রেলসেবাতেও বঞ্চিত

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯ | ৬ আষাঢ় ১৪২৬

উপেক্ষিত উত্তরবঙ্গ (৬)

রেলসেবাতেও বঞ্চিত

সাজ্জাদ হোসেন ১০:০৮ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৩, ২০১৯

print
রেলসেবাতেও বঞ্চিত

ব্রিটিশদের হাত ধরে ১৮৬২ সালে যখন কলকাতার শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়ার জগতি রেললাইন স্থাপিত হয় তার অনতিকাল পরেই দেশের বৃহৎ রেলসেতু পাকশীতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ তৈরি করা হয় দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগ স্থাপন সহজতর করার জন্য। অপরদিকে উত্তরবঙ্গের ব্যবসা-বাণিজ্যর অপার সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে ব্রিটিশ সরকার ব্যাপক পরিসরে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগকে প্রতিষ্ঠিত করে এবং ১৮৯৯ সালে তিস্তা নদীর উপর দিয়ে চলাচলের জন্য রেলসেতু নির্মাণ করে। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই উত্তরাঞ্চল এখন রেলসেবায় সবচেয়ে উপেক্ষিত একটি অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলের রক্ষণাবেক্ষণকারী তিনটি কারখানার দুটিই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে রংপুর বিভাগে। একটি উপমহাদেশের বৃহত্তর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা অপরটি পার্বতীপুরে অবস্থিত। এসব কারখানায় ট্রেন, ট্রেনের কোচ, ওয়াগন, বয়লার, পিরিওডিক্যাল ওভারহোলিং (পিওএইচ), জেনারেল ওভারহোলিং (জিওএইচ) ও ট্রেন পরিচালনায় যাবতীয় যন্ত্রপাতি মেরামত করাসহ স্টিম রিলিফ ক্রেন ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত রেল কোচ, ওয়াগন ইঞ্জিন মেরামতের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা হয়।

এ ছাড়া কারখানাগুলোতে এক হাজার ২০০ রকমের খুচরা যন্ত্রাংশও তৈরি হয়ে থাকে। কিন্তু এই অঞ্চলে চলাচলকারী যেকটি ট্রেন রয়েছে সবকটির অবস্থা লক্কড়-ঝক্কড় এবং প্রায় ব্যবহার অনুপযোগী। আর উত্তরের পাঁচ জেলা বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রামের জন্য বরাদ্দ মাত্র দুর্বল দুটি ট্রেন। যার একটি দিনে ও অপরটি রাতে চলাচল করে।

রাজধানী ঢাকা থেকে সবচেয়ে দূরের পথ রংপুর বিভাগের। উত্তরের ১৬ জেলার সবচেয়ে কাছের পথ বগুড়ার দূরত্ব ১৯৭ কিলোমিটার। পঞ্চগড়ের দূরত্ব ৪৪৩ আর রংপুরের দূরত্ব ৪০৩ কিলোমিটার। এই ১৬ জেলার প্রায় চার কোটি মানুষ বাস করে যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক পঞ্চমাংশ। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল উত্তরের মানুষ জীবন ও জীবিকার তাগিদে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজের সন্ধানে নিয়মিত যাতায়াত করেন। এই বিশাল পথ পাড়ি দিতে উত্তরের মানুষের প্রধান বাহন যেখানে হতে পারত ট্রেন কিন্তু উত্তরের মানুষের কাছে রেলভ্রমণ এক চরম বিভীষিকার নাম।

লালমনিরহাট থেকে চলাচলকারী লালমনি এক্সপ্রেসে করে গত ১১ জুন ঢাকা আসেন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বায়েজীদ হোসেন। তিনি জানান, সকাল সাড়ে ১০টার সময় তিনি লালমনিরহাট থেকে ট্রেনে চড়েন। যেখানে তার সড়কপথে পোছানোর কথা ৮ থেকে ১০ ঘণ্টায় সেখানে তিনি ১৬ ঘণ্টায় কমলাপুর এসে পৌঁছান।

