন খ্যাতনামা এ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ।

চরম অস্থিরতা ও টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গত ২৯ এপ্রিল সংসদে শপথ নেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আবদুস সাত্তার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের হারুনুর রশীদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের আমিনুল ইসলাম ও বগুড়া-৪ আসনের মোশাররফ হোসেন। অন্যদিকে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত মির্জা ফখরুলের শপথ নেওয়ার বিষয়টি থেকে গেছে রহস্যের অন্তরালেই। তিনি শপথ না নেওয়ায় বাতিল হয়েছে এ আসনের নির্বাচন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থেকে নির্বাচন কমিশন পুনর্নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে।

একদিকে কারান্তরীণ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত দলটির অন্যতম চালিকাশক্তি ও খালেদাপুত্র তারেক রহমান। শক্ত হাতে বিএনপির হাল ধরার কেউ নেই। বর্তমানে দলটির শীর্ষনেতা মির্জা ফখরুল কী করতে পারেন, দলটিরই বা কী করা উচিত এ নিয়ে জনমনে রয়েছে নানা প্রশ্ন। জানতে চাইলে এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, বর্তমানে বিএনপির একটাই মাত্র পথ দলটির যে ২০ দলীয় জোট আছে এবং এ জোটে আরও কেউ যদি যোগদান করতে চায় এদের নিয়ে সংঘবদ্ধ হওয়া; এবং সংঘবদ্ধভাবে জনসাধারণের সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে তথা কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত সর্বত্র যেতে হবে। বিএনপি নেতাদের দল নয়, এটা জনসাধারণের দল। এখনো খালেদা জিয়া যদি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বক্তৃতা দেন তাহলে দেখবেন লাখ লাখ লোক সেখানে জমায়েত হবে। এর কারণ এটা জনসাধারণের দল, তারা প্রথম থেকেই দলটির প্রতি অনুরক্ত।

বিএনপির এ থিঙ্কট্যাঙ্ক খোলা কাগজকে আরও বলেন, জিয়াউর রহমান এবং বেগম জিয়া যে পথে দলকে সংঘবদ্ধ করেছিলেন এ প্রক্রিয়াই অনুসরণ করা দরকার। এর বাইরে যাওয়ার দরকার নেই। একটার পর একটা, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে সাধারণ মানুষগুলোকে আবার সংঘবদ্ধ করতে হবে। বলতে হবে তোমাদের অধিকারের জন্য তোমাদেরই সংগ্রাম করতে হবে। সংগ্রাম বাইরের লোক এসে করে দিয়ে যাবে না।

যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির সখ্য দলটিকে তরুণ প্রজন্ম এবং মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির সঙ্গে একধরনের বিচ্ছিন্নতা দিয়েছে। দেশের অসংখ্য মানুষের চাওয়া, জামায়াতের কবল থেকে বিএনপির বেরিয়ে আসা। কিন্তু নিজস্ব সমীকরণ ও কৌশলগত কারণে জামায়াত ইস্যুতে বিএনপি বরাবরই নীরব।

বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনে সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সংসদে যোগ দিয়েছেন। গত মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো সংসদে যোগ দিয়ে তার বিস্ফোরক মন্তব্য আলোচিত হচ্ছে দেশজুড়ে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিসহ চলতি সংসদ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন তিনি। বিএনপির সংসদ-যাত্রা শেষপর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা পর্যবেক্ষণ করছেন বিশেষজ্ঞরা।