নিত্যপণ্যের আঁচ পোশাকে

ঢাকা, বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯ | ৫ আষাঢ় ১৪২৬

নিত্যপণ্যের আঁচ পোশাকে

জমে উঠছে ঈদ বাজার, দাম চড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক ১১:১৬ অপরাহ্ণ, মে ২০, ২০১৯

print
নিত্যপণ্যের আঁচ পোশাকে

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ঈদের বাজার জমতে শুরু করেছে গত শুক্রবার থেকে। প্রসিদ্ধ মার্কেট থেকে শুরু করে ফুটপাতের ভাসমান দোকানগুলোতে উঠেছে বাহারি সব পোশাক। কিন্তু সেসব পোশাকে হাতই দেওয়া যাচ্ছে না। রোজার আগে কাঁচাবাজারসহ নিত্যপণ্যে যে আগুন লেগেছিল রোজা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই তা কিছুটা কমেছে। তবে সে আগুনের আঁচ যেন এসে লেগেছে ঈদের বাজারে। তবে নামি বা প্রসিদ্ধ মার্কেটের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ফুটপাতের ভাসমান দোকানগুলোতে কাপড়ের দাম কিছুটা কম। তাই সেখানেই ভিড়বাট্টা একটু বেশি।

ঈদের বাজারে সারা দেশের চোখ থাকে রাজধানীর দিকে। এখানকার চকবাজারের পাইকারি কাপড়ের দোকানগুলো রোজার আগেই বিক্রি-বাট্টা সেরে ফেলেছে। কারণ সারা দেশ থেকে পাইকারি ক্রেতারা রোজার আগেই সংগ্রহ করেছে বিপুল থানকাপড়। তাই চকবাজারে ব্যস্ততা তেমন একটা নেই।

তবে ব্যস্ততা বেড়েছে গুলিস্তান, নবাবপুর, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড ও বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স, মৌচাক, মালিবাগ, মিরপুর, উত্তরার প্রসিদ্ধ মার্কেটগুলোতে।

ঈদের শেষদিকে মার্কেটগুলোতে ভিড় বেশি হওয়া এবং যানজটের ভোগান্তি মাথায় রেখে রাজধানীর বাসিন্দারা এবার আগে থেকেই কেনাকাটা শুরু করেছেন। রাজধানীর বিপণি বিতানগুলোর অধিকাংশই গত শুক্রবার থেকে রাত ৮টার পরিবর্তে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা রাখা হচ্ছে। চাকরিজীবীরা তাই সন্ধ্যার পরপরই ঢুঁ মারছেন মার্কেটগুলোতে। কিন্তু যতটা আশা নিয়ে রাজধানীর মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্ত বাসিন্দারা এসব মার্কেটে ঢুঁ মারছেন ততটা হতাশা নিয়ে ফিরতে হচ্ছে মার্কেট থেকে। কারণ পোশাকের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। ক্রেতাদের অভিযোগ যে পোশাক রোজার আগে একদাম ছিল সে পোশাকই ঈদের বাজারে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এর কোনো যুক্তিই খুঁজে পাচ্ছেন না তারা। আবার একই পোশাকের মার্কেট ভেদে দামের পার্থক্য রীতিমতো অবাক করার মতো।

ফারহানা আক্তার নামের মালিবাগের বাসিন্দা খোলা কাগজকে জানিয়েছে, তার বাড়ি পটুয়াখালী। এবার ঈদে দীর্ঘ ছুটি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তাই প্রস্তুতি হিসেবে একটু আগেভাগেই মার্কেটিং সেরে নিচ্ছেন। কিন্তু বাজারে ওঠা পোশাকে হাতই দেওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘মৌচাকের ফরচুন মার্কেটে আমার ১২ বছর বয়সী মেয়ের জন্য একটি থ্রিপিস দেখেছি। তারা দাম হেঁকেছে সাড়ে ৫ হাজার টাকা। সেই একই কাপড়ের কাছাকাছি ডিজাইনের থ্রিপিস পাশের মৌচাক মার্কেটে পাওয়া যাচ্ছে দুই হাজার টাকায়।’

