এরশাদ এখন যেমন

ঢাকা, বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯ | ৫ আষাঢ় ১৪২৬

দোর্দণ্ড প্রতাপশালী-আনপ্রেডিকটেবল

এরশাদ এখন যেমন

মনোজ দে ১০:৫৩ অপরাহ্ণ, মে ২১, ২০১৯

print
এরশাদ এখন যেমন

ভেজা রুমালে শিউলি ফুল তুলে একদিন যিনি তার প্রিয়জনদের ঘুম ভাঙাতেন, জীবনসায়াহ্ণে এসে তিনিই এখন যেন পৃথিবী নামের গ্রহের নিঃসঙ্গতম মানুষ। সেনাপ্রধান থেকে প্রধান সামরিক প্রশাসক এরপর দোর্দ-প্রতাপশালী রাষ্ট্রপতি; শেষে স্বৈরশাসকের তকমা নিয়ে গণঅভ্যুত্থানে পতন, জেল, দলের নেতৃত্ব, প্রেম- সবকিছু মিলিয়ে নন্দিত-নিন্দিত এক মহাকাব্যিক জীবন। উত্থান-পতন বিতর্ক আলোচনা-সমালোচনা নাছোড় সংগীর মতো হেঁটেছে পায়ে পায়ে। বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে আনপ্রেডিকটেবল ব্যক্তিত্ব হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কথাই বলছি। এখন তার পাশে কেউ নেই বললেই চলে। বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতা আর নিঃসঙ্গতায় কাটছে তার শেষবেলার দিনগুলো। মোটেই ভালো নেই এরশাদ।

এরশাদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দৈনিক খোলা কাগজকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। দীর্ঘ আলাপচারিতায় ওই সূত্রটি জানিয়েছে, কেমন কাটছে এরশাদের বার্ধক্যের দিনগুলো। গত ২০ মার্চ ৯০ বছরে পা দিয়েছেন এরশাদ। গত কয়েক বছরই অসুস্থতা তার সঙ্গী। এ নিয়েই দল গোছাতে রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছুটে গেছেন। গত বছরের মাঝামাঝি বেড়ে যায় তার অসুস্থতা। নানা সময়ে ঢাকা সিএমএইচ, ভারত ও সিঙ্গাপুরে তাকে নিতে হয় চিকিৎসা। গত কয়েক মাসে তার অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও পুত্র এরিক, ভাই জিএম কাদের ও পরিবারের সদস্যরা ছাড়া বলতে গেলে দল ও এক সময়ের ঘনিষ্ঠ কেউই তার পাশে নেই। যদিও এর মধ্যে একের পর এক দলের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সিগনেচার করতে হয়েছে তাকে। সকালে-বিকালে বারবার পাল্টাতে হয়েছে সিদ্ধান্ত। দুর্বল ও কাঁপা কাঁপা হাতে সিগনেচার করা এ সব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে নানা বিতর্ক, এমনকি হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে।

সূত্রটি জানায়, এ সব সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই এরশাদকে ব্যবহার করে করা হয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের স্বার্থটাই ছিল মুখ্য। তবে এরশাদ যে কারণে বারবার সিদ্ধান্ত পাল্টেছেন তার পেছনে কাজ করেছে নিজ পরিবারের মধ্য থেকেই কাউকে জাতীয় পার্টির উত্তরাধিকার মনোনীত করতে। জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান করার মধ্য দিয়ে এ দুশ্চিন্তা থেকে তিনি অনেকটাই নির্ভার হতে পেরেছেন। এ ছাড়া তার অবশেষ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিয়ে তিনি ট্রাস্ট গঠন করেছেন। এ ট্রাস্টে নিজেসহ ট্রাস্টি করেছেন ছেলে এরিক এরশাদ, একান্ত সচিব মেজর (অব.) খালেদ আক্তার, চাচাতো ভাই মুকুল ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে। সর্বশেষ তিনি তার কবরের জন্য জায়গা খুঁজছেন। এক্ষেত্রে তার প্রথম পছন্দ ঢাকা, পরের পছন্দ রংপুর। তবে সেটা হতে হবে মসজিদ বা মাদ্রাসার পাশে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ ওই সূত্র জানিয়েছে, এরশাদের শারীরিক অবস্থা এখন শোচনীয় পর্যায়ে। হুইল চেয়ারে তাকে চলাফেরা করতে হয়। কথা জড়িয়ে যায়। বিছানাতেই তাকে মলত্যাগ করতে হয়। তবে চিন্তাভাবনা সক্রিয়।

