সর্ষের মধ্যে ভূত

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯ | ৬ আষাঢ় ১৪২৬

দুদকের বাসির পুলিশের মিজান

সর্ষের মধ্যে ভূত

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৫২ অপরাহ্ণ, জুন ১১, ২০১৯

print
সর্ষের মধ্যে ভূত

পুলিশ কর্মকর্তার ঘুষ দেওয়া আর দুদক কর্মকর্তার ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের খবর এখন টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। দুদকের কাজ হচ্ছে, দুর্নীতিবাজদের দমন করা আর পুলিশের কাজ হচ্ছে অপরাধীদের দমন করা। কিন্ত যারা দুর্নীতিবাজদের আর অপরাধীদের দমন করবে তারাই যদি দুর্নীতি আর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তাহলে তাদের নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক, আর এখন হচ্ছে তাই। এ যেন সর্ষের মধ্যেই ভূত।

জানা গেছে, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ডিআইজি মিজানুর রহমানের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক এনামুল বাসিরকে। অনুসন্ধান চলাকালে ডিআইজি মিজান দুদক কর্মকর্তা এনামুল বাসিরকে ৪০ টাকা ঘুষ দেন এই শর্তে, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ থেকে তাকে যেন রেহাই দেওয়া হয়। কিন্তু টাকা নেওয়ার পর দুদক কর্মকর্তা বাসির ডিআইজি মিজানকে জানান, অভিযোগ থেকে তাকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। এরপরই দুদক পরিচালকের ওপর ক্ষিপ্ত হন ডিআইজি মিজান। আর এই খবর কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

দুদক পরিচালক বাসির এবং পুলিশের ডিআইজি মিজানের এমন কা- গণমাধ্যমে প্রকাশের পর উভয় সংস্থার কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহল থেকে দুদক ও পুলিশের এই দুই কর্মকর্তাকে নিয়ে কঠোর সমালোচনা শুরু হয়। টিআইবির পক্ষ থেকেও এর সমালোচনা করা হয়।

ঘটনার পর দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাসিরকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান গণমাধ্যমকে বলেছেন, এনামুল বাসিরের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ সেটি অসদাচরণ। ব্যক্তির দায় প্রতিষ্ঠানের নয়। এনামুল বাসিরের সঙ্গে ডিআইজি মিজানুর রহমানের কথোপকথন নিশ্চিত হতে অডিও রেকর্ড ফরেনসিক পরীক্ষা করতে হবে। তা ছাড়া মিজানুর ঘুষ দিয়েছেন প্রমাণিত হলে দুদক মামলা করবে বলে জানান তিনি।

আর পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা গতকাল মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিষয়?টি পু?লিশ হেড?কোয়ার্টার্সের দৃষ্টি?তে এসেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক খন্দকার এনামুল বাসিরকে ঘুষ দেওয়ার প্রমাণ মিললে পুলিশ কর্মকর্তা ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে পুলিশ সদর দফতর।

সূত্রে আরও জানা গেছে, মিজানুর রহমান ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে জোরপূর্বক এক নারীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ ও বিয়ে করা এবং আরও এক নারী সংবাদ পাঠিকাকে তুলে নেওয়ার অভিযোগে দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়। পরে ওই বছর জানুয়ারিতেই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ থেকে তাকে প্রত্যাহার করা হয়। এরপর গত বছরের ৩ মে অবৈধ সম্পদসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে মিজানুরকে দুদক কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে মিজানুর রহমান ও তার প্রথম স্ত্রী সোহেলিয়া আনারের আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ কোটি টাকারও বেশি সম্পদের খোঁজ পায় দুদক। ডিআইজি মিজান ছাড়াও তার এক ভাই ও ভাগ্নের নামে করা সম্পদসহ মোট ৪ কোটি ২ লাখ ৮৭ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয়।

বিশ্লেষকরা এ বিষয়টিকে ন্যক্কারজনক বলে অভিহিত করছেন। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেছেন, মিজানের বিরুদ্ধে আগের অভিযোগ গুরুতর। এর ওপর সে যদি দুদক কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়ে থাকেন তাহলে দুজনই দোষী। এখন গুরুত্বসহকারে বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে হবে।

এ বিষয়ে দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, এ ঘটনার দ্রুত তদন্ত হওয়া দরকার। যে দুইজনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে তারা দুজনই নিজ নিজ সংস্থায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাই তদন্ত কাজ দ্রুত শেষ করা উচিত। যদি তারা অভিযুক্ত হন তাহলে অবশ্যই দ্রত বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তা ছাড়া ঘুষ দেওয়া কিংবা নেওয়া ফৌজদারি অপরাধও বটে। তিনি আরও বলেন, যারা পুলিশ কিংবা দুদক কর্মকর্তা তারা সবাই এই সমাজের মানুষ। কেউ এই সমাজের বাইরের নয়। তাই এসব সংস্থায় নিয়োগ দেওয়ার সময় নৈতিকতার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। এখন প্রায় সব জায়গায়ই দেখা যায় সর্ষের মধ্যে ভূত, যা খুবই দুঃখজনক।

বিস্মিত টিআইবি
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক খন্দকার এনামুল বাসির এবং পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমানের মধ্যে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তদন্ত করে দুজনেরই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ডিআইজি মিজান নিজের মুখে ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করার পরও কী করে স্বপদে বহাল রয়েছেন তা নিয়েও বিস্ময় প্রকাশ করেছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি। গতকাল এক বিবৃতিতে সংস্থাটি এ বিস্ময় প্রকাশ করে।

সংস্থাটি বলছে, তদন্ত কর্মকর্তার দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুদক কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না। ঘুষ লেনদেনে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি দুদকেরও দায় রয়েছে।

টিআইবি আরও বলেছে, দুদক ও পুলিশ দুটি সংস্থার ওপর থেকেই মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলছে। এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে তারা জনগণের আস্থা ফিরে পেতে পারে।