রাজধানীর সবচেয়ে বড় বাজার নিউমার্কেট-গাউছিয়া-চাঁদনীচক-চন্দ্রিমার কাপড়ের দোকানগুলোতেও ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। এখানে নারীদের থ্রি-পিস, শাড়ি, গয়না, প্রসাধনীর পাশাপাশি পুরুষের শার্ট-প্যান্ট, পাঞ্জাবির চাহিদা বরাবরই বেশি। ঈদকে ঘিরে সে অনুযায়ী ক্রেতা-বিক্রেতার প্রস্তুতিও থাকে। কিন্তু এখানকার বড় বড় দোকানগুলোতে স্বাভাবিক দামের চেয়ে বিশেষ ডিজাইনের কাপড়ের দাম বাড়তি বলেই জানিয়েছেন ক্রেতারা।

শারমিন রওনক নামের একজন গৃহিণী জানিয়েছেন, ‘গাউছিয়ার শাড়ির দাম আগের মতোই আছে। তবে থ্রি-পিসের দাম বেড়েছে। নতুন ডিজাইনের কিছু থ্রি-পিস এসেছে। সেগুলোর দাম কিছুটা বাড়তি। বাচ্চাদের পোশাকেরও দাম চড়া।’

সাঈদ আলমাস নামের একজন চাকরিজীবী বলেন, ‘আমি চন্দ্রিমা মার্কেটের নিয়মিত ক্রেতা। ঈদের জন্য কয়েকটি ডিজাইনেবল শার্ট ও ফতুয়া কিনতে গিয়ে দেখতে পেয়েছি, প্রতিটি পোশাকে স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত দেড়গুণ দাম বাড়িয়েছেন বিক্রেতারা। বিভিন্ন কোম্পানির ট্যাগ ঝুলিয়ে সেসব দামকে জাস্টিফায়েড করার চেষ্টাও করছেন।’

নিউমার্কেট এলাকায় গত শুক্রবার সপরিবারে মার্কেট করতে আসা ফিরোজ হাসনাইন বলেন, এখন থেকে দিন যত এগোবে, ভিড় তত বাড়বে। তাই এখন যতটুকু দরদাম করে কাপড় কেনার সুযোগ থাকছে, পরে সে সুযোগও থাকবে না। এজন্য সপরিবারে কেনাকাটার জন্য এসেছি এখনই।’

তিনি অবশ্য বলেন, ‘দাম এখনো হাতের নাগালেই আছে। কিছু কিছু জিনিসের বাড়তি দাম নিচ্ছে- সেটা দরদাম করে কমিয়ে নিতে পারলে নেব, না হলে নেব না।’

নামি ও প্রসিদ্ধ মার্কেটে পোশাকের দাম চড়া হলেও ফুটপাতের ভাসমান দোকানগুলোতে মিলছে সাধ্যের মধ্যে হাতের নাগালের অধিকাংশ পোশাকই। বিশেষ করে কাপড়ের চড়া মূল্যের বাজারে নিম্নবিত্ত বা স্বল্প আয়ের মানুষের ভরসা ফুটপাতের মার্কেটগুলোই। নিউ মার্কেট-গাউছিয়া এলাকা থেকে শুরু করে, রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, জিরো পয়েন্ট, গোলাপশাহ মাজার মোড়, বায়তুল মোকাররম, মতিঝিল, নিউমার্কেট, ফার্মগেট, মালিবাগ, শান্তিনগর, রামপুরা, খিলগাঁও, মুগদা, বাসাবো, এলিফেন্ট রোড, মৌচাক, মালিবাগ, ফার্মগেট, মিরপুর এলাকাসহ বিভিন্ন বড় বড় মার্কেটের সঙ্গে লাগোয়া এসব মার্কেটেই অধিকাংশ ক্রেতা ভিড় জমাচ্ছেন। ৩০ টাকা থেকে ৩০০ টাকায় পাচ্ছেন সব ধরনের কাপড়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত লেগে থাকছে ভিড়। এসব মার্কেট মিলছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকার প্যাকেজে বাচ্চাদের পোশাক। বড়দের জন্য রয়েছে শার্ট, প্যান্ট, টি-শার্ট। মেয়েদের জন্য রয়েছে ফ্রক, লেহেঙ্গা, ডিভাইডার টপস। জুতা, সালোয়ার-কামিজ, গেঞ্জি, পাজামা-পাঞ্জাবি, টুপি কসমেটিকসসহ হাল ফ্যাশনের সব পরিধানই মিলছে এসব বাজারে। রাজধানীর বঙ্গবাজার ও সদরঘাট পাইকারী বাজার থেকে কাপড় এনে ফুটপাতের এসব দোকানে বিক্রি করা হচ্ছে। অন্যবারের চেয়ে ঈদের অনেক আগেই ঈদবাজার জমেছে বলে জানিয়েছেন এখানকার ক্রেতারাও।

