উদ্বৃত্ত তবুও চাল আমদানি নেপথ্যে কি অর্থপাচার

ঢাকা, বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯ | ৫ আষাঢ় ১৪২৬

উদ্বৃত্ত তবুও চাল আমদানি নেপথ্যে কি অর্থপাচার

নাজমুল হুসাইন ১০:৩০ অপরাহ্ণ, মে ২০, ২০১৯

print
উদ্বৃত্ত তবুও চাল আমদানি নেপথ্যে কি অর্থপাচার

দেশে উদ্বৃত্ত চাল; তবুও বন্ধ হচ্ছে না আমদানি। এ যেন দিশাহারা কৃষকের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। স্বভাবতই তাই প্রশ্ন উঠছে, মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক থাকার পরেও কেন চাল আমদানিতে ঝোঁক দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা? এ নিয়ে গবেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা মনে করছেন ২৮ শতাংশ ডিউটি দিয়ে বিদেশ থেকে চাল আমদানি কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।

এভাবে আমদানি করা চালের মূল্য দেশের বাজারের তুলনায় অবশ্যই বেশি হবে। এর পেছনে তাই অর্থপাচার থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. কেএএস মুরশিদ খোলা কাগজকে বলেন, বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ ও দর নিম্নমুখী থাকার পরও কেন ব্যবসায়ীরা চাল আমদানি করছেন সেটা আবারো প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্যই এসব আমদানির খরচ বর্তমান দেশের বাজারদরের থেকে বেশি। এই পরিস্থিতি পরিষ্কারভাবে অর্থপাচারের মতো বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করছে, যা মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। সরকারকে এ বিষয় যাচাই-বাছাই করে দেখা দরকার।

তিনি বলেন, এখন কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চাল রপ্তানি করা অথবা এর চেয়েও ভালো পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে সামান্য চাল আমদানিও পরিস্থিতির পরিপন্থী হচ্ছে। সেটা আগে বন্ধ করতে হবে।

২০১৭ সালের মে মাসে হাওরে আগাম বন্যায় ফসলহানির পর সরকার চালের আমদানি শুল্ক উঠিয়ে দেয়। এরপর গত দুই বছরে দেশে প্রায় ৬০ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। গত দুই মৌসুমে আমন ও বোরো দুইয়েরই বাম্পার ফলনের পর এখন দেশে উদ্বৃত্ত চাল রয়েছে। এ কারণে গত নভেম্বর মাসে সরকার আবারো ২৮ শতাংশ আমদানি শুল্ক পুনর্বহাল করে। কিন্তু এতে চাল আমদানি কমলেও বন্ধ হয়নি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত ১০ মাসে ২ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ হাজার টন সরকারি পর্যায়ে আর ব্যবসায়ীরা আমদানি করেছেন এক লাখ ৩০ হাজার টন। আগামীতে আরও ৩ লাখ ৮০ হাজার টন চাল আমদানি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এর মধ্যে ঋণপত্র খোলা হয়েছে এক লাখ ৪০ হাজার টনের ও নিষ্পত্তি হয়ে গেছে দুই লাখ ৪০ হাজার টনের। এসব চালের অধিকাংশ আসছে ভারত থেকে।

বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, ভারতে এবার উৎপাদন বাড়ায় গত কয়েক মাসে চালের দাম বেশ কমেছে। ফলে তারা তাদের উদ্বৃত্ত চাল রপ্তানির জন্য বিভিন্ন দেশে সুযোগ খুঁজছে। এখন ভারতে প্রতি টন চালের দাম ৩৬৮ ডলার, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৩৭০ ডলার। এক বছর আগেই ভারত সেই চাল রপ্তানি করেছে ৪০৬ ডলারে।

এ পরিস্থিতিতে ভারত বাংলাদেশে চাল গছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে চাল আমদানিকারক কয়েকজন ব্যবসায়ী দ্বিমত পোষণ করেছেন। তাদের দাবি, দেশে এখন সাধারণ মানের চাল আমদানি প্রায় বন্ধ রয়েছে। রমজান ও দুই ঈদকে কেন্দ্র করে ভারত থেকে শুধু চিনিগুড়া চাল আমদানি করছেন তারা। কিন্তু বাজারে চাল বিক্রি করেন এমন ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ রাইস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি জাকির হোসেন রনি বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, দেশের বাজারে ভারতের চিনিগুড়া চাল নেই। আসছে মোটা চাল। পাশাপাশি কিছু উৎকৃষ্ট মানের নাজিরশাইল চালও আসছে। দেশে চিনিগুড়া চালের পর্যাপ্ত উৎপাদন রয়েছে।

জাকির হোসেন মনে করছেন, উদ্বৃত্ত থাকার পরও চাল আমদানি করে আমদানিকারকরা অন্যভাবে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। চাল আমদানির পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। তার আশঙ্কা, বিদেশে চালের দাম এখন বেশ কম। আর তাই বাংলাদেশে যত চাল আনা হচ্ছে, সেসবের আমদানি মূল্য আগের মতো বেশি দামে দেখানো হচ্ছে। তিনি বলেন, বাড়তি এই টাকা দেশ থেকে পাচার হতে পারে। নতুবা এখন চাল আমদানির কোনো প্রশ্নই আসে না।

এদিকে চাল আমদানির মাধ্যমে দেশ থেকে অর্থপাচারের ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। ২০১৬ সালে ‘বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অবৈধ অর্থপাচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও চাল আমদানির মাধ্যমে বাড়তি টাকা দেশ থেকে পাচার হয় বলে ইঙ্গিত করেছিল গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। ওই সময় সিপিডি জানায়, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৮০০ থেকে ১০০০ ডলারে চাল আমদানি হয়েছে। অথচ সে সময় আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দর ছিল টনপ্রতি ৫০০ ডলার। ফলে এ বাড়তি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে যায়।