গ্যাসের অভাবে থমকে উন্নয়ন

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬

উপেক্ষিত উত্তরবঙ্গ (৫)

গ্যাসের অভাবে থমকে উন্নয়ন

সাজ্জাদ হোসেন ৯:২৮ পূর্বাহ্ণ, জুন ১২, ২০১৯

print
গ্যাসের অভাবে থমকে উন্নয়ন

পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদ, কাঁচামালের প্রাচুর্যতা এবং বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে শিল্প ও বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গ্যাস সংযোগের অভাবে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হচ্ছে না উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলায়। ফলে প্রায় চার কোটি জনসংখ্যার উত্তরাঞ্চলে বাড়ছে বেকার ও অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা। গ্যাসের অভাবে সিএনজিচালিত যানবাহনের পরিবর্তে উত্তরের জেলাগুলোতে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ও ব্যয়বহুল ডিজেল-পেট্রলচালিত যানবাহন দিয়ে চলছে জনগণের পরিবহন ব্যবস্থা। এ ছাড়া অনিবন্ধিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ তিন চাকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ডিজেলচালিত নসিমন-করিমন সড়ক-মহাসড়কে চলাচল করায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা, ঝরছে প্রাণ।

বর্তমান সরকারের উন্নয়ন নীতিতে শিল্পায়নের কথা ব্যাপকভাবে আলোচিত হলেও উত্তরাঞ্চলে এর প্রভাব মোটেই লক্ষ করা যায় না। এর কারণ হিসেবে গ্যাস সংযোগ না থাকাকে দুষছেন এ অঞ্চলের মানুষ। উত্তরের জেলাগুলোর মধ্যে কেবল বগুড়া ও রাজশাহী শহরে রয়েছে গ্যাস সংযোগ। তাই গ্যাসনির্ভর যানবাহন ও ছোট ছোট কল-কারখানায় গ্যাস নেওয়ার জন্য ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে গ্যাস সংগ্রহ করতে হয়। জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার মো. আশরাফুল ভাড়ায় সিএনজিচালিত একটি মাইক্রো চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।

তিনি জানান, প্রতিটি ট্রিপের আগে তাকে ৭০ কিলোমিটার দূরে বগুড়ার টিএমএসের সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে গ্যাস নিয়ে আবার ফিরে এসে ট্রিপ মারতে হয়। ফলে রিফিলকৃত গ্যাসের প্রায় অর্ধেক চলে যায় যাতায়াতে। একইভাবে বগুড়ার সঙ্গে যেসব জেলার যোগাযোগ রয়েছে তার মধ্যে গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, রংপুর ও নাটোরের সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মাইক্রোবাস চালকরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে গাড়িতে গ্যাস ভরে ভাড়া খাটাচ্ছেন। আর লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, নীলফামারীসহ অন্যান্য জেলার জনগণ এ সুবিধাটুকুও পাচ্ছেন না। ফলে যারা সিএনজিচালিত বিভিন্ন যানবাহন চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পারতেন, সেই বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ রিকশা, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন চালাতে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন। ফলে একদিকে যেমন বাড়ছে ঢাকায় মানুষের ঢল, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে বাড়ছে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ও যাতায়াত ভাড়া।

দেশের সবচেয়ে বেশি চালকল রয়েছে নওগাঁ জেলায়। কিন্তু দেশের মানুষের প্রধান খাবারের উৎস চালকলগুলোতে গ্যাসের সংযোগ না থাকায় উচ্চমূল্যের বিদ্যুতের ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে চালের দাম প্রতিবছর ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়াতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চালকল মালিকরা। এ ছাড়া নানা কড়াকড়ির কারণে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে তাদের কম মূল্যে ধান কিনতে হচ্ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। বাড়ছে চালের দাম। সেই সঙ্গে আশঙ্কাজনকহারে বন্ধ হতে শুরু করেছে ছোট ছোট চালকল।

রংপুর শহরের শাপলার মোড়ে একখণ্ড জমি কিনে বাড়ি করেছেন আমজাদ হোসেন। তিনি ঢাকার করাইলের বস্তি এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। স্ত্রী একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে তৃতীয় শ্রেণির চাকরি করেন। আর মাত্র কয়েক বছর চাকরি রয়েছে তার। তাই তিনি স্থায়ীভাবে রংপুর বসবাস করতে চান।

তিনি জানান, বঙ্গবন্ধু সেতু হওয়ার পর আমরা উত্তরের মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিলাম গ্যাস পাব। কিন্তু দুই দশকের বেশি সময় পার হতে চলল, রংপুরবাসী গ্যাস পেলাম না। রংপুরে নাগরিক সুবিধা মোটামুটি ভালো কিন্তু রান্নার জন্য গ্যাসের সংযোগটা থাকলে আমার মতো অনেকেই স্থায়ীভাবে ঢাকা ছেড়ে রংপুরমুখী হবেন।

রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. মোস্তাফিজার রহমান খোলা কাগজকে জানান, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে গ্যাস সংযোগ একটি প্রাণের দাবি। উত্তরাঞ্চলের কাঁচামাল ও কর্মক্ষম জনশক্তিকে ব্যবহার করে এখানে ছোট, মাঝারি ও বড় শিল্পকারখানা গড়ে তোলা সম্ভব। আর এটা করা সম্ভব হলে মঙ্গাপীড়িত উত্তরবঙ্গ দেশের একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোন হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। আমরা অনেকবার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সাহেবের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়েছি। বারবার রংপুরবাসী শুধু আশ্বাসই পেয়েছে কিন্তু গ্যাস পাননি।

তিনি আরও জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, উৎসে সরবরাহ কম তাই গ্যাসের চাপ কমে গেছে, ফলে গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, গ্যাস কম পেলে সবাই কম পাবে। কিন্তু কেউ গ্যাস পাবে আর কেউ পাবে না এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। রংপুরবাসীও সরকারকে ট্যাক্স দেয়। তাই রাষ্ট্রীয় সব সুযোগ-সুবিধা ভোগের অধিকার আমাদেরও রয়েছে।

রংপুর জেলা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) শরীফ মুহাম্মদ ফয়েজুল আলম জানান, গ্যাস সঞ্চালন লাইন স্থাপনের জন্য রংপুরের পাঁচ উপজেলার ৮৯টি মৌজায় ৩০৯ দশমিক ৫ হাজার ৬২৬ একর জমি অধিগ্রহণ শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে হুকুম দখলের কাজ শুরু করেছে রংপুর জেলা প্রশাসন। এরই মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি কর্মকর্তাদের আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে।

রংপুর বিভাগে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ চলতি বছরের শেষদিকে বাস্তবায়ন হতে চলেছে। তবে যেহেতু অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া একটু জটিল তাই ঠিক নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না কবে নাগাদ অধিগ্রহণ সম্ভব হবে। তবে কোনো ধরনের আইনি জটিলতা না থাকলে আগামী বছরের মধ্যে অধিগ্রহণের কাজ শুরু হবে।