আবদুল করিম নামের গুলিস্তানের এক হকার বলেন, ‘ফুটপাতের বাজার সবসময় ভালো জমে। আমরাও কম দামে কাপড় দিই পাবলিকও কিনে খুশি। আমাদের তো দোকান ভাড়া, কর্মচারী খরচ, বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার ঝক্কি নাই। তাই আমাদের কম দামে বিক্রি করে পোষায়। তিনি জানান, ঈদের আগে চাঁদরাত পর্যন্ত এখানে ব্যবসা চলবে।’

পুটপাতের দোকান ঘুরে দেখা গেছে এসব দোকানে ছেলেদের শার্ট বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ৫০০ টাকায়, জিন্স প্যান্ট ২০০ থেকে ৭০০ টাকায়, টি-শার্ট ১২০ থেকে ২৫০ টাকায়, থ্রি-পিস ৩০০ থেকে ৬৫০ টাকায়, বাচ্চাদের থ্রি-কোয়ার্টার জিন্স প্যান্ট ১৫০ থেকে ২৫০ টাকায়, শিশুদের গেঞ্জির সেট ১২০ থেকে ২০০ টাকায়, ফ্রক ও টপস ২২০ থেকে ৪৫০ টাকায়, বাচ্চাদের ওয়ান পিস ৩০ থেকে ১২০ টাকায়।

ঈদবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে দেশে দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি বড় অর্থনীতি দাঁড়িয়েছে। শুধু পোশাকই নয়, জুতা, গয়না, কসমেটিকসসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিধেয়র বজার বেড়েছে। কিন্তু উৎসবকে কেন্দ্র করে ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য দিতে না পরালে সে বাজারে ধস নামবে। বিক্রেতারাও লোকসানের মুখে পড়বে। কোনো সিন্ডিকেট বা অসাধু ব্যবসায়ী যেন ঈদ বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে প্রশাসনকে।

প্রসঙ্গত, রোজা শুরুর পরপরই দেশের কয়েকটি মার্কেটে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। কক্সবাজারের একটি মার্কেটে পাঁচ হাজার টাকার কাতান শাড়ি ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়েন এক দোকান মালিক। শুধু তাই নয়, আড়ংয়ের একটি পাঞ্জাবির পাইকারি ক্রয়মূল্য যেখানে এক হাজার ২৫০ টাকা, সেটা বিক্রি হচ্ছিল ১৮৭০ টাকায়। একটি ফ্রকের মূল্য হাঁকানো হচ্ছিল ৬ হাজার ৯৫০ টাকা। কিন্তু ওই ফ্রকের পাইকারি ক্রয়মূল্যের ভাউচার চাওয়া হলে দোকান কর্তৃপক্ষ তা দেখাতে পারেনি।

পোশাকের ক্রয়-বিক্রয় মূল্যের অসামঞ্জস্যতা, অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়ার অভিযোগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে কক্সবাজারের ওই দোকানের মালিককে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করে আদালত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদবাজারে সারা দেশের মার্কেটগুলোতে এরকম ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে পারলে সাধারণ মানুষের নাগালে আসবে পোশাকের দাম।