চ্যালেঞ্জ প্রত্যাশার

ঢাকা, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৬ আশ্বিন ১৪২৬

চ্যালেঞ্জ প্রত্যাশার

নতুন বাজেট আজ

জাফর আহমদ ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৩, ২০১৯

print
চ্যালেঞ্জ প্রত্যাশার

অনেক প্রতিশ্রুতি। মানুষের প্রত্যাশাও অনেক। কিন্তু সম্পদ সীমিত। এরই মধ্যে আজ টানা তিন মেয়াদের শেষ তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার। বাজেটে নিজেদের প্রতিশ্রুতির গুরুত্ব বিবেচনা করে কর্মসূচি স্থির করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে অর্থায়নের সাম্প্রতিক ধারা অনেক চাপে ফেলে দিবে। এ অবস্থাতেই সরকারকে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করতে হচ্ছে।

সরকারের লক্ষ্য আছে ২০২১ সালে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করা, আট শতাংশের উপরে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা এবং মানুষকে সমৃদ্ধির জীবন দেওয়া। পাশাপাশি ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন (এসডিজি) ও ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করার চাপ আছে। টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকায় কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা রক্ষার পাশাপাশি নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার চাপ উৎরানোর কৌশল নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত মনে করেন সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো মানসম্মতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও পুঁজিবাজারে আস্থা সৃষ্টিও সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। কিন্তু অর্থায়নে ভালো খবর নেই। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে পুনঃনির্ধারণ করার পরও সুখবর আসেনি।

এক্ষেত্রে উপস্থাপিত নতুন বাজেট বাস্তবায়ন সহজ হবে না। তবে সরকারের জন্য সুখবর হলো দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আছে, বাজেট বাস্তবায়নে এ স্থিতিশীলতা বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, উচ্চ আয়, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কর্মকা-, অবকাঠামো উন্নয়নে বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন, আমার গ্রাম-আমার শহর তথা গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সৃষ্টি, তরুণ সমাজের জন্য লাগসই শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও বৈষম্য হ্রাস, খাদ্য নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, শিল্প উন্নয়ন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত মোকাবিলা, এসডিজি বাস্তবায়ন, পররাষ্ট্র ও বিনিয়োগ নিয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি আছে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের মতো বড় প্রকল্পগুলো চালিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কৃষি, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, কর্মসৃজনের প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দ ও পথনকশার কথা বলা হয়েছে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে লক্ষ্যপূরণে পুরনো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে সরকার। এ লক্ষ্যে এডিপিতে মোট ১ হাজার ৫৬৪টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প রয়েছে ১ হাজার ৩৫৮টি, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১১৬টি, জাপানি ঋণ মওকুফ সহায়তা তহবিলে (জেডিসিএফ) প্রকল্প একটি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব প্রকল্প রয়েছে ৮৯টি। অন্যদিকে সমাপ্তর জন্য নির্ধারিত প্রকল্প ধরা হয়েছে ৩৫৫টি। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) প্রকল্প ৬২টি। বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তির সুবিধার্থে বরাদ্দহীন অননুমোদিত নতুন প্রকল্প ২৪২টি এবং বরাদ্দহীন অননুমোদিত নতুন প্রকল্প রয়েছে ১ হাজার ৪৫টি। এছাড়া বরাদ্দসহ অনুমোদিত নতুন প্রকল্প রয়েছে ৪১টি।

এছাড়া এডিবিবহির্ভূত খাতেও সরকার বিপুল কর্মযজ্ঞ করতে চায়। আগামী অর্থবছরের জন্য খাতভিত্তিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বরাদ্দ ধরা হয়েছে পরিবহন খাতে। অন্যান্য খাতে বরাদ্দের পরিমাণ হচ্ছে-শিক্ষার প্রসার ও গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষা ও ধর্ম খাতে চতুর্থ সর্বোচ্চ বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৩৭৯ কোটি ১২ লাখ টাকা। বিদ্যুৎ, নির্মাণসহ তথ্য ও প্রযুক্তি প্রসারের লক্ষ্যে বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে পঞ্চম সর্বোচ্চ বরাদ্দ ১৭ হাজার ৫৪১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনা ও অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য পল্লী উন্নয়ন ও পল্লী প্রতিষ্ঠান খাতে ১৫ হাজার ১৫৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা বা ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ বরাদ্দ ধরা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৫৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা; খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে কৃষিখাতে খাতে ৭ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা; নদী ভাঙন রোধ ও নদীর ব্যবস্থাপনার জন্য পানি সম্পদ খাতে ৫ হাজার ৬৫২ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং মানব সম্পদ উন্নয়নসহ দক্ষতা বৃদ্ধিতে জনপ্রশাসন খাতে ৫ হাজার ২৪ কোটি টাকা রাদ্দের প্রস্তাব উল্লেখযোগ্য।

তথ্য অনুযায়ী বিরাট এই কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ হাজার কোটি টাকা এবং ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ, দেশিও ব্যাংকিং খাত থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়। প্রস্তাবিত এ বাজেটকে সরকারের পক্ষ থেকে উন্নয়ন অভিযাত্রার ধারবাহিকতা হিসেবে বলা হচ্ছে। এর মধ্যে নতুনত্ব নেই বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বৈদেশিক আয়ে ভর্তুকি, কৃষি ভর্তুকি বৃদ্ধি, যুবকদের জন্য ঋণসহ বেশ কিছু উদ্যোগ রয়েছে। এ জন্য কর্মপন্থাও উল্লেখ করা হয়েছে, আজ বিকালে বাজেটে উপস্থাপনকালে এ কথা বলা হয়েছে।

বাজেট প্রস্তাবনা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত যা বলা হয়েছে তা ইতিবাচক। তবে বাস্তবায়নে অর্থায়ন নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান নয় বলে মন্তব্য করেছেন পিআরআই নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর।

খোলা কাগজকে তিনি বলেন, বাজেট অর্থায়নের চলতি বছরের চিত্র খুব একটা ভালো না। এবার ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের কথা বলো হয়েছে। কিন্তু এ আইন বাস্তবায়নে ব্যবসায়ীরা কতটা সহযোগিতা করবে তা ভাবনার বিষয়। সব মিলে নতুন বাজেট নিয়ে এখন পর্যন্ত যে সব কথা বলা হচ্ছে, তা বাস্তবায়নেও যেন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকে বাজেট উপস্থাপনায়।