রেলওয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এটিকে স্বাভাবিক চিত্র না বললেও তিনি জানান, লালমনিরহাট থেকে ঢাকায় আসতে সাধারণত ১২ ঘণ্টার মতো লাগে। কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, উত্তরের রেলপথ সিঙ্গেল লাইন হওয়ার কারণে ক্রসিংয়েই সময় চলে যায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার মতো। ওই কর্মকর্তার দাবি যদি সরকার উত্তরের জেলাগুলোর জন্য ডাবল লাইনের রেলপথ স্থাপন করে তাহলে এ সমস্যা প্রায় অর্ধেক কমে যাবে।

এ অঞ্চলের রেল, নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির সভাপতি নাহিদ হাসান নলেজ বলেন, ‘এক সময় চিলমারী থেকে দেওয়ানগঞ্জ হয়ে কুড়িগ্রাম ও আশপাশের মানুষ অতি অল্প সময়ে এবং অল্প খরচে ঢাকায় যেতে পারত। কিন্তু সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর উত্তরের সবচেয়ে দরিদ্রতম এ জেলার জনগণকে বাসে করে অনেক রাস্তা পাড়ি দিয়ে ঢাকা যেতে হয়। বিভিন্ন দফতরে এবং বিভিন্ন সময় এই এলাকা থেকে নির্বাচিত এমপি-মন্ত্রীদের আমরা দাবি জানিয়ে এসেছি সোনারহাট স্থলবন্দর থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণের কথা। এ ছাড়া দেওয়ানগঞ্জ থেকে রৌমারী স্থলবন্দর পর্যন্ত যদি রেল-যোগাযোগ চালু করা যায় তাহলে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবহন খরচ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমানও বাড়বে। কিন্তু কেউ আমাদের কথা শোনেনি। আমরা সম্প্রতি দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক কেন্দ্র চিলমারী থেকে ঢাকায় যেন একটি আন্তঃনগর রেল ভাওয়াইয়া এক্সপ্রেসের দাবি করেছি। সরকার যদি এর ব্যবস্থা করে তাহলে এ অঞ্চলের মানুষের পরিবহন খরচ একদিকে যেমন কমবে, তেমনি উত্তরাঞ্চলের যে বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষ রাজধানী ঢাকায় গার্মেন্টসহ বিভিন্ন কাজের সন্ধানে যান তারা নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবেন।’

তিনি বলেন, ঢাকা থেকে লালমনিরহাট যেতে বাসে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, পাবনা, বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর পার হতে হয়। কিন্তু উত্তরের পাঁচ জেলা বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রামের যাত্রীদের সিরাজগঞ্জের জামতলী থেকে ঈশ্বরদী হয়ে নাটোর, সান্তাহার হয়ে আবার বগুড়া যেতে হয়। ফলে একদিকে যেমন প্রায় ১৫০ কিলোমিটার অতিরিক্ত রাস্তা পাড়ি দিতে হয়, অপরদিকে এই পথে ডাবল লাইন না থাকায় দক্ষিণবঙ্গের এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে চলাচলকারী ট্রেনকে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে ক্রসিংয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। তাই সরকার যদি বগুড়া থেকে শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন (সিরাজগঞ্জ) পর্যন্ত সরাসরি নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ করে তাহলে উত্তরের মানুষ চার থেকে ছয় ঘণ্টা কম সময়ে যাতায়াত করতে পারবেন।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের বগুড়া থেকে শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন (সিরাজগঞ্জ) পর্যন্ত সরাসরি নতুন ডয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ৯০ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় মোট ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগে নয়টি সেকশনে ৫৬টি ট্রেন চলাচলের কথা থাকলেও চলছে ৩৮টি ট্রেন। এ ছাড়া এ অঞ্চলে ৩২টি লোকোমোটিভের মধ্যে চারটি বিভিন্ন সময়ে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় এবং ছয়টি মেরামতের জন্য পাঠানো হয়েছে। অবশিষ্ট ২২টি লোকোমোটিভের মধ্যে একটির মেয়াদ থাকলেও বাকি ২১টি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। বিভিন্ন সময় এ রেলওয়ের প্রায় ৯০০ একর জমিও বেদখল হওয়ার খবর বিভিন্ন প্রত্রিকায় প্রকাশিত হয়।