ইশতেহারমুখী বাজেট

ঢাকা, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৬ আশ্বিন ১৪২৬

ইশতেহারমুখী বাজেট

জাফর আহমদ ১১:১৩ অপরাহ্ণ, জুন ১১, ২০১৯

print
ইশতেহারমুখী বাজেট

বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ, চলমান মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শহরমুখী মানুষের স্রোত ঠেকানো এবং গ্রামে শহরের সুবিধা সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার। এবারে বাজেটের আকার হতে পারে ৫ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। বিপুল আয়তনের এ বাজেটে অর্থের সংস্থানের মূল উৎস ধরা হচ্ছে রাজস্ব খাত। আশা করা হচ্ছে, এ খাতে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা আসবে। বাকি অর্থের সংস্থান হবে রাজস্ববহির্ভূত খাত থেকে আয় এবং অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি উৎস পাওয়া ঋণ।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঘোষিত ইশতেহারে গ্রামকে শহর করার প্রতিশ্রুতি দেয় আওয়ামী লীগ। টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের এবারের মেয়াদে প্রথম বাজেট ঘোষণা হচ্ছে কাল। সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা। সরকার সে লক্ষ্যে গ্রামে শহরের সব সুবিধা নিশ্চিত করতে চায়।

সরকারের বর্তমান মেয়াদে প্রথম বাজেট হিসাবে ২০১৯-২০ বছরের বাজেটে গ্রাম উন্নয়ন বিস্তারিত পরিকল্পনা থাকছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনা ও অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য পল্লী উন্নয়ন ও পল্লী প্রতিষ্ঠান খাতে এবারের বাজেটে ১৫ হাজার ১৫৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হতে পারে। যা মোট বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। গ্রামে বসেই যেন শহরের সব সুযোগ-সুবিধা পায় সে জন্য গ্রামকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হবে। সে লক্ষ্য নিয়েই বাস্তবায়ন হবে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’। এর সঙ্গে যুক্ত হবে ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ সব ধরনের নাগরিক সুবিধা। প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে এ কাজে সম্পৃক্ত করা হবে। বর্তমান মেয়াদে এটি প্রথম বাজেট হওয়ার কারণে পরিকল্পনার প্রথম ধাপ এ বাজেটের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন হবে। এরপর ধাপে ধাপে সব সুবিধা নিশ্চিত করতে চায় সরকার।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বৃহস্পতিবার এ বাজেট উপস্থাপন করবেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটা তার প্রথম বাজেট। জানা গেছে, বাজেটে পল্লী অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে কার্যক্রম শুরু করেছে। কৃষি জমির ক্ষতি না করে পরিকল্পিতভাবে গ্রাম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা ঋণ চাইলে এসব প্রতিষ্ঠান সহজ শর্তে ঋণ দেবে।

রূপকল্প অনুযায়ী, ২০২১ সালে মধ্যম আয় এবং ২০৪০ সাল নাগাদ দেশকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে গৃহীত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়ে চায় সরকার। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে সরকার। এ লক্ষ্যে এডিপিতে মোট ১ হাজার ৫৬৪টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে।

এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প রয়েছে ১ হাজার ৩৫৮টি, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১১৬টি, জাপানি ঋণ মওকুফ সহায়তা তহবিলে (জেডিসিএফ) প্রকল্প ১টি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব প্রকল্প রয়েছে ৮৯টি। অন্যদিকে সমাপ্তর জন্য নির্ধারিত প্রকল্প ধরা হয়েছে ৩৫৫টি। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) প্রকল্প ৬২টি। বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তির সুবিধার্থে বরাদ্দহীন অননুমোদিত নতুন প্রকল্প ২৪২টি এবং বরাদ্দহীন অননুমোদিত নতুন প্রকল্প রয়েছে ১ হাজার ৪৫টি। এ ছাড়া বরাদ্দসহ অনুমোদিত নতুন প্রকল্প রয়েছে ৪১টি।

৫ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার বৃহৎ বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকবে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। বিপুল এ রাজস্ব আদায়ে সরকার আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট-এই বিভাগে কার্যক্রম জোরদার করতে চায়। এ জন্য ভ্যাট আইন-২০১২ কার্যকর ও করজাল সম্প্রসারণ করতে চায়। সারা দেশে জরিপ করে করযোগ্য মানুষকে বের করে করের আওতায় আনা হবে। রাজস্ব বোর্ডের জনবল বৃদ্ধির মাধ্যমে শহরে কর কার্যক্রম বৃদ্ধির পাশাপাশি জেলা ও উপজেলায় কর আদায় কার্যক্রম জোরদার করা হবে। দুই বছর আগে ভ্যাট আইন কার্যকর করার সময় ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে বাস্তবায়ন স্থগিত করে। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ২০১৯-২০ অর্থবছরে নতুন এ আইন কার্যকর করতে চায় সরকার। এর ফলে রাজস্ব আদায় বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, নতুন আইনে ভ্যাটের জাল আরও বিস্তৃত হবে।

বর্তমানে ১৯৯১ সালের আইনে নির্দিষ্ট খাতে (৩৯টি) প্রযোজ্য হারে ‘উৎসে’ ভ্যাট আদায় করা হয়। নতুন আইনে উৎসে ভ্যাট কর্তনের পরিধি ব্যাপক বাড়ানো হবে। এখন শুধু আমদানি পর্যায়ে বাণিজ্যিক পণ্যে (কমার্শিয়াল ইমপোর্টার) ‘অগ্রিম’ ভ্যাট (এটিভি) আদায় করা হয়। নতুন আইনে বাণিজ্যিকসহ সব পণ্যে অগ্রিম ভ্যাট দিতে হবে। ফলে ভ্যাটের আওতা ব্যাপকভাবে বাড়বে। কাল উপস্থাপিত বাজেটে এ ব্যাপারে পথনকশা থাকবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দফতর সূত্রে জানা যায়।

এ ছাড়া এবার বাজেটে অন্যতম চমক থাকবে রপ্তানি বৃদ্ধিতে নগদ সহায়তা বৃদ্ধি ও প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে যথারীতি অব্যাহত থাকবে ভর্তুকি। দেশে খাদ্য নিরাপত্তা সৃষ্টিতে সরকারের কর্মসূচির অংশ হিসেবে কৃষিতে ভর্তুকি দেওয়ার ব্যবস্থা থাকছে। গতবারের তুলনায় এ খাতে নতুন করে আরও ৩ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা ভর্তুকি বাড়তে পারে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কৃষিতে ভর্তুকি আছে ১৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। এ বছর ভর্তুকি দেওয়া হবে ১৭ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, বাজেটে কৃষিতে ভর্তুকি বাড়ানোসহ কৃষকদের জন্য নানা ধরনের প্রণোদনার প্রস্তাব করা হয়েছে। ধানসহ ফসলের উৎপাদন খরচ কমাতে সরকার এবার আধুনিক কৃষিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। কৃষি শ্রমিক সংকট মোকাবেলায় কৃষির যান্ত্রিকীকরণে তিন হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রস্তাব করা হয়েছে। কৃষক বাজার ও ফসল সংরক্ষণের জন্য গুদাম ও কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের প্রস্তাবসহ কৃষি শিল্প গড়ে তুলতে একটি কর্মপরিকল্পনা বাজেটে তুলে ধরার প্রস্তাব করা হয়েছে।