রাজধানীর বারিধারায় প্রেসিডেন্ট পার্কের বাড়িতেই কাটছে তার সময়। দেখাশোনা করছেন পুরনো কর্মচারী ও গৃহকর্মী ওয়াহাব, সাত্তার, বাদশা, নীপা ও রুবি। নিঃস্বার্থভাবেই সাবেক এই রাষ্ট্রপতির দেখভাল করছেন তারা। কিন্তু বার্ধক্য বয়সে পরিবারের ঘনিষ্ঠ কারোর যে সার্বক্ষণিক যত্নআত্তি তা থেকে বঞ্চিত তিনি। ছোটভাই জিএম কাদেরসহ পরিবারের সদস্যরাই মূলত এখন তার খোঁজখবর রাখছেন। তবে তাদের কারও বয়সই কম নয়। সবাইকে নিজের নিজের যত্ন নিয়ে, নিজেদের কাজ থেকে সময় বাঁচাতে হয়। কিন্তু দল বা এরশাদের কাছ থেকে নানা সময়ে সুবিধা পাওয়া মানুষদের কেউই বলতে গেলে তার খোঁজখবর রাখেন না।

সাবেক স্ত্রী বিদিশার গর্ভের একমাত্র পুত্র এরিকই এখন তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী আর ‘অন্ধের যষ্ঠী’র মতো বাঁচার অবলম্বন। কিন্তু ১৯ বছর বয়সী এরিক স্পেশাল চাইল্ড মানে বিশেষভাবে সক্ষম। মানসিক প্রতিবন্ধকতা থাকায় স্বাভাবিকভাবে এরিক বৃদ্ধ ও অসুস্থ বাবার পুরোটা দেখভাল করতে পারে না। কিন্তু অসম বয়সী বাবা-ছেলের রসায়ন মমত্বে ভরা। এরশাদ ছেলেকে সঙ্গে নিয়েই ঘুমাতে যান। আর ছেলেও বাবাকে কাছছাড়া করতে নারাজ। এমনকি অসুস্থ বাবাকে রেখে স্কুলে যেতেও অনাগ্রহ এরিকের।

ঘনিষ্ঠ ওই সূত্রটি এরশাদের অসহায়ত্ব নিয়ে গত পরশুর একটি ঘটনার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘ওই দিন এরশাদকে মুরগির মাংস খেতে দেওয়া হয়েছিল। খাওয়ার একপর্যায়ে তার দাঁতের ভিতরে মুরগির মাংসের টুকরো আটকে যায়। তিনি অস্বস্তিতে আও, আও করে চিৎকার শুরু করেন। কিন্তু সেই মুরগির টুকরা তার দাঁতের ফাঁক থেকে বের করে দেওয়ার মতো সেখানে কেউ ছিলেন না। ছেলে এরিক বাবার চিৎকার শুনে ‘ড্যাডি, আর ইউ ওকে, আর ইউ ওকে’- বলে বারবার ছুটে গেলেও ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি আসলে কি ঘটেছে।’

সূত্র জানায়, বেশি অসুস্থ বোধ করলে কিংবা রাতে ঘুম না এলে এরশাদ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চলে যান। সিএমএইচ তার জন্য নির্ভরতম জায়গা। সেখানকার চিকিৎসা ও সেবাতেই তিনি টিকে আছেন।